
পিতৃতন্ত্রের সঙ্গে LGBT লড়াই বহু পুরোনো ও দীর্ঘমেয়াদী
রাধারানির বাড়ি পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে। রাধারানির শাড়ি পরতে, লম্বা করে বিনুনি বাঁধতে মন চায় না একেবারেই। সে রাতে শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখে বিশাল স্টিলের কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলছে মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুল। তাদের মতো মানুষদের ঠিক কী বলে ডাকে বা নিজের পরিচয় কীভাবে তৈরি হয়, তা রাধারানি আজও জানে না। যদিও তার মনের ইচ্ছা নিজের শরীরটা সে বদল করে নেবে।

ঠাকুরনগর। চাষির বাড়ির মেয়ে মিনু। ট্রাক্টর, রাইস মিল, লাঙল থেকে নৌকো পর্যন্ত সবই চালাতে পারত। তারপর একদিন বিয়ে হয়ে গেল তার। ছেলে হল। মিনু কখনও কাউকে বলেনি যে সে মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট। কাকেই বা বলবে? তার তেমন কোনও বন্ধুও হয়নি। একটা গোটা জীবনের অর্ধেক হয়ে গেল, অথচ সে একজন সঙ্গী খুঁজে পেল না।
তর্ক হতেই পারে – সমকামী জীবনযাত্রা যেহেতু মূল ধারার বাইরে, পুরুষতন্ত্রের বিপরীতে তার অবস্থান – তাই মূলধারার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রতিষ্ঠানের অঙ্গ হয়ে ওঠা মানে হয়তো পিতৃতন্ত্রের সামনে মাথা নত করা।
আমার শিবানী পিসির মেয়ে রানি দিদি। আমার সঙ্গে ছোটোবেলায় খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল। এখন আর যোগাযোগ নেই। এমনকি শিবানী পিসির সঙ্গেও নেই। রানি দিদি এখন জার্মানিতে থাকে। ওখানকার একটি মেয়েকে বিয়ে করেছে বলে কেউ আর সম্পর্ক রাখেনি রানি দিদির সঙ্গে।
সলমা এসেছিল বাংলাদেশ থেকে। তারপর কী করে কী হল। মধুরিমার সঙ্গে এমন বন্ধুত্ব হয়ে গেল যে মধুরিমার বাড়ির লোকজন অস্বস্তিতে পড়ে গেল। দুটো মেয়ের মধ্যে এমন কী হতে পারে যে লোকজনের অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠবে তারা? মধুরিমা চেয়েছিল সলমার সঙ্গে বাড়ির বাইরে বাড়ি বানাবে। কিন্তু এই কলকাতা শহরে দুজনের মনের মতো বাড়ি পাওয়া গেল না কিছুতেই। তাই সলমা দেশে ফিরে গেল।
রাখি আর মানসী প্রায় দশ বছর এক সঙ্গে থাকে। রাখির ইচ্ছা ছিল তাদেরও একটি ফুটফুটে মেয়ে হোক। অন্তত দত্তক নিক তারা। কিন্তু বাধ সাধল আদালত।
আমি দেবাদৃতা। আমি বাইসেক্সুয়াল। অর্থাৎ উভগামী। পুরুষ, নারী দুই-ই আমার পছন্দ; ফলত মানুষ ভাবে আমি গাছেরও খাই, তলারও কুড়োই। তাছাড়া গাছ আমার খুবই পছন্দ। এক এক ঋতুতে এক এক গাছের সঙ্গে আমার প্রেম।

_______________
এই কটা ছোটো ছোটো ঘটনার কেন্দ্রচরিত্র সকলেই মেয়ে। ইচ্ছা করেই এমনটা রাখা হয়েছে। তবে নিজেদের সুবিধা, ভালোলাগা, পছন্দ অনুযায়ী বদলে নেওয়া যেতেই পারে। এই প্রত্যেকটা ঘটনাই ঘটেছে ২০১৮ সালের পর। অর্থাৎ ভারতে সমকামিতা ডিক্রিমিনালাইজ হওয়ার পর। আজ আমরা যারা রাস্তায় নামি, সুপ্রিম কোর্টের সামনে ধর্না দিতে পারি, তাদের অনেকের গল্পই আমরা জানতে পারি। তারাও চাইলে জানাতেই পারেন। যারা মনে করি চুপ করে থাকাটাই একমাত্র পথ, তাদেরও নিজেদের গল্পগুলো জানা আছে। কারণ আমাদের অধিকাংশেরই বিশেষ কিছু সুবিধা বা অধিকার আছে, শিক্ষা হোক বা অর্থনীতি বা ভৌগোলিক অবস্থান – এই অধিকারের জোরেই আমরা শিখে এসেছি আমাদের একদিকের অধিকারকে ব্যবহার করে অন্যান্য অধিকারের লড়াই লড়ে নিতে।
কে কাকে বিয়ে করবে, কার বিবাহিত জীবন কেমন হবে, কার সন্তান হবে – কার হবে না, এমনকি কে সিঁদুর পরবে বা কে শ্বশুরকে ডিনার টেবিলে খাবার বেড়ে দেবে বা দেবে না, কে মেয়েদের দিকে তাকাবে, বা ছেলেদের মতো পোশাক পরবে, কে বা কারা ছেলে-মেয়ে-গাছ, সবেতেই আকৃষ্ট হবে – এই সমস্ত সিদ্ধান্তগুলো মানুষের নিজের হোক।
যাদের নেই, তাদের জন্য ৩৭৭ উঠে যাওয়ায় কিছু এসে যায় না। তারা হয়তো জানেও না সুপ্রিম কোর্ট সমলিঙ্গ বিবাহের অধিকার মানুষকে দেয়নি। বিয়ে একটা প্রতিষ্ঠান। সম্পত্তি নিজের কাছে আগলে রাখার নিখুঁত বন্দোবস্ত, যা আমরা সকলেই মেনে নিয়েছি। কাল যদি আমার অর্জন করা টাকাপয়সা বা ফ্রিজে থাকা সসেজের প্যাকেট কেউ জনস্বার্থে বিলিয়ে দেয়, আমার মোটেও ভালো লাগবে না। বিয়ের সঙ্গে যুক্ত নানা সমাজ ব্যবস্থা বা নিয়মকাকনুনও হয়তো ভালো লাগবে না এই সময়ে এবং এই বয়সে দাঁড়িয়ে। বিয়ে শব্দের একাধিক অনুষঙ্গ থাকে। বিয়ে করা মানে না চাইতেও সেই অনুষঙ্গের ওজন বয়ে বেড়াতে হয় প্রতিদিন প্রতিনিয়ত। তর্ক হতেই পারে – সমকামী জীবনযাত্রা যেহেতু মূল ধারার বাইরে, পুরুষতন্ত্রের বিপরীতে তার অবস্থান – তাই মূলধারার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রতিষ্ঠানের অঙ্গ হয়ে ওঠা মানে হয়তো পিতৃতন্ত্রের সামনে মাথা নত করা। হোক তর্ক, কিন্তু একটা জিনিস ভুলে গেলে চলবে না, যেভাবেই হোক, যেদিক দিয়েই হোক, বিকল্প পথ বেছে নিলেও সমাজের জালে মাঝে মাঝে জড়িয়ে পড়ি আমরা এবং বেঁচে বেরোতে গেলেই এত দিনের যে লড়াই চলেছে, কোনও একটা স্তরে পিতৃতন্ত্রের জয় হয়।
তাহলে উপায় কী?
পিতৃতন্ত্রের সঙ্গে লড়াই বহু পুরোনো এবং দীর্ঘমেয়াদী। সহজে যবনিকা পড়ার নয়। আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে সে। একটা আদর্শ অবস্থার কথার কল্পনা করা যেতেই পারে। কে কাকে বিয়ে করবে, কার বিবাহিত জীবন কেমন হবে, কার সন্তান হবে – কার হবে না, এমনকি কে সিঁদুর পরবে বা কে শ্বশুরকে ডিনার টেবিলে খাবার বেড়ে দেবে বা দেবে না, কে মেয়েদের দিকে তাকাবে, বা ছেলেদের মতো পোশাক পরবে, কে বা কারা ছেলে-মেয়ে-গাছ, সবেতেই আকৃষ্ট হবে – এই সমস্ত সিদ্ধান্তগুলো মানুষের নিজের হোক। এমন যদি হত তাহলে তো ভালোই হত। আমি ঢাক ঢোল পিটিয়ে একটা মেয়েকে বিয়ে করতে গেলাম তাতেও পাশের বাড়ির কাকিমার মাথায় আকাশ ভাঙল না। এরম হলে তো একে একে বর্ডার মুছে যাওয়ার কাজ শুরু হয়ে যেত কোনও এক ঝলমলে সকালে।
অথচ বাস্তবটা এমন হয়। ২০১৮ সালে ৩৭৭ উঠে যাওয়ার পরেও LGBTQ+ মানুষের বিশেষ সুবিধা কিছু হয়নি। আমরা যারা শহরে থাকি, তাদের কথা আলাদা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের অবস্থা খারাপ। তারপর আবার এসেছে ট্রান্স বিল। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সমকামী বিবাহের প্রস্তাব নাকচ করেছে। কল্পিত আদর্শ অবস্থায় আমরা নেই। হয়তো একদিন কল্পনা বলে কিছু থাকবে না। আলাদা করে ক্যুইয়ার বলে হয়তো কিছুরই অস্তিত্ব থাকবে না। কিন্তু যতদিন আছে ততদিন একটাই কাজ করে যেতে হবে।

যদি আমি বা আমরা পারতাম আমাদের পছন্দের পরিবার বেছে নিতে, হাসপাতালে, ব্যাঙ্কে। এলআইসি-র কাগজে পারতাম সই করতে নিজেরা, নিজেদের জন্য, তাহলে হয়তো এই পৃথিবীটাই কিছুটা হলেও আলাদা এবং সহজ হয়ে উঠত ক্যুইয়ার মানুষের জন্য। সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিকতা নিয়েও বিয়েকে গ্রহণ অথবা বর্জন করার স্বাধীনতা ক্যুইয়ার মানুষকে দেওয়া হয়নি। সমস্ত লড়াইটাই যেহেতু অস্তিত্বের লড়াই এবং সংখ্যালঘুর লড়াই, তাই স্বপ্ন দেখলে হবে না শুধু। এ লড়াই ছাড়া যাবে না, নিজেদের অধিকারের কথা নিজেদের ভাষায় নিজেদেরই বলতে হবে।
____
ছবি: অনিমেষ দত্ত, দময়ন্তী বি
