কমল চক্রবর্তী থেকে স্বপ্নময়, নবনীতা – ‘ছক্কা’, ‘লেডিজ’, ‘হোমো’-রা রাজ করছেন যাঁদের উপন্যাসে

মহাভারত থেকে আজকের বাংলা উপন্যাসে উঠে এসেছে সমকামী, রূপান্তরকামী চরিত্র

ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা কিছু প্রাচীন ধ্যানধারণা বদলে দিয়েছিল ২০১৪ সাল এবং ২০১৮ সালের দুটি ঐতিহাসিক রায়। ২০১৪ সালের পয়লা বৈশাখ সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) রায় দিয়েছিল, রূপান্তরকামীদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সেই রায়ের বিচারপতি কেএস রাধাকৃষ্ণন জানিয়েছিলেন, রূপান্তরকামীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে, ফলে শিক্ষা, জীবিকা ও নানা খাতে সরকার যেন এঁদের সমান সুযোগের বন্দোবস্ত করে। তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি কোনও সামাজিক বা চিকিৎসা সংক্রান্ত ইস্যু নয়, মানবাধিকারের প্রশ্ন বলেই বিবেচ্য। তার ঠিক চার বছর পর ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ ঘোষণা করেন সমকাম যৌনতা আর অপরাধ নয়, বরং মানুষের মৌলিক অধিকার।

যদিও এ সামান্য রায় মাত্র। রাষ্ট্রের বিপক্ষে হেঁটে বাংলা সাহিত্য বহু আগে থেকেই মানুষকে সচেতন করে তোলার প্রয়াসে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। এমন সাহসী কিছু বাংলা উপন্যাস, যা বাংলা-বাঙালি তথা দেশকে পথ দেখিয়েছে, তারই কয়েকটি নমুনা এই লেখায়। উপন্যাসগুলিতে যাওয়ার আগে কিছু মতামত জানিয়ে রাখা ভালো। ঐতিহাসিক রায়ের পর কি আদৌ পাল্টেছে এলজিবিটিকিউ (LGBTQ+) কমিউনিটির মানুষদের লড়াই? তাঁদের বেঁচে থাকা কি আদৌ সহজ হয়েছে? ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্ট সুমি দাস জানাচ্ছেন, “গ্রামের দিকে এখনও অনেকেই ৩৭৭ (377 Act) ধারা সম্বন্ধে অবগত নন। বিষয়টা তাঁদের কাছে অনেকটা খায় না মাথায় দেয়, এই রকমের।” অ্যাক্টিভিস্ট-অভিনেতা-শিক্ষক অর্ঘ্য অধিকারী জানাচ্ছেন, “আইনিভাবে আমরা আর ‘ক্রিমিনাল’ নই। যেখানে ৩৭৭ পাশ হবার আগে আমাদের ক্রিমিনালের চোখেই দেখা হত। আজ যখন সুইগি বা উবার প্রাইড মান্থে নিজেদের লোগো রেইনবো করে দিচ্ছে, সেটা প্রচুর সংখ্যক মানুষের কাছে কিন্তু পৌঁছে যাচ্ছে। অবশ্যই এটা তাদের বিজনেস স্ট্র্যা টেজি। তা সত্ত্বেও এর অনেক ভালো দিক আছে। সাধারণ মানুষ দেখছে, হঠাৎ করে চারদিকটা রামধনুময় হয়ে গেছে। আগে কেউ জানতই না, জুন মাসকে প্রাইড মান্থ বলে। এখন কমিউনিটির বাইরেও প্রচুর মানুষ এই মাসটা সেলিব্রেট করছেন।”

তাহলে এখনও কেন ‘হিজড়ে’ (Hijra) বলে পরিচিত মানুষদের কোনো নিয়মমাফিক কাজ নেই? কেন তাঁদের বাসে-ট্রেনে-রাস্তায় ভিক্ষা অর্জন করতে হয়? কেন রূপান্তরকামীরা বাড়ি ভাড়া পেতে সমস্যার সম্মুখীন হন? এমনকি পরিবারও এই লড়াইয়ে সামিল হয় না? সুস্থ মানসিকতার অভাব আগেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে; যতদিন ‘ওদের’, ‘ওরা’ নামক সম্বোধনগুলো না মুছবে। কিন্তু তাই বলে হাজার হাজার মানুষের লড়াই মিথ্যে হয়ে যায় না। মিথ্যে হয় না তাঁদের পারস্পরিক ভালোবাসার জেদ। এই ভালোবাসার কথাই উচ্চারিত হয়েছে বাংলা উপন্যাসে, নানা আঙ্গিকে। রূপান্তরকামী মানুষদের ‘ট্রান্সজেন্ডার’ (Transgender) বলা হবে? নাকি ‘ট্রান্সপার্সন’ (Trans Person)? নাকি ‘ট্রান্সসেক্সুয়াল’ (Trans Sexual)? এসব ‘পলিটিক্যাল কারেক্ট’ কথাবার্তা বা তকমা পাওয়া যাবে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে। পড়ানো হবে ‘কুয়্যার স্টাডিজ’। কিন্তু তার বেশিরভাগই আটকে থাকবে শহুরে মেজাজি বাবুদের মধ্যে। গ্রাম কিংবা তস্য গ্রামে পৌঁছাবে না সেই আওয়াজ। আজও, এই ২০২২ সালেও। মাইকেল জ্যাকসনকে (Michael Jackson) নিয়ে আমরা মাতামাতি করব, কিন্তু ঋতুপর্ণ ঘোষ হয়ে যাবেন ‘ছক্কা’, ‘মগা’ অথবা ‘হোমো’। অথচ ঋতুপর্ণর (Rituparno Ghosh) মৃত্যুর পর তিনি সকলের কাছে হয়ে উঠবেন ‘প্রিয় ঋতুদা’। এটা যদি ন্যাকামি না হয়, তাহলে ন্যাকামি কোনটা?

নারীসুলভ পুরুষ বা মেয়ে হতে চাওয়া মহাভারতীয় চেতনা। অনুশাসনপর্বে ভঙ্গাস্বন নামে এক রাজার কথা ছিল মনে আছে? যিনি স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের অভিশাপের গেঁড়োয় মেয়ে হয়ে গিয়েছিলেন। পরে ইন্দ্র বর দিতে এলে তিনি মেয়ে হয়েই থেকে যেতে চান। রাজ্যস্তরে পাল্টে গেছে মহাভারতের ন্যারেটিভ। লেখকরা নিজেদের মতো করে চরিত্র গঠন করেছেন। সেখানে নানান আঙ্গিকে জায়গা পেয়েছেন রূপান্তরকামী, সমকামীরা।

মনে পড়ে যাচ্ছে কমল চক্রবর্তীর ‘ব্রহ্মভার্গব পুরাণ’ (Brahma Bhargab Puran) উপন্যাসের কথা। প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। ভূমিকায় লেখক জানিয়েছিলেন, “সমীর রায়চৌধুরী ‘হাওয়া-৪৯’ লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন। এবং উপন্যাসটি পড়েই বলেন, এ তো আমাকে নিয়ে লেখা, আমি হিজড়ে। এ লেখা আমি ছাপবই, আমার জীবনী। …হিজড়ে উপাখ্যানে আমি জর্জরিত। যোনিহীন, মুষ্কহীন এই আমূল সম্প্রদায় ভাবিয়ে তোলে।” হিজড়ে সম্প্রদায়কে নিয়ে এত সুনিপুণভাবে মানবিক দিক উঠে আসা সাহিত্য আজও বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ। ‘ব্রহ্মভার্গব পুরাণ’-এ হিজড়েদের প্রার্থনা ছিল, “জগন্নাথ হে আর জন্মে ছ্যাইলা কইর হে/ জগন্নাথ হে আর জন্মে মাইয়া কইর হে/ এ জন্মে সকল নিলে সিপাই দিলে মাঝখানে/ জগন্নাথ হে আর জন্মে ছ্যাইলা কইর হে…”। এই আর্তনাদের রেশ থাকে মননে, যাপনে। সমীর রায়চৌধুরীর মতো মনে হয় আমিও হিজড়ে, এ গল্প আসলে আমারই। যেমন লেখকও এই একই কথা অনুভব করেন। একটা গান কী সংক্রামক হতে পারে, তার টের পেয়েছিলেন উপন্যাসের শেষে। বলেছিলেন আর্তনাদের এই গান নার্কোটিক, নেশা ধরায়। আর লেখেন, “অন্ধকারে শূন্যে যৌনাঙ্গ হাতড়াতে থাকি। কিন্তু সম্বিৎ ফেরে, প্যান্টে হাত ঢুকিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করি, আমূলটি ঠিক আছে কি না।”

কবিতা সিংহের ‘পৌরুষ’ উপন্যাসেও পেয়েছিলাম একজন হিজড়েকে। কার্জন পার্কে শ্রমিক নেতাকে মালিকের গুন্ডাদের মার থেকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সখীসোনা নামের সেই হিজড়ে। এখানে ‘পৌরুষ’ শব্দটি যেন এক সামাজিক থাপ্পড়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আলোড়ন সৃষ্টিকারী গবেষণাধর্মী উপন্যাস ‘সেই সময়’ (Sei Samay)। সেখানে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে তিনি সমকামী হিসেবে উপস্থাপিত করেছিলেন। সুনীলের পড়াশোনা নিয়ে এখনও কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না। অত্যন্ত দক্ষতা এবং গভীর গবেষণার ফল ‘সেই সময়’। কিন্তু উপন্যাস প্রকাশের পর পাঠকদের চোখে ধাঁধা লেগে গিয়েছিল। মাইকেল আদৌ সমকামী ছিলেন কিনা নাকি এ নিছক লেখকের কল্পনা, তা নিয়ে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। যদিও মাইকেল এবং গৌরদাস বসাকের সম্পর্কের বিক্ষিপ্ত নিদর্শন তারপরেও আমজনতা পেয়েছিল।

নারীসুলভ পুরুষ বা মেয়ে হতে চাওয়া মহাভারতীয় চেতনা। অনুশাসনপর্বে ভঙ্গাস্বন নামে এক রাজার কথা ছিল মনে আছে? যিনি স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের অভিশাপের গেঁড়োয় মেয়ে হয়ে গিয়েছিলেন।

স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’ (Holde Golap) উপন্যাসের প্রধান চরিত্র পরিমল, দুলালী। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল উপন্যাসের শেষে গ্রন্থপঞ্জির তালিকা। সাধারণত উপন্যাসে গ্রন্থপঞ্জি থাকে না। ৫৯১ পৃষ্ঠার পর কয়েক পাতা জুড়ে সূত্রনির্দেশ। সেখানে নানান বই, পত্রিকা, ওয়েবসাইটের উল্লেখ। প্রচ্ছদে শোভা পেয়েছে গোলাপি রং। দড়িতে বাঁধা খড় আর কাঠের পুতুলের মুণ্ডহীন দেহ। শুধুমাত্র কাল্পনিক কোনও গল্পের আশ্রয় না নিয়ে এই উপন্যাস শেখাবে কিছু বৈজ্ঞানিক শব্দ, যেমন-  সিলিকন ব্রেস্ট, লিকম্‌, বাট্টুখোরই। ‘হলদে গোলাপ’ একসময় আলোড়ন তুলেছিল। কাহিনি বয়ানে মানুষের লিঙ্গ পরিচয়ের সমস্যা তুলে আনতে গিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমে লেখক খুঁড়েছেন ইতিহাস, নৃ-বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, শারীর বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব, পুরাণ। শুধু বাংলা সাহিত্যে কেন, ভারতীয় সাহিত্যেও এর আগে এভাবে কোনও উপন্যাস লেখা হয়নি। স্বপ্নময় লিখছেন, “হে ফ্রয়েড, ইয়ুং, পাভলভ, কেইনস, ডকিনস… তোমরা দেখে নাও মন-পরিবেশ, হরমোন-জিন শুধু নয়, আরও এক প্যারামিটার আছে। যেটা শুক্লা জেনেছে-সেটা স্বপ্ন।”

 

নবনীতা দেবসেনের দুটি উপন্যাস ‘বামাবোধিনী’ এবং ‘অভিজ্ঞান’, দুটিতেই লেসবিয়ান এবং বাইসেক্সুয়াল চরিত্র আছে। এক বিবাহিত মহিলা হঠাৎ খুঁজে পেয়েছিলেন কমবয়সী এক শয্যাসঙ্গিনীকে। অন্যদিকে বিবাহিত পুরুষ সংসার ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন বিদেশে তাঁর পুরুষসঙ্গীর কাছে। এইভাবে অসমবয়সী বন্ধুত্ব এবং সমপ্রেমকে অত্যন্ত সহজভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন নবনীতা।

বাংলার বাইরে ‘বম্বে দোস্ত’ বা ‘হামসাফার ট্রাস্ট’-এর মতো বাংলাতেও বহু বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে একগুচ্ছ রামধনুময় পত্র-পত্রিকা (LGBTQ based Littile Magazine) – ‘স্বীকৃতি’, ‘স্বকণ্ঠে’, ‘বংQ’, ‘অর্ধেক আকাশ’, ‘অবমানব’, ‘মৈত্রী বার্তা’, ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘কাঁচালঙ্কা’ ইত্যাদি। নিয়মিতভাবে জেন্ডার, সেক্সুয়ালিটি, মানুষের অধিকার, অগ্রাধিকার নিয়ে চর্চা চলছে সেখানে। যদিও তথাকথিত ‘বুদ্ধিজীবী’ মহলে এখনও ব্রাত্য হিজড়ে, রূপান্তরকামীরা। এই পরিস্থিতিকেই লেখক কমল চক্রবর্তী বলছেন, ‘দোলাচল মেধা, বুদ্ধিজীবীদের ছিন্ন মনস্কতা ও আপৎকালীন জীবন’। বাংলা সাহিত্যে এমন সব সাড়া জাগানো উপন্যাসের চরিত্রেরা বহু যুগ থেকে যাবেন পাঠক-অন্দরে। উল্লিখিত উপন্যাসের বাইরেও নিশ্চয় আরও বেশকিছু বাংলা উপন্যাস আছে, যেখানে প্রেমের উচ্চারণ সমাজের চোখে ‘ভিন্ন’। এই ভিন্নতার সংজ্ঞা যেদিন বদলাবে, সেদিন রামভরোসা, পরিমল, দুলালীরা রাজ করবে এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে। বাংলা উপন্যাসে এক সময় সমরেশ বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা যৌন ট্যাবু ভেঙেছিলেন। আলোচনাক্রমে আসা প্রত্যেকটি বই সাহায্য করবে যৌন সমস্যাগুলি নিয়ে কথা বলতে, সোচ্চার হতে।

তথ্যঋণঃ
‘ব্রহ্মভার্গব পুরাণ’ – কমল চক্রবর্তী/ অভিযান প্রকাশনী
‘হলদে গোলাপ’ – স্বপ্নময় চক্রবর্তী/ দে’জ
আনন্দবাজার পত্রিকা
গুরুচণ্ডা৯

Developed by DXDasia