মানুষের চাঁদায় মানুষের সিনেমা : ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কলকাতা পিপলস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল

উৎসবে অংশগ্রহণ করবেন লেখক অরুন্ধতী রায়

বাড়ির নাম শাহানা। বিবাহ বিচ্ছেদকারী এক নারীর গল্প। যে স্বপ্ন দ্যাখে নিজের শর্তে বাঁচার। নব্বই দশকের বাংলাদেশ। এক রক্ষণশীল মফস্‌সলের আবহের বিপরীতে খুঁজে নেওয়া এক নারীর ইচ্ছাপথ। তালাকপ্রাপ্ত নারীরা কীভাবে নিজের ঘরে ও পরিবারে নিষ্ঠুরতার শিকার হন, উপেক্ষিত হন, সমাজচ্যুত হন – তাই-ই প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশি পরিচালক লিসা গাজী-র প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘বাড়ির নাম শাহানা’-য় (A House Named Shahana)। বিষণ্ণতা নয়, এই ছবি জীবনের জয়গানে মুখর। বিএফআই লন্ডন, বার্মিংহাম, মুম্বই চলচ্চিত্র উৎসবের পর এবার এই পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবিটি দেখা যাবে ১০তম কলকাতা পিপলস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (10th Kolkata People’s Film Festival)-এর নিউ ফিকশন ফ্রম সাউথ এশিয়া (New Fiction From South Asia & Beyond) বিভাগে।

লিসা গাজী-র প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘বাড়ির নাম শাহানা’

অন্যদিকে সাউথ এশিয়ার গল্প বিভাগে কলকাতায় আবার দেখানো হবে শ্রীময়ী সিং-এর তথ্যচিত্র ‘অ্যান্ড টুওয়ার্ডস হ্যাপি অ্যালিস’ (And, Towards Happy Alleys)। ইরানের জীবন, সেখানকার সামাজিক-রাজনৈতিক চাপানউতোর ফ্রেমবন্দি করেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শ্রীময়ী। ইরানে দীর্ঘদিন থেকে ছবিটি নির্মাণ করেছেন। ভিনদেশে তাঁকে গাইড করেছিলেন বিশ্বখ্যাত চিত্র-পরিচালক জাফর পানাহি (Jafar Panahi)। তিনিও স্বল্প পরিসরে ফ্রেমবদ্ধ হয়েছেন এই ছবিতে। বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের পর বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে শ্রীময়ী জানিয়েছিলেন, “আমার এই ছবিতে শুধুমাত্র জাফর পানাহি নেই, নাসরিন সৌতদে আছেন, ফারহাদ খেরাদমান্দ আছেন যিনি আব্বাস কিয়ারোস্তামির ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। আরও অনেকেই আছেন। কিয়ারোস্তামিরও একটা অংশ আছে, যদিও আমার সঙ্গে ওঁর দেখা হয়নি, কারণ আমি যখন ইরান যাই তার ঠিক পর পরই উনি মারা যান। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অনেক মহিলারা আছেন, যেমন জাফর পানাহির প্রথম ছবিতে যিনি শিশু-অভিনেতা ছিলেন, সেই আইদা মোহাম্মদখানি আছেন। একজন ভারতীয় মহিলা যে ইরান যাবে, পার্সি ভাষা শিখবে – তার সমগ্র জার্নিটাই আসলে এই তথ্যচিত্র। ছয় বছর ধরে ছবিটা বানিয়েছি ফলে এই কয়েক বছরে প্রচুর অচেনা মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, যাঁরা খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছেন। ছবিতে ইরানের শিল্প জগতের লোকেরা যেমন আছেন, তেমনই আছেন সাধারণ মানুষ।”

শ্রীময়ী সিংয়ের তথ্যচিত্র ‘অ্যান্ড টুওয়ার্ডস হ্যাপি অ্যালিস’

এমনই সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেখা যাবে কলকাতা পিপলস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের দশম সংস্করণে। এবছর উৎসব শুরু হবে শাহরুখখান চাভাড়ার ‘হুইচ কালার’ ছবিটির প্রদর্শনীর মাধ্যমে। উৎসব শুরু হচ্ছে আগামী ২৪ জানুয়ারি, চলবে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত্রি ৯টা, দক্ষিণ কলকাতার উত্তম মঞ্চে।

পিপলস ফিল্ম কালেকটিভ আয়োজিত এই উৎসবের মূল সুর ‘মানুষের চাঁদায় মানুষের সিনেমা’। অর্থাৎ, কোনোরকম বাণিজ্যিক বা সরকারি সাহায্যের বাইরে কেবলমাত্র সাধারণ মানুষের দেওয়া সাহায্যে এই উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়।

কলকাতা শহরে যত চলচ্চিত্র উৎসব হয়, নিঃসন্দেহে পিপলস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সর্বৈবভাবে ব্যতিক্রমী। পিপলস ফিল্ম কালেকটিভ (People’s Film Collective) আয়োজিত এই উৎসবের মূল সুর ‘মানুষের চাঁদায় মানুষের সিনেমা’। অর্থাৎ, কোনোরকম বাণিজ্যিক বা সরকারি সাহায্যের বাইরে কেবলমাত্র সাধারণ মানুষের দেওয়া সাহায্যে এই উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়। এবছর উৎসবে দেখানো হবে দক্ষিণ এশিয়ার নানান দেশ থেকে ৩৯টি কাহিনিচিত্র, তথ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের চিত্র। শ্রেণি, জাতি, লিঙ্গ, সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সমস্যাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয় এই উৎসবে। পিপলস ফিল্ম কালেকটিভ-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কস্তুরী বসু (Kasturi Basu) বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “এবছর প্রায় আড়াই হাজার ছবি জমা পড়েছিল। সেখান থেকে বাছাই করা হয়েছে ৩৪টি ছবি। এছাড়া রেট্রোস্পেক্টিভে রয়েছে আরও ৫টি ছবি। সিনেমার বিষয়বস্তু, শৈল্পিক উৎকর্ষ এবং আঙ্গিক – এই তিনটি জিনিসকেই আমরা প্রাধান্য দিই। একইসঙ্গে খেয়াল রাখি, ভারত বা দক্ষিণ এশিয়ার কিছু প্রতিনিধি স্থানীয় ছবি যেন থাকে এবং সম-সময়কে যেন তুলে ধরা হয়। লেবার ইস্যু, ব্যক্তি মানুষের বিচ্ছিন্নতা কিংবা যুদ্ধ বা ধর্মের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব – কোনো বিষয়ই যেন অতিরিক্ত না হয়ে যায় সেই চেষ্টাটাও আমরা করি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, নির্বাচনের সময় আমরা দেখি ছবিটার রাজনীতি। অর্থাৎ চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাঁর নিজস্ব রাজনীতির প্রতি কতখানি সচেতন।”

যেখানে তথ্যচিত্রের দর্শক অধিকাংশ উৎসবে ক্রমক্ষীয়মান, সেখানে এই উৎসবে হল-ভর্তি দর্শক দেখতে যান দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক তথ্যচিত্রের সম্ভার। শুধু দেখাই নয়, মতামত বিনিময় করতে পারেন পরিচালক-অভিনেতাদের সঙ্গেও। একজন মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, পোশাক-খাবার-কথা বলার স্বাধীনতা এবং মুক্তচিন্তার চর্চা করতে দশ বছর ধরে কলকাতা পিপলস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এবছর চলচ্চিত্র উৎসবে জোর দেওয়া হয়েছে দুটি বিষয়। প্যালেস্টাইনের গাজাতে গণহত্যা ও তার নৃশংস ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং ভারতে সর্বব্যাপী ফ্যাসিবাদের উত্থান। এছাড়াও উত্তম মঞ্চ সেজে উঠবে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার সম-সময়ের নানান আন্দোলন, পোস্টার, ইন্সটলেশনের মাধ্যমে। কস্তুরী বসু বলেন, “আমরা প্রতিবছর চেষ্টা করি সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে যা ঘটছে, তার একটা প্রতিফলন এই উৎসবে রাখতে। কর্পোরেট প্রথায় বিশ্বাস করি না। সাধারণ মানুষ সিনেমা ভালোবেসে যা সাহায্য করেন, সেই টাকায় পুরো উৎসবটা হয়। এমনকি, বাংলা ভাষায় নির্মিত প্রতিনিধি স্থানীয় ছবিও তালিকায় রাখার চেষ্টা করি। মানুষের উপর আমাদের সম্পূর্ণ ভরসা ও আস্থা আছে। নাহলে দশটা বছর এই উৎসব করা সম্ভব হত না।”

প্রদর্শনীর তালিকা থেকে বাছাই কয়েকটি ছবি:

পড়শি নীলের আরশিনগর (Beyond the Blues)/ দেবলীনা মজুমদার : পুরুষ মানে কী? পৌরুষ বলতেই বা কী বোঝায়? সমকালীন প্রচলিত হিন্দি সিনেমায় যখন ‘বিষাক্ত পৌরুষের’ এক করাল রূপ চারিদিকে বীভৎস দম বন্ধ করা পরিবেশ সৃষ্টি করছে, সেই সময় দাঁড়িয়ে দেবলীনা মজুমদারের তথ্যচিত্র ‘পড়শি নীলের আরশিনগর’ এক অন্যরকম সংলাপের পরিসর তৈরি করে দেয়। এই তথ্যচিত্রে বাংলার এমন কিছু মানুষের জীবন ও লড়াইকে তুলে ধরা হয়েছে যাঁদের জন্মের সময় নারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কিন্তু আদপে তাঁরা নারীদেহে আবদ্ধ পুরুষ। তবে এই পৌরুষের এর সংজ্ঞা অন্যরকম, সেই ধারণাকেই তুলে ধরা হয়েছে তথ্যচিত্রে। ছবিটি দেখানো হবে স্টোরিস ফ্রম ইন্ডিয়া বিভাগে।

হুইস্পারস অফ ফায়ার অ্যান্ড ওয়াটার (Whispers of Fire & Water)/ লুব্ধক চ্যাটার্জি : এ ছবির মূল চরিত্র একজন অডিও ইনস্টলেশন শিল্পী। তার চরিত্রটি চারপাশের নানান শব্দ দিয়ে বোনা হয়েছে। দুটি ভিন্ন অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে এই ছবির প্রেক্ষাপট। একটি ধানবাদের কাছে ঝড়িয়া নামক এক কয়লাখনি অঞ্চলে, যেখানে প্রায় একশো বছর ধরে আগুন জ্বলছে। আগুন সেখানকার একটা বড়ো অঞ্চল খেয়ে নিচ্ছে ক্রমশ। ছবির দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে জল। এমনই একটি নিরীক্ষামূলক ছবি বানিয়েছেন লুব্ধক। ৭৬তম লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসব-এর গ্রিন পার্দো অ্যাওয়ার্ডে মনোনীত ছিল ছিল এই ছবি।

লুব্ধক চ্যাটার্জির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘হুইস্পারস অফ ফায়ার অ্যান্ড ওয়াটার’

দ্য ফরগটন হ্যান্ডস (The Forgotten Hands)/ বো থেট ঠোন : সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এটি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র। ছবিটির মুখ্য বিষয় মায়ানমারের সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসী অভিযান। যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা প্রকৃত উদ্বাস্তুদের সত্যিকারের ফুটেজ ব্যবহার করে এই ছবিটি তৈরি হয়েছে। কিছু মাস আগে বো কলকাতায় এসেছিলেন। সে সময় বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বো থেট ঠোন জানিয়েছিলেন, “আমার স্ত্রী-র সঙ্গে একটি তথ্যচিত্রের শ্যুটিং করতে শরণার্থী শিবিরে ছিলাম বেশ কয়েকদিন। তখনই যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা এক মহিলার গল্প শুনেছিলাম তাঁরই মুখে। মানুষের নির্বাসন, শোকসভা, প্লেন বোম্বিং-এর সত্যিকারের ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে ছবিতে।” বো থেট ঠোনের এই ছবি দেখানো হবে নিউ ফিকশন ফ্রম সাউথ এশিয়া বিভাগে।

আনন্দ পট্টবর্ধনের ছবি ‘রাম কে নাম’

রাম কে নাম (In the Name of God)/ আনন্দ পট্টবর্ধন : রেট্রোস্পেকটিভ বিভাগে আনন্দ পট্টবর্ধনের উজ্জ্বল উপস্থিতিতে দেখানো হবে এই বিশেষ ছবি। সুদীর্ঘ মামলা চলার পর ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ আদালত বাবরি মসজিদ ভাঙা অপরাধ হলেও ওই স্থানেই রামমন্দির তৈরির আদেশ দেয়। কয়েকদিনের মধ্যেই সেখানে রামমন্দির উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনীতির পারদ চড়তে শুরু করেছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে আনন্দ পট্টবর্ধনের ‘রাম কে নাম’ তথ্যচিত্রটি পুনরায় দেখার আয়োজন করেছে উৎসব কর্তৃপক্ষ।

এছাড়াও দশম কলকাতা পিপলস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বক্তব্য রাখবেন প্রখ্যাত লেখক অরুন্ধতী রায়। বলবেন, লেখক হওয়ার নানা প্রতিকূলতা নিয়ে। রয়েছে মৌসুমী ভৌমিকের ‘এই ডুবন্ত সময়ের গান’ শীর্ষক একটি সাংগীতিক সন্ধ্যা। উৎসব চলবে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। হাজরা মোড়ের কাছে উত্তম মঞ্চে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা। থাকবে অন্যধারার প্রতিবাদী শিল্প-প্রদর্শনী। প্রবেশ অবাধ।

Developed by DXDasia