শিল্পী বাঁধন দাসের ‘হীরালিনী দুর্গোৎসব’ : সোনাঝুরি জঙ্গলে এক ব্যতিক্রমী মিলন-পরব

লোকশিল্প-সৃজনের অপর নাম লালমাটির দেশের এই দুর্গাপুজো

“প্রতিমা তো প্রতিমাই। আমরা সাধারণত দেখি, অসুরকে খুব পিটায় দুর্গা। যেটা আমি পছন্দ করি না। স্কুলে পড়াতে গিয়ে দেখেছি, যদি কাওরে কিছু কোরতে হয়, যদি বদলানোর প্রয়োজন পড়ে, তাহলে আমার মনে হয় একমাত্র জ্ঞানের মাধ্যমেই তা সম্ভব। এইবারের দুর্গাপুজোয় আমি যে প্রতিমা ‘কনসিভ’ করার চেষ্টা করসি—শুধু দুর্গা নন, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক সকলের হাতেই অস্ত্রের বদলে পদ্ম। পদ্মকে জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে দেখাতে চেয়েছি। এমনকি অসুরের হাতেও সে অর্থে আমি কোনও অস্ত্র তুলে দিইনি। আমরা চতুর্দিকে যা দেখছি, যা যা বিশ্বাস করি, আমাদের সমস্ত বিশ্বাসকে আমরা গায়ের জোরে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করি। আমরা একে অপরের সঙ্গে যে আচরণ করি, তা খুবই দুঃখের। এটা গভীর ভাবে ভাববার বিষয়। গায়ের জোরে বা অস্ত্রের জোরে নয়, কোনও কিছু প্রতিষ্ঠা করতে গেলে, তার মনোজগতে প্রবেশ করতে হলে, জ্ঞানের মাধ্যমে করতে হবে। আমার দুর্গাকে আমি সেভাবেই গড়েছি।”

প্রতিমার বিশেষত্ব নিয়ে কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত নির্মিত একটি তথ্যচিত্রে দুই বাংলার উচ্চারণ মিলিয়ে-মিশিয়ে এই কথাগুলিই নিজ মুখে বলেছিলেন শিল্পী বাঁধন দাস (Artist Bandhan Das)। তখন ২০০২ সাল। তখনও তিনি জানতেন না, নিজের হাতে গড়া অধুনা জনপ্রিয় ‘হীরালিনী দুর্গোৎসব’-এ (Hiralini Durgotsav) পরের বছর আর থাকতে পারবেন না, শুধু দুর্গাপুজো নয় সবকিছুকেই আজীবনের জন্য বিদায় জানাতে হবে, তখনও আশায় বুক বাঁধছেন কীভাবে উৎসবের মাধ্যমে, মাতৃ আরাধনার মাধ্যমে আদিবাসী জনজীবনকে জ্ঞানের মুক্ত পরিসর দেবেন। সেবছরই শেষবার দুর্গোৎসব কাটানো, ওই বছরই (২০০২) ডিসেম্বর মাসে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে অকালে চলে যান তিনি ।

২০০২ সালে, সেই শেষবার আত্মজা কাঠের প্রতিমার সামনে বাঁধন দাস

বাঁধন দাস ছিলেন কলকাতা সরকারি চারুকলা মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক। শান্তিনিকেতনের তপ্ত মাটি, ছায়া-বনবীথিকা তাঁর আপনার হয়ে উঠেছিল, তা কেবল শিল্পী হওয়ার সুবাদে নয়, এর নেপথ্যে কাজ করতো শিকড়ের টান। ওপার বাংলা থেকে চলে আসার পর ছোটোবেলায় অনেকটা কাটিয়েছিলেন আসামে। “কলকাতায় যখন প্রথম পা রাখি, পুরো শহরটাই আমার কাছে আশ্চর্যজনক মনে হয়েছিল। যেহেতু ছোটোবেলা কেটেছিল আসামে, সেখানকার গভীর জঙ্গল খুব কাছ থেকে দেখেছি, শিকড়ের সেই টান থেকেই শান্তিনিকেতনে থাকতে শুরু করা, সাঁওতাল আদিবাসীদের নিয়ে এই পুজোর আয়োজন। প্রতিমা নির্মান নিয়ে আমার কোনও পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না।” বলেছিলেন বাঁধন দাস।

শান্তিনিকেতনের (Santiniketan) অদূরে বনেরপুকুর ডাঙায় জঙ্গলের মধ্যে কয়েক বিঘে জমি কিনে নিজস্ব আস্তানা – নিজের স্টুডিও বানিয়েছিলেন ১৯৯০ সালে। ২০০১ সালে শিল্পী বাঁধন দাস এবং তাঁর ছাত্র আশিস ঘোষ স্থানীয় আদিবাসীদের নিয়ে বেলবরণ পরবের মেলবন্ধনে এই দূর্গোৎসবের সূচনা করেন। শিল্পীসত্তা  এবং আদিবাসী সমাজের মেলবন্ধনে প্রথম বছর হয় টেরাকোটার মূর্তি। দ্বিতীয় বছর কাঠ দিয়ে তৈরি করেছিলেন প্রতিমা। দেবীর দশ হাতে থাকে না কোনও অস্ত্র। পরিবর্তে শান্তির প্রতীক হিসেবে দশ হাতে দশটি ফুল দেওয়া হয়। এই ভাবেই দু’দশক সোনাঝুরি জঙ্গলে পূজিত হয়ে আসছেন দশভূজা। বাঁধন দাসের মৃত্যুর পর তাঁর বোন চিত্রা এবং ভগ্নীপতি আশিষ ঘোষ এই পুজোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। বাঁধন দাসের ইচ্ছেকে মর্যাদা দিয়েই এরপর প্রতিমা গড়া হয়েছে যথাক্রমে বাঁশ, মাটি এবং লোহা দিয়ে। আশিষবাবু নিজেও শিল্পী। তিনি ও তাঁর ছাত্ররা মিলেই রূপ দিয়েছেন প্রতিমায়। বনেরপুকুর ডাঙা, ফুলডাঙা, সরকারডাঙা, আর বল্লভপুর ডাঙা- মোট চারটি গ্রামের মানুষরা মিলিত হন এই উৎসবে। বাইরে গড়া হয় মঞ্চ। চারদিন গ্রামের যাত্রা পালা চলে। থাকে আদিবাসী শিল্পীদের নাচ গান, সঙ্গে বাউলগান। হাতে গড়া শাড়ি, অলঙ্কার বা বাঁশি, একতারা -এসব সম্ভার নিয়ে হীরালিনী দুর্গোৎসব এখন রাজ্যের উৎসবের বাজারে এক নজরকাড়া কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

বাঁধন দাসের এক দিদির নাম ছিল হীরা আর বাবা ছিলেন নলিনী দাস। তা থেকেই ‘হীরালিনী’। কিন্তু এমন একটি পারিবারিক নামকরণের ইতিহাস নিয়েই এই পুজো কেমন করে যেন স্থানীয় সাঁওতাল গ্রামবাসীদের নিজের উৎসবে পরিণত হল। এখানে কেন দুর্গাপুজো শুরু করলেন, সে বিষয়ে তথ্যচিত্রে জানিয়েছিলেন, “এই অঞ্চলে থাকার সময় আমি একবার খরা দেখেছিলাম। একটা গোটা মাঠ জ্বলে পুড়ে গিয়েছিল এবং প্রচণ্ড জলাভাব। তখন আমার মনে হয়েছিল যদি কিছু করা যায়। কলকাতায় কিছু মানুষজনের সঙ্গে কথা বলি, বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসি, গাছপালা রোপণের বন্দোবস্ত করি কিন্তু এখানকার বাসিন্দাদের উৎসাহিত করতে পারিনি। এই উৎসবকে ওদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির, সম্বন্ধ স্থাপনের একটা উপায় মনে হয়েছিল আমার। একেক জন একেক ভাবে দুর্গাপুজোকে দেখেন, আমার কাছে এই উৎসব সামাজিক সংযোগের একটা বৃহৎ মাধ্যম ব্যতীত অন্য কিছু নয়। এই পুজোকে কেন্দ্র করে আমার উদ্দেশ্য থাকে সাঁওতালদের নাচ-গান, হাতের কাজ ইত্যাদি প্রকাশ্যে আনা। ওরা ওদের সংস্কৃতিকে এই উৎসবের আঙিনায় নিয়ে আশার যে চেষ্টা করছে, সেটা খুব ভালো ব্যাপার। আমার কোনও ধর্ম নেই, এটাই আমার ধর্ম।”

কট্টর বামপন্হী এবং ঘোরতর নাস্তিক হওয়া সত্ত্বেও সেই মানুষটি কিনা দুর্গাপুজো নিয়ে মেতে উঠলেন! নানা জনের এই কৌতুহল দেখে বাঁধন দাস সাফ বলতেন তিনি কোন ধর্মীয় উপাচার নয় মায়ের পুজো করেন। মা কে শ্রদ্ধা সম্মান জানানোর এটাও একটা পথ তাঁর মতে। তাই তাঁর সৃষ্টি করা প্রতিমায় কোথাও অসুর বধ হয় না। তাঁর বানানো দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিকের মধ্যে একটা বিশেষ যৌথভাব লক্ষ্য করা যায়—লোক আঙ্গিকের। যাঁদের জন্য এই দুর্গা, সেই গ্রামবাসীদের মূর্তি বা ভাস্কর্য সম্বন্ধে যে ধারণা, তার কাছাকাছি রাখার জন্য একধরনের আকারে গড়া হয় প্রতিমাগুলি। তাঁর গড়া প্রতিমাগুলি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন, যেকারণে পোড়ামাটি বা কাঠের মতো ‘পারমানেন্ট মেটিরিয়াল’ ব্যবহার করে প্রতিমা বানাতেন।

বাঁধন দাসের জন্ম ওপার বাংলায়। দেশভাগের পর ১৯৪৭-এ পরিবারের সঙ্গে তিনি এদেশে চলে আসেন। স্কুল ফাইনাল পাশ করার পর ১৯৬১-তে কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৬-তে চিত্রকলার স্নাতক হন। ষাটের দশকে ইডেন গার্ডেনে প্রতি বছর নিয়মিত যুব উৎসব হত। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল সেই ‘ইয়ুথ ফেস্টিভালের’। বাঁধন ছাত্র অবস্থাতেই ছিলেন সেই উৎসবের একজন উজ্জ্বল তরুণ কর্মী। ওখানে ছবি ও পোস্টার করতেন তিনি। সেগুলি প্রচারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সৃজনাত্মক হয়ে উঠত অনেক সময়ই। এই রাজনৈতিক চেতনা ও মানুষের প্রতি ভালবাসাই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে আদিবাসী ও লোকশিল্পীদের উন্নয়নে ও সৃজনে অনুপ্রাণিত হতে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আদিবাসীদের মধ্যে এক সুপ্ত শিল্প সত্তা আছে- তিনি সেই সত্তাকেই জাগিয়ে তুলেছিলেন, আর তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ পেয়ে সেই আদিবাসী যুবকেরা এখন শিল্পী হয়ে উঠেছেন। বাঁধন দাসের ইচ্ছা ছিল পাঁচবছর পুজো হয়ে গেলে, পরবর্তী বছরগুলোতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আগের প্রতিমাতেই পুজোঅর্চনা হবে। আগের বছর পর্যন্ত সে প্রথাই বহাল ছিল। বহু মানুষ এই পুজো দেখতে দূর থেকে ছুটে আসেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে পুজোর দিনগুলিতে যে অনুষ্ঠান তা বন্ধ রাখা হয়েছিল। এই বছর কেমন হবে প্রতিমা, কেমন ভাবে সাজানো হবে গোটা ‘হীরালীনি দুর্গোৎসব’-এর পুজোপ্রাঙ্গণ, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে বীরভূমবাসী এবং আপামর শিল্পপ্রেমী দর্শনার্থীরা।

তথ্যসূত্রঃ

‘বাঁধন দাশের পূর্বাপর’ – পার্থ দাশগুপ্ত, ‘বঙ্গদর্শন’ আর্কাইভ

তথ্যচিত্র, কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত

সময়ের গভীরে জমে থাকা ক্ষতের প্রতীকী, আনন্দবাজার পত্রিকা

শান্তিনিকেতনের হীরালীনি দুর্গোৎসব, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Developed by DXDasia