প্রান্তিক যৌনতার মানুষেরা পুনরায় বৈষম্যের শিকার হলেন : প্রসঙ্গ সমপ্রেমী বিবাহ

সমপ্রেমী বিবাহ আইনি স্বীকৃত নয়, শীর্ষ আদালতে হলফনামা কেন্দ্রের

কেন্দ্রীয় সরকার কিছুদিন আগে এক বক্তব্য রেখেছেন ভারতে সমপ্রেমী বিবাহ (সমকামী বিবাহ)-এর আইনি মান্যতা প্রসঙ্গে। সেই বক্তব্যে সমপ্রেমী বিবাহের প্রতি সরাসরি বিরোধিতা জানিয়ে বলা হয়েছে, সমলিঙ্গ বিবাহ বিষমলিঙ্গ বিবাহের সমতুল্য হতে পারে না। কোন নিরিখে? তাঁরা বলেছেন, এদেশের পারিবারিক কাঠামোতে এই বিবাহ মানানসই নয়। পারিবারিক কাঠামো বলতে এখানে একজন বায়োলজিক্যাল পুরুষ (পিতা), বায়োলজিক্যাল নারী (মাতা) এবং তাদের সন্তান সম্মিলিত যে পারিবারিক কাঠামো- তাকেই বোঝানো হচ্ছে। ২০২৩ সালে এসে স্পষ্ট হয় যে রাষ্ট্রীয় চিন্তাধারায় পরিবারের বাদবাকি সংজ্ঞা বা রূপ একেবারেই অদেখা, অজ্ঞাত। অথচ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী ভারতে সমপ্রেমী সম্পর্ক অপরাধমুক্ত ধার্য হয়েছে। অতএব তৃতীয় অজ সন্তান হিসেবে, একজন প্রান্তিক যৌন পরিচয়ের মানুষ তার প্রেমাষ্পদের হাতে হাত রেখে ‘স্বাধীনভাবে’ ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে থেকে আঙুল চুষতে পারবেন। রাষ্ট্রের এতে কোনো আপত্তি নেই।

ভারতবর্ষের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে সামাজিক নিরাপত্তা, যা বিবাহ নামক চূড়ান্ত পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা দেশের অন্যদের জন্য হলেও, সমপ্রেমী মানুষদের জন্য নহে – রাষ্ট্র এমনটাই মনে করেন।

একটি সামাজিক পরিকাঠামোকে বর্জন করার জন্য তা অর্জন করাটাও কখনও কখনও প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।

যে মুহূর্তে সমপ্রেমী এবং বিষমপ্রেমী সম্পর্কের মধ্যে তুলনামূলক এই আলোচনা বা মাপকাঠি প্রবেশ করানো হল, সেই মুহূর্তে দেশের সমপ্রেমী মানুষেরা পুনরায় বৈষম্যের শিকার হলেন। যে বৈষম্যের সঙ্গে ঘর করে করে আজ তাকে নিজের ছায়ার চেয়েও চিরপরিচিত বলে মনে হয়। হোমোফোবিকদের প্রশ্ন জোড়ালো হয়, “বিয়ে করার কী দরকার? ৩৭৭ ধারার পরিবর্তনই কি যথেষ্ট নয়?” শুধুমাত্র হোমোফোবিক মানুষই নয়, অনেক সচেতন নাগরিক (লিঙ্গ- যৌন পরিচয় নির্বিশেষে) মনে করেন যেখানে বিবাহ ব্যবস্থা আপনা থেকেই এমন পিতৃতান্ত্রিক ও দমনমূলক, সেখানে সুখে থাকতে ভূতে কিল খাওয়ার জন্য এত আবেদন কেন?

একটি সামাজিক পরিকাঠামোকে বর্জন করার জন্য তা অর্জন করাটাও কখনও কখনও প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। লোলুপ শৃগালের মতো গাল ফুলিয়ে অভিমানী ‘আঙুর ফল টক’ বলে মুখ ফিরিয়ে রাখলে প্রতিবাদ দৃঢ় হয় না, তা অজুহাতের মতো শোনায়। অধিকার না থাকলে, তা পরিত্যাগ করার সুযোগ বা বিলাসিতা কোনোটাই আসে না। এইখানে এসে সমপ্রেমী সম্পর্কে ঐচ্ছিক বিবাহের আইনি মান্যতা থাকা আবশ্যিক হয়ে ওঠে।

পরিবর্তে আরেকটি আশা মনে জাগে, রাষ্ট্রের নজরে পরিবারের যাবতীয় সংজ্ঞাগুলি ধার্য হয়ে উঠলে বিবাহের সংজ্ঞা, বৈবাহিক জীবনের সংজ্ঞা, তার রীতি আচার, কাঠামো ও রাজনীতি- এসবের বদলও অবশ্যম্ভাবী। ২০১৮-র পর, পাঁচটি বছর অতিক্রম করার মুখে সমপ্রেম এখনও সামাজিকভাবে সর্বস্তরে গ্রাহ্য নয়। কিছু সমপ্রেমী যুগল নিজের পরিবারের সমর্থন পেলেও সামাজিকভাবে এখনও তাঁরা ‘অপর’ হয়ে আছেন। সমপ্রেমী সম্পর্কের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য এই মুহূর্তে বিবাহের আইনি মান্যতার চেয়ে কার্যকরী আর কিছু হতে পারে না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে একটি প্রান্তিক যৌনপরিচয়ের শিশুকে ছোটো থেকে বড়ো হয়ে উঠতে দেখেছি। তার যখন আট বছর বয়স, যে বয়সে তার বন্ধুরা ভূত, প্রেত, রাক্ষস ইত্যাদি সম্পর্কে ভীত ছিল, বাচ্চাটি মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বসত ভয় পেয়ে, প্রশ্ন করলে জানা যেত সে ‘দুঃস্বপ্ন’ দেখেছে তার বিয়ের এবং বিয়েটি একটি পৃথকলিঙ্গের মানুষের সঙ্গে জোর করে দেওয়া হচ্ছে। শিশুটি জন্মেছে এবং বড়ো হয়েছে মোদি সরকারের অনুমোদিত পারিবারিক কাঠামোতে। এবং তাকে বলে দিতে হয়নি, সে ধরেই নিয়েছে, ওই আট বছর বয়সেই যে, এই রাষ্ট্র তাকে তার মাথার উপর নিজস্ব যৌনচাহিদা অনুসারে কোনো পারিবারিক ছায়া রাখতে দিতে চায় না। যদি বা সে তার পছন্দের মানুষের সঙ্গে সম্মতিপূর্বক যৌনসম্পর্ক স্থাপন করতে পারে- শিশু দত্তক নেওয়া, অথবা সারোগেসি, অথবা সম্পত্তির উত্তরাধিকার ইত্যাদি সমস্ত সুযোগসুবিধা যা ভারতীয় দম্পতি বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের থেকে মাগনায় পেয়ে থাকেন, সমস্ত কিছু থেকে সে বঞ্চিত হবে। এরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে, যেখানে কেউ কেউ বাড়িতে জানাতে পারেনি সে সমকামী, তাই জোর করে তার বিয়ে দেওয়া হয়। তৃতীয় বিশ্বের একটি রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়েই হয়তো তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে, যতদিন না রাষ্ট্র চোখ খুলে দেখছে।

অথবা দেখতে বাধ্য হচ্ছে।

_____

*লেখক একজন করপ্রদানকারী দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত নাগরিক। বক্তব্য তাঁর নিজস্ব।

Developed by DXDasia