কার্শিয়ং-এর টুকরিয়াঝাড় রেঞ্জের অধীনে বিজয়নগর চা-বাগানে পাওয়া যায় তিনটি চিতাশাবক
পতাকা উত্তোলন অথবা স্মৃতিচারণ নয়, ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা বয়ে এনেছিল মুক্তির বার্তা, মিলনের বার্তা। জাত-ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে হাতে হাত রেখেছিল সবাই। কিন্তু সে মিলন কেবল মানুষে মানুষে মিলন ছিল না, সে মিলন ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র জীবজগতে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তেমনই এক অন্যরকম মিলনের গল্প পাঠকদের উপহার দিতে চলেছে বঙ্গদর্শন।
স্বাধীনতার প্রাক্কালে এই অভূতপূর্ব মিলনের শরিক থেকেছে রাজ্য সরকারের বনবিভাগ। জুন মাসের ২৯ তারিখ। কার্শিয়ং-এ সেদিন সকাল থেকেই প্রবল বৃষ্টি। বৃষ্টির স্রোতে টুকরিয়াঝাড় রেঞ্জের অধীনে বিজয়নগর চা-বাগানের মধ্যে ভেসে আসে তিনটি চিতাবাঘের বাচ্চা। বয়স মেরেকেটে আড়াই মাস। মা-হারা শিশুগুলোকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় রেঞ্জ অফিসে।
কার্শিয়ং-এর টুকরিয়াঝাড় রেঞ্জের অধীনে বিজয়নগর চা-বাগানে পাওয়া যায় তিনটি চিতাশাবক
শিশু তিনটির পরিচর্যার দায়িত্ব নেয় রাজ্য সরকারের বনবিভাগ। বেঙ্গল সাফারি অর্থাৎ উত্তরবঙ্গ বন্যপ্রাণী পার্ক-এর অধীনে পশুচিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে যথাযথ স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হয় চিতা শাবকগুলির। জানা যায়, তিনটি শিশুই সুস্থ রয়েছে। এরপর শুরু হয় শিশুগুলির ঘর ফিরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। কীভাবে তাদের মায়ের খোঁজ করা যায়, কীভাবেই বা তাদের মিলন সম্ভব এ নিয়ে তৎপর হয় রাজ্য বনবিভাগ।
‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ্ নেচার’-এর প্রকাশিত লাল তালিকায় সারা ভারতে ছড়িয়ে থাকা চিতাবাঘদের ‘দুর্বল’ প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আবাসস্থল হারাচ্ছে চিতারা, অন্যদিকে চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্যে ব্যাহত হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। পশুর চামড়া এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবৈধ ব্যবসার কারণে দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে চিতাবাঘের সংখ্যা।
‘দ্য স্ট্যাটাস অফ লেপার্ডস ইন ইন্ডিয়া ২০১৮’ -এর মূল্যায়নে জানা যায়, সারা ভারতে প্রায় ১২,৮৫০টি চিতাবাঘ রয়েছে, যার মধ্যে উত্তরবঙ্গের তিনটি বনভূমিতে রয়েছে ৮৩টি। বিভিন্ন তথ্যের উপর ভিত্তি করে জানা গেছে, অবৈধ ব্যবসার জন্য ভারতে প্রতি বছর প্রায় ২০০টিরও বেশি চিতাবাঘকে হত্যা করা হয়। তাই, চিতাদের বিলুপ্তি আটকাতে তাদের বাসস্থান সংকট, বনভূমি ধ্বংস, মানব-চিতাবাঘের দ্বন্দ্ব, চোরা শিকারিদের উৎপাত ইত্যাদি বিষয়গুলির সমাধানের জন্য নিরন্তর কাজ করে চলেছে রাজ্য বনবিভাগ।
চিতাবাঘ সাধারণত একটি নিশাচর প্রাণী। দক্ষ শিকারি পশু হিসেবেও যথেষ্ট পরিচিত রয়েছে এদের। বাঘের মতো দক্ষ না হলেও শক্তিশালী সাঁতারু হিসেবে বেশ নাম-ডাক রয়েছে চিতার। চিতাই হল বিশ্বের দ্রুতগামী পশু। জানা যায়, একটি প্রাপ্তবয়স্ক চিতা প্রায় ৫৮ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে দৌড়াতে পারে। শুধু তাই নয়, অনুভূমিকভাবে ২০ ফুট এবং উল্লম্বভাবে প্রায় ১০ ফুট উচ্চতায় লাফ দিতে পারে এরা। সাধারণত দুই থেকে চারটি চিতাশাবক জন্ম নেয় প্রতিবারে। এবং তিন মাস বয়স থেকেই তারা শিকারে অনুসরণ করতে শুরু করে তাদের মাকে। যদিও বছর খানেক বয়স থেকে এরা নিজেরাই বেঁচে থাকতে পারে, তবুও দুই বছর পর্যন্ত মা চিতারা তাদের শিশুদের কাছ ছাড়া করে না।
ঠিক এ কারণেই রাজ্য বনবিভাগ মাত্র আড়াই মাস বয়সী শিশু তিনটিকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তৎপর হয়। যেহেতু বৃষ্টির জলে ওরা ভেসে এসেছিল তাই প্রথম থেকেই তাদের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল না বনবিভাগ। চিতা শাবকগুলির সঙ্গে তাদের মায়ের পুনর্মিলনের উদ্দেশ্যে তাই নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যে স্রোত পথে শিশু তিনটি ভেসে এসেছিল তারই বিভিন্ন তীরে বিভিন্ন সময় রেখে আসা হয় শাবকগুলিকে।
সম্পর্কের বন্ধন যে অকৃত্রিম পিছুটান বয়ে আনে, সে কথা বারবার প্রমাণ করে দেয় পশুরাও। অঝোরে বৃষ্টি হলে মা-বিড়াল নিজের মধ্যে আড়াল করে রক্ষা করে তার সন্তানদের। পাখিরা তাদের ডানার আড়ালে আশ্রয় করে দেয় শিশুদের। চিতারাও যে তার ব্যতিক্রম নয় তা অবশ্য আগে থেকেই জানতেন বনকর্মীরা। বন বিভাগের তরফে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বিবৃতিতে জানানো হয়, তারা নিশ্চিত ছিল যে তাদের মতো মা চিতাবাঘটিও নিজের হারানো সন্তানদের ফিরে পাওয়ার জন্য উদগ্রীব। অবশেষে ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙে, সফল হয় রেঞ্জ কর্মীদের নিরন্তর প্রচেষ্টা। উত্তরবঙ্গের জঙ্গলের ইতিহাসে তৈরি হয় এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। গত ৪ জুলাই সকালে পাঁচদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে স্রোতের ১.৩ কিলোমিটার উজানের একটি জায়গা থেকে মা চিতাবাঘটি খুঁজে পায় তার সন্তানদের।
আজ স্বাধীনতার ৭৫ বছরে দাঁড়িয়ে এই মিলনের গল্প যেন আবারও প্রমাণ করে দেয়, মানুষ হোক বা পশু, শিশুর কাছে মাতৃক্রোড়ের বিকল্প আর নেই।
সূত্র – রাজ্য সরকারের বনবিভাগের ফেসবুক পেজ।