
কোন্নগরে ডাকঘর, মেয়েদের স্কুল, এমনকি চিকিৎসাকেন্দ্র পর্যন্ত গড়ে উঠেছিল শিবচন্দ্রের উদ্যোগে
সে এক অন্যরকম সময়। কত দিক থেকে কত মানুষ এসে জুড়ছে, ভাঙছে, আবারও জুড়ছে। আর সে ভাঙাগড়ার হাত ধরে বদলাচ্ছে চেনা দেশের নকশাও। বাইরে থেকে তো বটেই, ভিতর থেকেও। প্রতিদিন নিত্যনতুন বদলের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল গোটা দেশ। কোথাও মেয়েদের জন্যে ইস্কুল, কোথাও ব্রাহ্মসমাজ, কোথাও বা নতুন ইস্টিশন – নতুনের প্রবাহ এভাবেই ভাসিয়ে দিয়েছিল গোটা উনিশ শতককে। সেই বদলের অনেক কারিগর তাদেরই একজন শিবচন্দ্র দেব।
শিবচন্দ্র দেবের কৃতিত্ব ছড়িয়ে আছে কোন্নগর জুড়ে। যদিও আরো বেশকিছু ক্ষেত্রেই তিনি জুড়েছিলেন, তবু কোন্নগরের আমূল রূপান্তরের জন্যে তাঁর কৃতিত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ্য। সেখানে রেলপথ, মেয়েদের স্কুল, এমনকি চিকিৎসাকেন্দ্র পর্যন্ত শিবচন্দ্রের হাতেই। কোন্নগর আজও যেন সেই কৃতজ্ঞতা বহন করে চলে।
কলকাতার উত্তর-পশ্চিমে গঙ্গাতীরের এই ছোটো গ্রামটিতেই জন্মেছিলেন শিবচন্দ্র দেব। ১৮১১ সালের ২০ জুলাই। প্রথমে গ্রামের পাঠশালায় পড়াশোনা করলেও, পরে, ১৮২৫ সালের পয়লা অগাস্ট ভরতি হন হিন্দু কলেজে। প্রবেশমাত্রই ডিরোজিওর শিষ্য হয়ে ওঠেন। কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রসিককৃষ্ণ মল্লিক- ডিরোজিওর বিখ্যাত এই শিষ্যদের পাশাপাশি চিরকাল একইরকম উজ্জ্বল শিবচন্দ্র দেব। তাঁর কারণ তাঁর জনমুখী চিন্তাধারা।
কলেজে পড়তে পড়তে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ তিনি করেছিলেন। বন্ধু হরিমোহন সেনের সঙ্গে মিলিতভাবে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন, আরব্য উপন্যাস। কলেজ শেষে, প্রথমে সারভে অফিস, সেখান থেকে বালেশ্বরের ডেপুটি কালেক্টরি, তারপর ১৮৫০এ আলিপুরে আসেন ওই একই পদ নিয়ে। আলিপুর তখনো কলকাতা নয়, শুধুই চব্বিশ পরগণা। ১৮৫৭ সালে, সিপাহি বিদ্রোহ যখন উপস্থিত, শিবচন্দ্রবাবু তখন সামান্য বিপদেও পড়েন। একবার ট্রেনে করে যাতায়াতের সময় দু’জন ব্রিটিশ অফিসারের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তাঁরা বিদ্রোহ সম্পর্কে শিবচন্দ্রের মতামত জানতে চাইলে, সিপাহিদের পক্ষে দাঁড়ান তিনি। সেই স্বাধীন মত প্রকাশের অপরাধে, ব্রিটিশ সরকার কৈফিয়ত তলব করেন। তাতে বেশ ভালোই ভুগতে হয় শিবচন্দ্রকে। অবসর নেওয়ার পর থেকেই কোন্নগরকে নতুন করে গড়ে তোলার কাজে হাত লাগান। প্রথমে হিতৈষিণী সভা তৈরি করেন গ্রামের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে। সেখানে একটি বাংলা স্কুল আগে থেকেই নাকি ছিল। ১৮৫৪ সালে শিবচন্দ্র একটি ইংরেজি স্কুল খুললে, সরকার বাংলা স্কুলটিকে বন্ধ করে দেন। তারপর নিজের উদ্যোগে শিবচন্দ্র বাংলা স্কুল গড়েন সেখানে। স্কুলের পাশাপাশি যাতে বিদ্যাচর্চা ছড়িয়ে পড়ে জনমানসে, তাই ১৮৫৮তে একটি পাবলিক লাইব্রেরিও তৈরি হয় সেখানে। তারপরই ১৮৬০ সালে মেয়েদের পড়াশোনার জন্যে গড়ে তোলেন একটি বালিকা বিদ্যালয়। শিবচন্দ্রেরই আবেদনে ১৮৫৬ সালে কোন্নগরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রেলস্টেশন নির্মাণ করে। এর আগে শ্রীরামপুর বা বালি স্টেশনে গিয়ে গাড়ি ধরতে হত কোন্নগরবাসীকে। আর নয়তো ব্যবহার করতে হত জলপথ। রেলপথ নির্মিত হওয়ায় যাতায়াতের অনেকগুলি সমস্যার সমাধান হয়।
কোন্নগর রেলওয়ে স্টেশন
শিবচন্দ্রের চেষ্টাতেই ডাকঘর তৈরি হয়েছিল কোন্নগরে। একবার ভয়ঙ্কর ম্যালেরিয়ার প্রকোপে পড়ে কোন্নগর। ১৮৮৩ সালের সেই দুঃসময়ে তিনি নিজেই একটি হোমিওপ্যাথি ডিসপেনসারি খোলেন সেখানে। গরিব মানুষকে বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়ারও ব্যবস্থা করেন।
শিবচন্দ্র প্রথম জীবনে ডিরোজিওর শিষ্য হলেও, পরবর্তীতে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। সভার কাজেও তিনি জড়িত ছিলেন গভীরভাবেই। এই মানুষটার হাত ধরে একটি স্থানের নতুন জন্ম ঘটল, তা সত্যিই বিস্ময়কর। একা-হাতে গোটা স্থানটির দায়িত্ব নিয়েছিলেন প্রায়। উনিশ শতকের নবজাগরণ নিয়ে অনেকগুলি প্রশ্ন আছে ঠিকই। বিতর্ক আছে, ইংরেজদের রেলপথ-স্থাপন নিয়ে। কিন্তু সেসব বিতর্কের পরেও উনিশ শতক যা দিয়েছিল, তা হল – এইরকম কিছু মানুষ। স্বার্থহীনভাবে যাঁরা প্রকৃতই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এই কাজকেই তাঁরা জীবনের অন্যতম কর্তব্য বলে মনে করেছিল। সেখানে কোনো সংকীর্ণ স্বার্থগন্ধ ছিল না।
কোন্নগরের আজকের রেলস্টেশন বা মানুষজন শিবচন্দ্রকে কতটা মনে রেখেছে, জানা নেই। তবে, নিজেদের প্রয়োজনেই এইসব মানুষের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলা দরকার, যাঁরা নিজেদের জন্মস্থানের উন্নতিসাধনকে এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, বৃদ্ধবয়সে ‘সুখে’ অবসর-যাপনের অগাধ সুযোগ পেয়েও।
ঋণ: রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ- শিবনাথ শাস্ত্রী
