
ফিরে দেখা স্বর্ণযুগের বাংলা ছবি ‘বরযাত্রী’, পরিচালনায় সত্যেন বোস
আদ্যিকালের বৃদ্ধ কথন, ‘লাখ কথা না হলে বিয়ে হয় না’। বাঙালি বিয়ের ক্ষেত্রে এ একেবারে চরম সত্যি। নমো নমো করে চার হাত মেলানো, সই-সাবুদের বিয়ে কিংবা বিয়ের নামে এলাহী গণভোজ, লাখ না হলেও সংখ্যার বিচারে অগুনতি কথার মালা গলায় পরেই তবে হয় বাঙালিদের বিয়ে। এই এত এত কথা বলে কারা! কেন! কনেপক্ষ আর বরপক্ষ। শুধু বর-কনে নয়, কথার চাষ করতে করতে, সামাজিকতার বন্ধনে এভাবেই বাঁধা পড়ে দুটো পরিবার। আর বাঙালি তো ছোটো থেকেই শেখে খোকা বিয়ে করতে গেলে, বরযাত্রীর বেশে সেজেগুজে তার সঙ্গে যাবে হুলোবেড়াল। সাহিত্যে হোক বা বাস্তবে, বিচিত্ররকম বরযাত্রী বিয়েরই বিশেষ অঙ্গ। এর প্রমাণ তো অজস্র।
এই বরযাত্রীদের নিয়েই আস্ত একটা গল্প লিখে ফেলেছিলেন সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, রসরচনায় যাঁর জুড়ি মেলা ভার। বন্ধুর বিয়ে, বাসর আর বরযাত্রীদের নিয়ে ঘটে চলা হাজার রকম ঘনঘটার সেই বিবরণ অবলম্বনেই স্বর্ণযুগের বাংলা সিনেমার জগতে সেরা কমেডি ফিল্মের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে পরিচালক সত্যেন বোসের ‘বরযাত্রী’।

ক্যারিকেচারে বরযাত্রীর পোস্টার
১৯৫১ সালে ন্যাশনাল প্রোগ্রেসিভ পিকচার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনায় মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবির জনপ্রিয়তা এত তুঙ্গে ছিল যে, পরবর্তীতে এই ছবিকে কেন্দ্র করেই দূরদর্শনে ‘বিবাহ অভিযান’ নাম নিয়ে একটি ধারাবাহিকও নিয়মিত সম্প্রচারিত হত। নির্ভেজাল হাসি, অমলিন বন্ধুতা, বন্ধুর বিয়ের জন্য পৃথিবীর সবরকম ছেলেমানুষিতে সামিল হওয়ার এ গল্প পুরোনো হওয়ার নয়। আজও তাই কমেডি পুরোনো বাংলা ছায়াছবির তালিকায় ‘বরযাত্রী’ চির নতুন।
এ সিনেমা ছয় অন্তরঙ্গ বন্ধু রাজেন, গণশা, ঘোৎনা, ত্রিলোচন ওরফে তিলু, গোরা আর কে.গুপ্তর গল্প। ঘটনার সূত্রপাত তিলুর বিয়েতে বরযাত্রী যাবে বলে তিলুর চার বন্ধুর অপেক্ষার মধ্যে দিয়ে। রাজেন, গোরা, ঘোৎনারা অপেক্ষা করে গণশার জন্য। তিলে খচ্চর গণশার কড়া অভিভাবক তার মামা। ইন্টারভিউয়ের হুমকি জারি করে যিনি কিনা বন্ধুর বিয়ের বরযাত্রী যাওয়া থেকে গণশাকে আটকে দিতে চান। চতুর বুদ্ধির জাহাজ গণশাও পাড়ার ‘ন বৌদি’ সেজে ঘোমটা মাথায় মামার নাকের ডগা দিয়ে পগার পার হয়। নির্ভেজাল হাসির শুরু হয় এখান থেকেই। এরপরের দেড় ঘণ্টা ধরে শুধু হেসেই যাওয়া এই ছায়াছবিতে।
যেকোনো প্রতিকূলতাই যে সাময়িক, তা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেয় গণশারা। তাই তো বন্ধু তিলুর বিয়েতে রাজেনের লেখা পদ্য বিলি করা না হলে গোরা এর সমাধান হিসাবে বলে, শিয়ালদার মোড়ে দাঁদের মলমের লিফলেটের সঙ্গে সেই পদ্য বিলি করে দিতে। বাসর ঘরে কৌতুক জমে ওঠে, বর কানমলা খায়, তবু গলা দিয়ে তার গান বেরোয় না লজ্জায়, তাকে সঙ্গ দিতে ডাক পড়ে তার বন্ধুদের। অথচ জানলার ফাঁক দিয়ে তিলুর বাসর দেখা বন্ধুরা তখন মহাঝামেলায়। গোবরে পড়ে গোরার পা তখন প্রবল চুলকোচ্ছে, তাকে শুশ্রূষা করতে গিয়ে বাকি বন্ধুদের মাথায় পড়ে বিয়েবাড়ির এঁটোকাঁটা, নোংরা আবর্জনা। চিৎকার চেঁচামেচিতে সাব্যস্ত হয় বিয়েবাড়িতে ডাকাত পড়েছে। প্রাণের ভয়ে ত্রিলোচনের বরযাত্রী বন্ধুদের স্থান হয় পচা পুকুরে। তারপর তো ডাকাতরা বরযাত্রী না বরযাত্রীরাই ডাকাত এ নিয়ে এক প্রস্ত চলে। বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের গল্প এ পর্যন্তই।

দূরদর্শনে 'বিবাহ অভিযান'
চিত্রনাট্য তৈরিতে এরপরে গল্পের সঙ্গে জুড়ে যায় সাহিত্যিক বিমল চন্দ্র ঘোষের কলম। ফলে ত্রিলোচনের বিয়েতে বরযাত্রী বিভ্রাটের পর তার বন্ধুদের এবারের কর্মসূচি হয় গণশার বিয়ের জন্য পাত্রী খোঁজা। রাজদ্বার থেকে শ্মশানে যে বন্ধুরা সর্বক্ষণ আঠার মতো লেগে থাকে, কিছুতেই একা হতে দেয় না, ঘোৎনা, রাজেন, গণশারা তেমনই বন্ধু। তাইতো বরের পিসি সেজে রাজেন আর দাদামশাই সেজে গণশা নিজেই নিজের জন্য মেয়ে দেখতে যায় ত্রিলোচনের শ্বশুরের দূর সম্পর্কের আত্মীয় বাড়িতে। সেখানেও বিভ্রাট হয় বিস্তর। ছদ্মবেশে ডাকাত এই বদনাম নিয়ে সেখান থেকেও পালিয়ে বাঁচে রাজেনরা। বরযাত্রীতে বর-কনের মিষ্টি প্রেম থাকবে না তা তো হতে পারে না। তাইতো ভুবন মুখুজ্যের নাতনি পুটুরানিকে প্রতিদিন ম্যাজিক দেখাতে দেখাতে কখন যেন সত্যিকারের ম্যাজিক ঘটে যায় গণশার মনে। সে ভালোবেসে ফেলে পুটুকে৷ কিন্তু গণৎকার তো সেই কবেই বলেছিলেন যে, গণশার বিয়ের যোগ চললেও বিয়েতে আছে বিস্তর বাধা। বন্ধুর জন্য সর্বস্ব পণ করা অন্য বন্ধুরা থাকলে জীবনে সব বাধাই যে পেরোনো যায়, সে কথাই বারবার বলে এই সিনেমা। তাই নিরুদ্দেশের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ গণশার আংটি বন্দক রাখা, কাগজে বিজ্ঞাপনের জন্য ছবি তুলতে গিয়ে মামার কাছে ধরা পড়া, বাড়ি থেকে পালিয়ে সত্যিকারের ডাকাতদের হাতে পড়ে ‘তুতিবাবা’ সাজা জীবন থেকে উদ্ধার – সবেতেই সে বন্ধুদের অমূল্য সাহচর্য পায়। এমনকি পুটুকে বিয়ের আগের রাতে, হিন্দুস্থানি নাপিত হনুমান ওস্তাদের পাল্লায় সাধের বাবরি চুল হারালে, পরচুলা পরে বিয়ে করতে যাওয়ার পরামর্শও গণশাকে দেয় তার বন্ধুরা। ষোলোকলা পূর্ণ হয় ওতেই। দর্শক হেসে গড়াগড়ি দেয়, সলিল চৌধুরীর সংগীত পরিচালনায় গোটা সিনেমা জুড়ে আনন্দের সুর ছড়িয়ে পড়ে আর গণশা ওদিকে বাসর ঘরে, ঘুমের ঘোরে পরচুলা খুলে দিব্যি নেড়া মাথায় শুয়ে থাকে এবং তা দেখে আবার বিয়েবাড়িতে ডাকাত পড়েছে এই রবে চিৎকার শুরু হয়।
বিয়ে, বরযাত্রী, বাসর সবেতেই এখন আধুনিকতার নানান নজির। তবু, বন্ধুর সংজ্ঞা যে আজও একই আছে, সেখানেই ‘বরযাত্রী’ বড়ো প্রাসঙ্গিক। প্রবল মনখারাপ নিয়েও, এ সিনেমা দেখতে বসলে দেড়ঘণ্টা পর মনখারাপের কারণ যে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, তা মোটামুটি নিশ্চিত করেন এ ছবির কলাকুশলী, বাংলা ছায়াছবির দিকপাল কালী ব্যানার্জি, অনুপকুমার, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়রা। দম ফাটানো হাসি আর ছোটোবেলার ইতিবাচক বদমায়েশির ওপর ভিত্তি করে বন্ধুতার সারকথাটিই দেড় ঘণ্টা ধরে বলে যায় রাজেন, ঘোৎনা, গণশারা। ‘বরযাত্রী’ তাই যত না বিয়ের গল্প, তার চেয়ে অনেক বেশি খাঁটি বন্ধুত্বের গল্প।

