১৯৫৮ সালে প্রফুল্ল চক্রবর্তীর পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ করে ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’
বসন্তের দুপুর। গাছের ছায়ায় বসে আছে প্রেমিক যুগল; সিদ্ধেশ্বর ও মাধুরী। থিয়েটার, যাত্রাপালা করে বেড়ানো সেই সিদ্ধেশ্বর ওরফে সিধু তার হবু স্ত্রী মাধুরীর কাছে একটা গান শুনতে চাইবে, সে তো স্বাভাবিক। কিন্তু মাধুরী সেই প্রেমের উত্তুঙ্গ মুহূর্তে ভালোবেসে কালীকীর্তন শোনাবে, এ কেবল সিদ্ধেশ্বর কেন, দর্শকের কানেও বেশ অস্বাভাবিক। তবে কালী কীর্তন থেকে খালি (কেবলমাত্র) কীর্তন অর্থাৎ সিধুর কথায় রাধা-কৃষ্ণের মিলন গীতে পৌঁছাতে যতটা বাঁক বদলাতে হয়, আমাদের প্রত্যেকের ধারণায় সমাজ সংসার নির্ধারিত ‘স্বাভাবিকতা’ ও ‘অস্বাভাবিকতা’-রও পার্থক্য সেটুকুই। গতানুগতিককেই আমরা নিয়ম বলে জানি এবং মানি, তাতে ভুল থাক আর ঠিক থাক। অন্যায় হতে দেখলেও নিজের পিঠ তো বেঁচে গেল এই আনন্দে আমরা পাশ ফিরে শুই। প্রতিবাদটুকু করার মুরোদ হয় না। স্পষ্ট কথা স্পষ্টভাবে বলে সিস্টেমকে পাল্টে দিতে পারার স্বপ্ন দেখে খুব কম লোকই। আর সেইরকম এক মানুষকে নিয়েই গল্প ফেঁদেছিলেন দীনবন্ধু মিত্র।

গল্পের নাম অপরিবর্তিত রেখেই ১৯৫৮ সালে প্রফুল্ল চক্রবর্তীর পরিচালনায়, বিপ্লবী অনন্ত সিংহের প্রযোজনায় ‘রাজকুমারী চিত্রমন্দির’-এর ব্যানারে আত্মপ্রকাশ করে ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’। এমনিতে তুমুল হাসির সিনেমা হলেও ‘দি লেজেন্ড’ ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত ‘সিদ্ধেশ্বর’, এই ছায়াছবির পরতে পরতে ছড়িয়ে রেখেছেন তীব্র স্যাটায়ার; সমাজের প্রতি, এই সিস্টেমের প্রতি।

বাস্তবের অনেক সমস্যার সমাধান হয় স্বপ্নে। মন যেমনটা চায়, সেভাবেই হয় স্বপ্নের বুনন। বড়োলোক বাবা হরিনারায়ণের মেয়ে মাধুরীকে বিয়ে করার মাশুল হিসেবে বাস্তবে সিধুর কপালে জোটে বিস্তর মার। ওদিকে আত্মঅবমাননায় মাধুরীও জলে ঝাঁপ দেয়। সংসার বিবাগী হয়ে সিধু কেবল মাধুরীকেই পেতে চেয়েছিল। স্বপ্নে তাই যমালয়ে যাত্রা করে সে। জ্যান্ত মানুষ যাচ্ছে যমালয়ে, প্রথার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আসছে দ্বিমত। একটু তালগোল তো পাকবেই। এখানেও তেমনটা হল। বহুবার দেখা হলেও এই কালজয়ী সিনেমাটি পুরোনো হয় না। সমকালের প্রতিটি ঘটনা, দুর্নীতি, পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দিব্যি ফের দেখা হয়ে যায় জ্যান্ত মানুষে অতিষ্ঠ যমলোকের অবস্থা।

পেটের দায়ে উঁদোর পিন্ডি বুঁদোর ঘাড়ে চাপিয়ে জোর জবরদস্তি প্রমাণ দাখিলের চেষ্টা চলে সর্বত্র। যমলোকের কর্মচারীরাই বা এর বাইরে যায় কী করে! তাই ভুল করে জ্যান্ত অথচ ঘুমন্ত সিধুকে তারা উড়িয়ে নিয়ে যায় ধর্মরাজের কাছে। ধর্ম মানে যে ন্যায়! তাই সিদ্ধেশ্বর তারপর থেকে কোনটা প্রকৃত ন্যায় আর কোনটা অন্যায়-অবিচার তা একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে থাকে। চারপাশে ঠিক যেমনটা হয় তার হুবহু প্রতিলিপি তৈরি হয় হাসির আড়ালে। দোষ প্রমাণের আগেই অপরাধী সাব্যস্ত করা, ঘুষ দিয়ে শাস্তি কমানো, পাপ আর পুণ্যের হিসেবে বিস্তর গরমিল এসবের কোনোটাই বাদ পড়ে না এখানে। ব্রাহ্মণ সন্তান হয়ে অন্য জাতের মরা পোড়ানোয় সিদ্ধেশ্বরের কপালে নেমে আসে পাপের ভার। অথচ মানুষের উপকারেই পুণ্য হয়, এ কথা স্বতঃসিদ্ধ। এমনকি সিধুর বিধবা পিসি জৈষ্ঠ্য মাসের নির্জলা উপবাসের দিন বাতাসা দিয়ে একটু জল খাওয়ার কথা কেবল ভেবেছিল বলেই তার ভাগে জোটে পাপ। যমরাজের কাছে প্রশ্ন তোলে সিদ্ধেশ্বর। এ প্রশ্ন তো আসলে সমাজের কাছে, সভ্যতার কাছে। তাই একসময় ধর্মরাজ উত্তর দিতে বাধ্য হয়, ‘নিয়ম পরিবর্তনের দরকার’। বুড়ো চিত্রগুপ্তের জায়গায় কাজে ও চিন্তাভাবনায় সমাদৃত হয় ‘ইয়ং ব্লাড’ বিচিত্রগুপ্ত। এ যেন আধমরাদের ঘা মেরে বাঁচাতে চাওয়ার অনবদ্য চেষ্টা। কালোবাজারি, চাল চুরি, টাকা চুরি, খাদ্য সংকট, তেলা মাথায় ভালো করে তৈলমর্দন এ সবকিছুর বিরুদ্ধেই সরব সিদ্ধেশ্বর। সিধুরূপী ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত সংলাপ ‘ভোলা গুঁতো, ভোলা গুঁতো’ কানে বেজে থাকে এই সিনেমায়।

নিয়মের নামে চলা গুচ্ছেক বেনিয়মকে ঘাড় ধরে তাড়াতে চায় সে। যমলোকে রেভেলিউশন এনে দেয় এই সিদ্ধেশ্বর। অপঘাত থেকে শুরু করে অন্য যেকোনো ভাবে ঘটা মৃত্যুর বিধানে আমূল পরিবর্তন এনে দেয় সে। শুধু কি তাই! আধুনিক গানের নামে সুরে সুরে মুখস্থ বলা কবিতা, আধুনিক নাচের নামে কেবল হাত পা ছোড়ার অন্তঃসারশূন্যতা, এসবের বিরুদ্ধেও ব্যঙ্গের কষাঘাত জুটেছে এখানে। ইন্দ্রলোকের অপ্সরাদের ‘হাম হাম গুড়ি গুড়ি’ নাচ শেখানো, দেবর্ষি নারদকে ‘পেট পাতলা’ বলে সিদ্ধেশ্বরের গাল পাড়া, ঝড় বন্যা মহামারির মতো দুর্যোগের জন্য দায়ী মানুষরা যখন দোষ দেয় ভগবানকে, তখন বিষ্ণু কেন চুপ করে থাকেন বলে নারায়ণের কাছে সিধুর অভিযোগ, হাইড্রোজেন বোমা হাতের খেলনার মতো তুলে নেওয়া মনুষ্যত্বহীন, ক্ষমতালোভী মানবসমাজের ছবি বিস্তারিত তুলে ধরা; এই সব দৃশ্যেই হাসতে, হাসতে আমাদের বিবেকের সামনে আয়না তুলে ধরে সিদ্ধেশ্বর।
আধুনিক বাঙালি তার পুজো পার্বণের অঙ্গ করে নিয়েছে তারস্বরে বাজানো লাউডস্পিকারকে। সে বিষয়টিও ছাড় পায়নি ব্যঙ্গের হাত থেকে। শিবলোকে মা পার্বতীর সঙ্গে সিধু দেখা করতে চাইলে নন্দী-ভৃঙ্গী জানান দেবী দুর্গা সবে মর্ত্য থেকে ফিরেছেন। পুজোর পাঁচদিন মণ্ডপে যথেচ্ছ মাইক বাজায় দেবীর কানে এখন তালা। তাই দেবীর কানে এখন কোনো কথাই ঢুকবে না। প্রকৃত শিল্পী তাঁর কদর পায় না, বিষ্ণুলোকেও সে বিষয়ের অন্যথা হয় না। তাই, নারদকে দেখে আফসোসে সিধু বলে বসে, আহা গো এমন ভালো গান করে যে দেবতা তার কপালে একটা বাহন জোটে না! ছোট্ট একটা ঢেকি চড়ে তাঁকে কিনা ঘুরতে হয়!

বাঙালির বুদ্ধি, চিন্তা, মনন, প্রতিবাদ সারা বিশ্বে চিরকাল সমাদৃত। ষাটের দশকের এই ছায়াছবিতে এই বিষয়টিকেই প্রায় ট্যাগলাইনে পরিণত করা হয়েছে। দেবর্ষি নারদ, দেবরাজ ইন্দ্র থেকে শুরু করে বিষ্ণু নারায়ণ, যমরাজ সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেছেন সাধারণ মানুষ হলে তারা এতটা বিপদে পড়তেন না, জ্যান্ত বাঙালি হিসাবে যমালয়ে ঢুকে পড়েছে বলেই তাদের সবাইকে সিদ্ধেশ্বরকে সমঝে চলতে হচ্ছে৷
মশলাদার নানান খাবারের তেলে ঝোলে, বিরিয়ানির আলুতে মজে যে তর্কপ্রিয় বাঙালি এযাবৎ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুখে থুড়ি সোশ্যাল মিডিয়ায় জগৎ কাঁপাতে মত্ত, স্পষ্ট কথা ভুলে, প্রতিবাদ বলতে বেশিরভাগ বাঙালিই আজ যখন মোমবাতি মিছিলেই বেশি নিশ্চিন্তি বোধ করেন, তাদেরকে বেশ চমকপ্রদভাবে ফের আরেকবার নিঃসন্দেহে নাড়িয়ে দেবে ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’। এখন, ইউটিউব লিংকে ক্লিক করে ঘণ্টা দুই সময় হাতে নিয়ে কেবল বসে পড়লেই হল।