
লন্ডনের Daily Telegraph তাঁকে “The Lightening Sculptor” নামে অভিহিত করেছিল
বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশনে বসানো হবে রামকৃষ্ণদেবের মূর্তি। ইতালিয়ান মার্বেলে তৈরি ধ্যানস্থ মূর্তির চোখ আধ-বোজা। মুখে শান্ত, সমাহিত ভাব। কিন্তু কিছুতেই ওই স্বর্গীয় ভাব ফুটিয়ে তুলতে পারছেন না নামকরা বহু দেশি-বিলিতি শিল্পীই। শেষ পর্যন্ত ডাক পড়ে খাস কলকাতার কাশী মিত্র ঘাট স্ট্রিটের গোপেশ্বর পালের (Gopeswar Pal)। তাঁরই দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় শ্বেতপাথরের প্রকাণ্ড চাঙড়টা ক্রমশ পরমহংসদেবের রূপ নিতে শুরু করে। শোনা যায় রামকৃষ্ণদেবের পরিচিত এক ব্যক্তিকে মূর্তির সামনে আনা হলে প্রায় অন্ধ ওই ব্যক্তি মূর্তির মুখে হাত বুলিয়ে বলে ওঠেন, ‘এ যে আমাদের গদাই!’ কুমোরটুলি-সংলগ্ন কাশী মিত্র ঘাট স্ট্রিটে বিশ্বমানের এক স্টুডিয়ো গড়েছিলেন সেযুগের বিশিষ্ট প্রতিমাশিল্পী গোপেশ্বর পাল। সেখানে আজও রাখা রয়েছে তাঁর তৈরি বেশ কিছু মূর্তি। রাখা আছে বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশনের পরমহংসের মূর্তিটির ‘নেগেটিভ’। এহেন গোপেশ্বর পাল জড়িয়ে রয়েছেন একাধিক ঐতিহাসিক ও দুঃসাহসিক কাজের সঙ্গে।

কলকাতার সর্বপ্রথম বারোয়ারি পুজো বাগবাজারের পুজো (Bagbazar Sarbojanin Durgotsav), এ কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু, অনেকের মতে কলকাতার প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপুজো ভবানীপুরের বলরাম বসু ঘাট স্ট্রিটের ‘সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা’র দুর্গোৎসব। সঙ্গত কারণও আছে তার। প্রমাণিত তথ্য এই যে এদের কাছ থেকে দশকর্ম ভাণ্ডারের ফর্দ নিয়ে বাগবাজারের ১৯১৮-র পুজোর বাজার শুরু হয়। আদিগঙ্গা সংলগ্ন ঘাটটি গোবিন্দপুরের সতীস্থল বলে চিহ্নিত। আজও সেখানে বিদ্যমান সেই সাক্ষ্যবহনকারী ফলকটি। মজে যাওয়া আদিগঙ্গার সংলগ্ন পুজোস্থলের অনতিদূরেই সতীপাঠ, কালীঘাট। ফলে স্থানমাহাত্ম্যে সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেকখানিই। কিন্তু উদাসীনতার কারণেই হোক বা পৃষ্ঠপোষকতার অভাবেই হোক এই বারোয়ারি পুজো গুরুত্ব হারিয়ে ঐ মজে যাওয়া আদিগঙ্গারই রূপ নিয়ে নিয়েছে।
পক্ষান্তরে, স্থানমাহাত্ম্যের সামাজিক গুরুত্ব হেতু বাগবাজার কিন্তু শতবর্ষ পরেও জৌলুসহীন হয়ে পড়েনি। বারোয়ারি পুজোর আয়োজন একরকম বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত বৈকি। প্রাথমিক ভাবে যুবসমাজকে উদ্ধুদ্ধ করার কাজে এই পাঁচদিনের পুজো আয়োজনের ভূমিকা ছিল বিরাট। ফলে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে শুরু করে, শরৎচন্দ্র বসু প্রমুখ রাজনৈতিক নেতারা পুজোর প্রধান কর্ণধার রূপে অবতীর্ণ হতেন। বাগবাজার, সিমলা ব্যায়াম সমিতি, বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাব থেকে শুরু করে দক্ষিণের সমাজসেবী, বালিগঞ্জ কালচারাল সঙ্ঘশ্রী, সঙ্ঘমিত্র, সহযাত্রী, মুক্তদল, ফরওয়ার্ড ক্লাব, যুবমৈত্রী – সর্বত্রই চিত্রটা একইরকম ছিল। আজও বাগবাজারে ধুমধাম করে বীরাষ্টমী পুজো হয়, গ্রামীণ মেলা বসে, লাঠি খেলা ইত্যাদির প্রদর্শন নিয়ম করে হয়। এই যে পুজোর ছলে যুবসমাজকে দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ করে রাখা এও একপ্রকারের থিম আর সেই থিমকে ঘিরে আচার অনুষ্ঠান এবং পুজো আবহ নির্মাণ – ব্যাপারটা এখনও চলছে।
১৯১৯ সালে এই পুজো শুরু হয়েছিল নেবুবাগানে। স্থান-নাম অনুযায়ী পুজোর নাম ছিল ‘নেবুবাগান বারোয়ারী’। ১৯২৬-এ এই ‘নেবুবাগান বারোয়ারী’ই নাম পাল্টে হল ‘বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব’। শুরুর দিকে একচালা বিশিষ্ঠ বাগবাজারের প্রতিমা গড়তেন নিরঞ্জন পাল তারপর দীর্ঘ কয়েক দশক পর প্রতিমা গড়েন জিতেন পাল । জিতেন পালের সময় থেকেই মা দুর্গার সাজ আলাদা করে অর্ডার দিয়ে বানানো হতো। কৃষ্ণনগরের রথীন সাহা বানাতেন মা দুর্গার সাজ ও অলঙ্কার। শুরু থেকেই বাগবাজারের প্রতিমার রীতিনীতি মেনে এপার বাংলার কৃষ্ণনগরী-ঘুণী ঘরানার মৃৎশিল্পীরাই করে আসছেন । ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে এই পুজোর সভাপতি ছিলেন নেতাজি। সেই সময় বাগবাজার ছাড়াও আরো একটি পুজোর তিনি সভাপতি ছিলেন, পুজোটির নাম হলো কুমারটুলি সার্বজনীন । কুমারটুলি অঞ্চলের নিজস্ব সর্বজনীন দুর্গাপুজার সূচনা হয় ১৯৩৩ সালে। গোপেশ্বর পাল ছিলেন কুমারটুলি সর্বজনীনের প্রতিমার নির্মাতা। উত্তর কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পুজো কুমোরটুলি সার্বজনীন৷ কুমোরটুলির শিল্পীরা মিলেই এই পুজো শুরু করেন৷ পুজোর প্রথম সভাপতি ছিলেন স্যার হরিশংকর পাল৷ সাতবছর পর কমিটির পক্ষ থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে পুজোর দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয় এবং কমিটির নতুন সভাপতি হন সুভাষ চন্দ্র বসু। ১৯৩৮-এ স্যার হরিশংকর পাল কমিটি থেকে বেরিয়ে গিয়ে কুমোরটুলি সার্বজনীনের পাশেই আলাদা করে একটি দুর্গাপুজো করেন৷ পরবর্তীকালে সেই পুজো হাটখোলা গোঁসাইপাড়া নামে পরিচিত হয়।
সেই সময় একচালা প্রতিমার পুজো করার চল ছিল সর্বত্র। সেবার নিয়মমতো কুমোরটুলি সার্বজনীন-এর মণ্ডপেও চলে এসেছে একচালার মা দুর্গা, কিন্তু পঞ্চমীর দিনই ঘটে গেল মহাবিপত্তি৷ সন্ধেবেলায় হঠাৎ করে মণ্ডপে অগ্নিকাণ্ড ঘটে যায়৷ মণ্ডপ, প্রতিমা সব পুড়ে ছাই৷ অথচ পরের দিনই বোধন৷ নেতাজি ছুটে গেলেন শিল্পী গোপেশ্বর পালের কাছে৷ বললেন, যেভাবেই হোক এক রাতের মধ্যে ঠাকুর তৈরি করে দিতেই হবে৷ সেকথা শুনে তো শিল্পীর মাথায় হাত, মুহূর্তের মধ্যে সুভাষ চন্দ্র বসু ও গোপেশ্বর পাল আলোচনা করে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন, আলাদা আলাদা করে প্রতিমা গড়া হবে৷ গোপেশ্বর পাল দুর্গা প্রতিমা গড়লেন৷ আর অন্যান্য শিল্পীরা গড়লেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গনেশ৷ একচালা ভেঙে তৈরি হল পাঁচ চালার ঠাকুর৷ এক রাতের মধ্যেই সব তৈরি৷ ষষ্ঠীর দিন মন্ডপে তৈরি হলো প্রথম পাঁচ চালার ঠাকুর৷ সেবার একেই তো ছিল পাঁচ চালা আর তার উপর ছিল দেবীর জমকালো সাজসজ্জা, এইসব দেখে পুরোহিত সমাজ বেঁকে বসেছিল৷ তারপর গোপেশ্বর পালের সঙ্গে বহু আলোচনার পর খোঁজ মেলে পুজোর পুরোহিতের৷ তবে এতেই শেষ নয়, পরের বছর ১৯৩৯ সালে সুভাষ চন্দ্র বসু পুজো কমিটির সভাপতি থাকাকালীন কুমোরটুলি সার্বজনীনের দেবী দুর্গার গায়ে উঠেছিল সত্যিকারের বাঘের ছাল৷ তা দেখার জন্য সেবার ভীড় উপচে পড়েছিল মণ্ডপে। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে প্রথম থিমের প্রতিমা গোপেশ্বর পালের হাতেই গড়ে ওঠে।

প্রসঙ্গত, কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণী অঞ্চলে মৃৎশিল্পী-পরিবারে তাঁর জন্ম। ছোটো থেকেই হাতযশ ছিল গোপেশ্বরের। ছোটোলাট লর্ড কারমাইকেল তাঁকে “The Lightening Sculptor” নামে অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তীতে, ১৯২৪ সালে গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ পার্সি ব্রাউনের উদ্যোগে ইংল্যান্ডে এক শিল্প প্রদর্শনীতে যোগ দেওয়ার পর, হাতের কাজ দেখে লন্ডনের Daily Telegraph তাঁকে ওই নামে অভিহিত করেছিল এবং স্বর্ণপদকে সম্মানিত হয়েছিলেন।

কয়েক বছর আগেই রাজ্য হেরিটেজ কমিশন গোপেশ্বর পালের স্টুডিওকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তারও আগে কুমারটুলি স্ট্রিটের কিয়দংশের নামকরণ করা হয় গোপেশ্বর পাল স্ট্রিট। গোপেশ্বর পালের দৌহিত্র আশিস পাল এবং আত্মীয় ব্যোমকেশ পাল আপাতত সেই স্টুডিয়োর দায়িত্বে রয়েছেন।
তথ্যসূত্রঃ
কলকাতার পুজোর পালাবদল, পার্থ দাশগুপ্ত (বঙ্গদর্শন আর্কাইভ)
আনন্দবাজার পত্রিকা
Get Bengal
এই সময়
