প্রয়াত দেশের প্রবীণতম বাঘ ‘রাজা’, শূন্য হল সিংহাসন

রাজার মতোই তাকে বিদায় জানালো আলিপুরদুয়ারের দক্ষিণ খয়েরবাড়ি বাঘ পুনর্বাসন কেন্দ্র

ন-জঙ্গলে কাঠের বিছানায় শায়িত রাজার নিথর দেহ। তাঁকে ঘিরে রয়েছেন মন্ত্রী, পরিষদ, প্রজারা। সকলেই একে একে এগিয়ে আসছেন শেষবারের মতো রাজাকে প্রণাম করতে। ফুল, মালা দিয়ে সাজিয়ে দিচ্ছেন রাজার হিমশীতল দেহ। গত সোমবার সকালে এমনই এক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল উত্তরবঙ্গের দক্ষিণ খয়েরবাড়ি বাঘ পুনর্বাসন কেন্দ্র (South Khairbari Tiger Rescue and Rehabilitation Centre)। 

খয়েরবাড়ির রাজা, ২৬ বছর বয়সী একটি বাঘ। তার মেজাজও ছিল রাজার মতো। সে-ই ছিল ওই পুনর্বাসন কেন্দ্রের একমাত্র রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার (Royal Bengal Tiger)। দিনভর শোনা যেত গর্জন। বন দপ্তরের কর্মীরা ভালোবেসে নাম রেখেছিলেন ‘রাজা’। এদিন তাকে রাজার মতোই বিদায় জানালো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনদপ্তর। থমথমে পরিবেশ আলিপুরদুয়ারের দক্ষিণ খয়েরবাড়ি বাঘ পুনর্বাসন কেন্দ্রে। বন কর্মীদের চোখের জলে ইতি হল রাজার রাজ্যপাট।

২০০৮ সালে, ১১ বছর বয়সে রাজা প্রথম পা রাখে দক্ষিণ খয়েরবাড়ি উদ্ধার কেন্দ্রে। এক কুমিরের সঙ্গে জায়গা দখলের লড়াইয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল রাজার দেহ। শরীর জুড়ে ১০টিরও বেশি আঘাতচিহ্ন নিয়ে সে প্রথম এসেছিল এই কেন্দ্রে। এখানেই পশু চিকিৎসক ডাঃ প্রলয় মণ্ডলের চিকিৎসায় এবং ওয়াইল্ডলাইফ গার্ড শ্রী পার্থসারথি সিনহা ও অন্যান্য বনকর্মীদের সেবা-শুশ্রূষায় নতুন জীবন ফিরে পায় রাজা।

তারপর থেকে রাজার হালে কেটে গিয়েছে প্রায় ১৫ বছর। ভারতের প্রবীণতম জীবিত বাঘেদের তালিকায় জায়গা করে নেয় রাজা। যেখানে বন্দিদশায় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের গড় আয়ু আন্দাজ ২২ বছর, সেখানে চলতি বছরে ২৬-এ পা দিয়েছিল রাজা। বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০৮ সালের ২৩ অগাস্ট নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছিল ১১ বছরের রাজা। তাই বিগত বছরে ওই দিনেই খয়েরবাড়িতে মহা ধুমধামে পালিত হয় তার ২৫ বছরের জন্মদিন।

গত সোমবার রাজ্য বনদপ্তরের তরফে একটি বিবৃতিতে জানানো হয়, “আমরা খুব দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে এসকেবি রেসকিউ সেন্টারের ‘রাজা’ আজ ভোর তিনটে নাগাদ মারা গিয়েছে। মৃতুকালে রাজার বয়স হয়েছিল ২৫ বছর ১০ মাস। সে ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকা বাঘেদের মধ্যে একজন।”

রাজার মৃত্যুতে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে খয়েরবাড়ির জঙ্গলে। এদিন আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসক সুরেন্দ্র কুমার মীনা, জলদাপাড়ার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা দীপক এম রেড্ডি এবং বনদপ্তরের অন্যান্য আধিকারিক ও জেলা প্রশাসন-সহ চিড়িয়াখানার কর্মীরা রাজাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে একত্রিত হন। তার মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক।

রাজার চলে যাওয়ায় আজ ‘রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’ শূন্য দক্ষিণ খয়েরবাড়ি বাঘ পুনর্বাসন কেন্দ্র। উত্তরবঙ্গ তো বটেই, এমনকি সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ বনবিভাগের ব্যাঘ্র সংরক্ষণের ইতিহাসে রাজার দীর্ঘ ১৪ বছরের রাজকীয় সফর নিঃসন্দেহে স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

Developed by DXDasia