পড়শি নীলের আরশিনগর : তথ্যচিত্রে নীল আর সমুর ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার কাহিনি

KIFF-এর প্রথম দিনে প্রদর্শিত হল দেবলীনা মজুমদারের এই LGBTQ+ তথ্যচিত্র

পুরুষ মানে কী? পৌরুষ বলতেই বা কী বোঝায়? এই প্রশ্নগুলো নিয়ে ইদানীং একটা বিশেষ ঝড় উঠেছে আমাদের চারিদিকে। সমকালীন প্রচলিত হিন্দি সিনেমায় যখন ‘বিষাক্ত পৌরুষের’ এক করাল রূপ চারিদিকে বীভৎস দম বন্ধ করা পরিবেশ সৃষ্টি করছে, সেই সময় দাঁড়িয়ে দেবলীনা মজুমদারের (Debalina Majumder) নতুন তথ্যচিত্র ‘পড়শি নীলের আরশিনগর’ (Beyond the Blues) এক অন্যরকম সংলাপের পরিসর তৈরি করে দেয়। এই তথ্যচিত্রে বাংলার এমন কিছু মানুষের জীবন ও লড়াইকে তুলে ধরা হয়েছে যাঁদের জন্মের সময় নারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কিন্তু আদপে তাঁরা নারীদেহে আবদ্ধ পুরুষ। তবে এই পৌরুষের এর সংজ্ঞা অন্যরকম, সেই ধারণাকেই তুলে ধরা হয়েছে এই তথ্যচিত্রে।

দেবলীনা মজুমদার

পুরুষেরা নারী হতে চাইছেন, এই ঘটনা যেমন নতুন নয়, তেমনই নারীদের মধ্যে নিজেকে পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাও খুব একটা বিরল ব্যাপার নয়। কিন্তু এই নিয়ে কথোপকথন বা তাঁদের জীবনের লড়াই, ওঠা পড়া বা ডিজায়ার নিয়ে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাংলায় প্রায় দেখাই যায় না। দেবলীনা মজুমদারের এই তথ্যচিত্রে সেরকম কিছু লড়াকু মানুষদের জীবনের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। এই ছবিতে মুখ্য পাত্র হলেন নীল ঘোষ, যিনি একজন ট্রান্সম্যান। নীল এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ভাষা বিভাগে কর্মরত এবং LGBTQ+ অ্যাক্টিভিস্ট। এই ছবিতে ধরা পড়েছে তাঁর নিজের এবং পরিবারের লড়াই।

ছবির শুরুতেই দেখানো হয় নীলের মায়ের সাক্ষাৎকার। যেখানে তিনি ব্যাথিত চিত্তে বারবার প্রকাশ করেন মেয়েকে নিয়ে তাঁর ও তাঁর পরিবারের শখ আহ্লাদের কথা, যা আর কোনোদিন পূর্ণ হওয়ার নয়। অধিকাংশ মায়েরই সবথেকে বড়ো আকাঙ্ক্ষা থাকে তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়া, কিন্তু নীলের Gender Affirmation-এর জন্য এই আশা এখন কেবল একটা স্বপ্ন মাত্র। অন্যদিকে রয়েছে নীলের লড়াই, যেখানে তিনি ক্রমাগত পরিবারের সঙ্গে যোগ স্থাপন করে চলেন, যাতে তাঁর ক্রাইসিসটাকে বোঝাতে পারেন। এবং যাতে তাঁরা এই ঘটনাকে কোনোরকম ‘abnormality’ হিসেবে না দেখে একটা সাবলীল জৈবিক বিষয় হিসাবে মেনে নিতে শেখেন। নীল কলকাতায় তাঁর বর্তমান সঙ্গী সুতানুকার সঙ্গে থাকেন, দুজনেই এই লড়াইয়ের শরিক। আবার অন্যদিকে ছবিতে উঠে আসে সমুর বাবা-মায়ের কথা, যাঁরা বুঝতে পারেন যে তাঁদের সাধের কন্যা সন্তান আদতে একজন পুত্র এবং সেই বাস্তবের সঙ্গে তাঁদের ঘর বাঁধার কাহিনি। 

দেশে যে সময় CAA, NRC আন্দোলন তুঙ্গে এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার হঠাৎই ঠিক করেন যে এ দেশে থাকতে হলে স্বদেশীয় পরিচয় নিয়ে বাস করতে হবে, তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় LGBTQ কমিউনিটির মানুষদের পরিচয় ও পরিচয় পত্রের ক্রাইসিস। বহু মানুষ রূপান্তরকামী, নিজেদের শর্তে জীবনযাপন করবার জন্য তাঁদের বাড়ি ছেড়ে চলে আসার সময় পরিচয় পত্র নিয়ে আসতে পারেন না, বা পুরোনো নাম বা পরিচয়কে আর ব্যবহার করতে চান না। সেক্ষেত্রে কীভাবে তাঁরা নাগরিকত্বকে প্রমাণ করবেন?

দেবলীনা মজুমদারের এই তথ্যচিত্রে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল দীর্ঘ সময় ধরে চলা নীল এবং সমুর লড়াই যেন একে অপরের শরিক হিসেবে ধরা দেয়। যেখানে তাঁদের জীবনের ক্রম বিবর্তন অত্যন্ত সাবলীল ভাবে ধরা পড়ে। ছবির চলনের প্রতি স্তরে একটু একটু করে তিনি এই মানুষগুলোর জীবনকে উন্মোচিত করেন। নীলের ডিলেমা শুধুমাত্র পুরুষ হয়ে ওঠাতেই ফুরিয়ে যায় না। এই Affirmation-এর কাহিনিতে জড়িয়ে আছে নীলের ডিজায়ার, যা ধরা পড়ে ছবির একদম শেষে নীলের একটি অসামান্য মনোলগে, যেখানে তিনি জানান এই সময়ে দাঁড়িয়ে পুরুষ হতে চাওয়ার সমস্যা ও ফেমিনিজমের সঙ্গে যোগাযোগের গল্প।

এই ক্রাইসিসগুলোর পাশাপাশি দেবলীনার কাজে রাজনীতির পরিসরটাও ধরা পড়ে অত্যন্ত সূক্ষভাবে। তথ্যচিত্রের চলনে ধরা পড়ে রূপান্তরকামী মানুষদের পরিচয় পত্র নিয়ে আগামী সমস্যাগুলির কথা। দেশে যে সময় CAA, NRC আন্দোলন তুঙ্গে এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার হঠাৎই ঠিক করেন যে এ দেশে থাকতে হলে স্বদেশীয় পরিচয় নিয়ে বাস করতে হবে, তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় LGBTQ কমিউনিটির মানুষদের পরিচয় ও পরিচয় পত্রের ক্রাইসিস। বহু মানুষ রূপান্তরকামী, নিজেদের শর্তে জীবনযাপন করবার জন্য তাঁদের বাড়ি ছেড়ে চলে আসার সময় পরিচয় পত্র নিয়ে আসতে পারেন না, বা পুরোনো নাম বা পরিচয়কে আর ব্যবহার করতে চান না। সেক্ষেত্রে কীভাবে তাঁরা নাগরিকত্বকে প্রমাণ করবেন?

পাশাপাশি এই ছবিতে দেখা যায় রূপান্তরকামী মানুষদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ। ২০১৮ সালে ভারত সরকারের IPC’র অন্তর্গত আর্টিকেল ৩৭৭ মুকুব করার পরে রূপান্তরকামী মানুষেরা অনেক বেশি করে তাঁদের Affirmity-কে সামনে এনেছেন। কিন্তু তার সঙ্গে বেড়েছে তাঁদের ওপর অত্যাচার এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রশাসন বা প্রতিবেশীদের পক্ষ থেকে সেই অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোনোরকম কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার নজির সামনে আসেনি। 

প্রায় ১২ বছর ধরে এই তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজ করেছেন দেবলীনা মজুমদার। এক বছর আগে মুক্তি পায় দেবলীনার আরেকটি ছবি – গে ইন্ডিয়া ম্যাট্রিমনি। সেই ছবির বহু পাত্র-পাত্রীকে তাঁর এই নতুন কাজের আনাচে-কানাচে দেখতে পাওয়া যায়, কারণ এই তথ্যচিত্রগুলি স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি নামক সংস্থার সঙ্গে দেবলীনার দীর্ঘ যোগাযোগের ফসল। দেবলীনা মজুমদার অসামান্য সাবলীলতার সঙ্গে কাজ করেন। একটি ফ্রেমও আলাদা করে এস্থেটিসাইজ করার কোনো প্রয়োজন থাকে না। এবং যে কারণে ফ্রেমগুলি হয়ে ওঠে আপাদমস্তক জীবন্ত। দেবলীনা মজুমদার প্রায় ১৮ বছর ধরে ছবি বানাবার কাজে যুক্তম বিবিধ ধরনের তথ্যচিত্র ও ফিকশন নির্মাণ করলেও দেবলীনা মনে করেন LGBTQ কমিউনিটির সমস্যা ও লড়াই একটি দীর্ঘ আলোচনার বিষয়, যা শুধুমাত্র একটি বা দুটি কাজে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়৷ এই বিষয়ে আগামী দিনে আরও কাজ করার কথা তিনি বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন।

__
দেবলীনা মজুমদারের তথ্যচিত্র পড়শি নীলের আরশিনগর ২৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয় গত ৬ ডিসেম্বর, শিশির মঞ্চে। স্পেশাল স্ক্রিনিং বিভাগে মনোনীত ছিল এই ছবি।

Developed by DXDasia