স্বাধীনতা-পূর্ব যুগ থেকেই এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল স্বদেশি হাওয়া
প্রশ্নটা যদি এরকম হয়, ‘জমজমাট থিম, কন্টেম্পোরারি প্রতিমা ছাড়াই কলকাতার হাজারো দুর্গাপুজোকে দশ গোল দিতে পারে কোন পুজো?’ পাড়ার ফালতুদাও চোখ বন্ধ করে উত্তর দিয়ে দেবে- ‘বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব’। ওরকম ভরাট দুগ্গা-মুখ, একচালার সাবেকিয়ানা, রাজকীয় ডাকের সাজ…সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় ‘অদ্বিতীয়’।
২০১৮ সালেই বাগবাজার সর্বজনীন-এর বয়স একশো পেরিয়েছে। উত্তর কলকাতার এই পুজোর শিকড় কিন্তু অনেক গভীরে, যেখানে পৌঁছলে খুঁজে পাওয়া যাবে বাংলার রত্নখচিত স্মৃতি-সত্তা। শুরুতে দুর্গাপুজোর একচেটিয়া অধিকার ছিল ‘বাবু’দের। আন্তরিকতার থেকে সে পুজোয় অতিরঞ্জন ছিল বেশি। সেরকমই এক ‘বাবু’র পুজোয় সাধারণ মানুষ, গরিব মানুষরা অপমানিত হয়ে প্রসাদ না পেয়েই ফিরে গেছিল। তারপরেই, ১৯১৮ সালে ঠিক হয়, সকলে মিলে এমন দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হবে যেখানে বিভেদ থাকবে না, সেই পুজো হবে সর্বসাধারণের। সেইমতো ১৯১৯-এ উত্তর কলকাতার নেবুবাগানে শুরু হয় পুজো। স্থানের নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুজোর নাম দেওয়া হয়, ‘নেবুবাগান বারোয়ারি’। কয়েকবছর বাদেই, ১৯২৬-এ সেই পুজোর নাম বদলে হয় ‘বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব’।
সেসময় কলকাতার মেয়র পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। তাঁর সহায়তায় পুজোর আগে-পরে মিলিয়ে প্রায় ৩০-৪০ দিনের জন্য পাওয়া গেছিল কর্পোরেশনের মেটাল ইয়ার্ড। সেই থেকে সেখানেই চলে আসছে এই পুজো। তাবড় তাবড় ব্যক্তিত্বের নাম জড়িয়ে রয়েছে এই পুজোর সঙ্গে। এই পুজো-প্রতিষ্ঠানের সভাপতি তালিকা অবাক করার মতো। ১৯৩০-৩৩ এই পুজোয় সভাপতি ছিলেন দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বটকৃষ্ণ পালের ছেলে, স্যার হরিশঙ্কর পাল দু’দফায় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন, যিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করে ত্রিশ পেরোতে না পেরোতেই ইউরোপ ঘুরে এসেছিলেন এবং টানা ২৪ বছর কলকাতা কর্পোরেশনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। দেশব্রতী, শিক্ষা ও খেলাধুলোর উন্নতিতে অকুণ্ঠ দাতা, সাংবাদিক-সম্পাদক কুমার বিশ্বনাথ রায়ও সভাপতি হয়েছিলেন। রসগোল্লার দুই প্রাণপুরুষ, নবীনচন্দ্র ও কৃষ্ণচন্দ্র দাশের সুযোগ্য উত্তরসূরি সারদাচরণ দাশ পুজোর সভাপতি ছিলেন। এই বাগবাজার থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছিল আধুনিক রসগোল্লার।
কিন্তু, এই পুজোর সঙ্গে যে সভাপতির নাম সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভাবে জড়িয়ে রয়েছে, তিনি হলেন- সুভাষচন্দ্র বসু। ১৯৩৮-৩৯ সাল পর্যন্ত তিনি বাগবাজার সর্বজনীনের সভাপতির পদে ছিলেন। ১৯৩৮-এর প্রদর্শনীতে সার্টিফিকেট অব মেরিট পেয়েছিল ‘ক্যালকাটা কলাপসিবল গেট কোম্পানি লিমিটেড’, সুভাষচন্দ্রের সই-করা সেই শংসাপত্রের কপি সযত্নে রাখা আছে পুজোকর্তাদের কাছে।
প্রফুল্লচন্দ্র রায় থেকে আশাপূর্ণা দেবী, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় থেকে বালক ব্রহ্মচারী। সাহিত্যিক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত থেকে ড. ত্রিগুণা সেন, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিকাশ রায় – বাগবাজার পুজোর ‘উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতি’ তালিকাও ছিল নক্ষত্র খচিত। আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বাগবাজারের পুজোয় অষ্টমীর দিনটা ‘বীরাষ্টমী’ নামেই খ্যাত। কেন ‘বীরাষ্টমী’? কারণ, এই পুজোয় স্বাধীনতা-পূর্ব যুগে স্বদেশি হাওয়ায় অষ্টমীর সকালে পুজোর মাঠে লাঠিখেলা, ছুরি খেলা, কুস্তির মতো দেশজ খেলা হত। সাহেবরাই শক্তিমান, বাঙালি ভীরু, দুর্বল, এই বিশ্বাস ভাঙতেই বীরাষ্টমীর উদ্যাপন। আজও অষ্টমীতে সেই ট্রাডিশন অব্যাহত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জুড়েছে জুডো, ক্যারাটে, বক্সিংও। এমনকী এ-ও শোনা যায়, তখন বীরাষ্টমীর দিন জনতার ভিড়ে মিশে যেতেন অনুশীলন সমিতির বিপ্লবী সদস্যরা। জনসংযোগের এমন সুযোগ হারাতে চাইতেন না তাঁরা। শুধু ধর্ম বা শাস্ত্র নয়, জাতীয়তাবোধ আর স্বদেশপ্রেমের গন্ধই যেন এই পুজোকে করে তুলেছিল অন্যদের থেকে আলাদা।
ছবিঃ অরুণ পাল