বাংলার সেলাই শিল্প থেকে ভ্যান গঘের ভাবনা, কলকাতার পুজো শিল্পে নানান চমক

সনাতন দিন্দা, প্রদীপ দাস, সুশান্ত পাল, পার্থ দাশগুপ্ত প্রমুখ শিল্পীদের থিমে সেজে উঠছে কলকাতার পুজো

কখনও তিনি রুদ্র মূর্তি, একা হাতে তুলে নেন অস্ত্র। কখনও আবার সাধারণ ঘরের মেয়ে, সংসার বাঁচানোর তাগিদে লড়ে যান প্রাণপণ। শক্তিরূপেণ থেকে মাতৃরূপেণ দশভুজা ধরা দেন নানান ভূমিকায়। মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা, দেবীর সাজ সবকিছু ঘিরে চলে এলাহি আয়োজন। সংগঠন এবং শিল্পী, এই দুয়ে মিলে জন্ম হয় একটা সামগ্রিক সমাজচিত্রের। পরিচিত সাবেকি ঘরানার দেবী রূপের মোড়ক থেকে বেরিয়ে এসে সিংহবাহিনী হয়ে ওঠেন বিষয়ভিত্তিক।

দুর্গাপুজোর (Durga Pujo) এই বিষয় নিয়েই শিল্পী পার্থ দাশগুপ্তর (Partha Dasgupta) কথা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, “যে কাজ জন্মমাত্রেই বিসর্জিত হবার জন্য নির্ধারিত তাকে পাবলিক আর্টের রেফারেন্স হিসাবে ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতের লাভ।” অর্থাৎ যে উৎসব ঘিরে এতো আয়োজন, তার সবটুকু বিসর্জনের পরেও জীবনে ফিরে পাওয়ার কথা বলেছেন তিনি। ভাসানেও যার প্রাসঙ্গিকতা ফিকে হয় না। 

বর্তমানে পুজোর প্রস্তুতিপর্ব ঘিরে শিল্পীদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। কোথায় কি থিম হচ্ছে, কীভাবেই বা সেই থিমকে সাজিয়ে তুলছেন শিল্পীরা এইসব নিয়ে দর্শকদেরও কৌতূহলের অন্ত নেই। তাই প্রাক পুজো পর্বে কলকাতার এরকমই কিছু শিল্পী এবং তাঁদের কাজ নিয়ে আলোচনা রইল এই প্রতিবেদনে।

চালচিত্রের ঠিক মাঝখানে অসুর-দলনী দেবী দুর্গা, ডান দিকে যথাক্রমে লক্ষ্মী, গণেশ এবং বামদিকে সরস্বতী, কার্তিক। পারিবারিক এই ছবিটিকে ঘিরে মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা ইত্যাদি যা কিছু। একটা সময় অবধি এটাই ছিল বাংলার দুর্গাপুজোর (Bengal’s Durga Pujo) চিত্র। তারপর প্রচলিত এই ধারায় বদল এলো বেসরকারি একটি রং কোম্পানির হাত ধরে। ‘শারদ সম্মান’ জয়ের লক্ষ্যে শুরু হল ছক ভাঙার প্রয়াস। নব্বই সাল নাগাদ কলকাতা শহর এবং শহরতলি জুড়ে দুর্গাপুজো সেজে উঠতে শুরু করলো এক নতুন রূপ নিয়ে। বাঁশ, কাপড়ের সাবেকি পুজোর বদলে শুরু হল বোতল, ফলের বীজ, মশলা ইত্যাদি নানাবিধ উপকরণ দিয়ে মণ্ডপ গড়ার কাজ। শিল্পীর ভাবনায় লাগল উৎকর্ষতার ছোঁয়া। নতুন ভাবনাগুচ্ছই হয়ে উঠল ‘থিম’ পুজোর জনক।

শুরুতে খুব বেশি পুজোয় থিমের ব্যবহার না হলেও আজকাল অবশ্য বাংলার পুজো ভাবনায় জাঁকিয়ে বসেছে থিম ভাবনা। প্রতিবারই থিমের লড়াইয়ে জোর টক্কর চলে উত্তর কলকাতা (North Kolkata) বনাম দক্ষিণ কলকাতার (South Kolkata)। শুধু কলকাতা (Kolkata) নয় এ লড়াই ক্রমেই প্রভাবিত করতে থাকে জেলার পুজোগুলিকেও। ভালো থেকে আরও ভালো হয়ে ওঠার লড়াইয়ে হাজির হয় নিত্য নতুন ভাবনা। বাঙালির কাছে পার্বণ ধরা দেয় বাণিজ্যের সঙ্গে শিল্পের মোড়কে। একদিকে অভিনব ভাবনার প্রসার, অন্যদিকে শিল্পীদের নতুন উপার্জনের পথ, পুজোর থিম শিল্প (Theme) ঘিরে রাখে গোটা সমকালকে।

বর্তমানে পুজোর প্রস্তুতিপর্ব ঘিরে শিল্পীদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। কোথায় কি থিম হচ্ছে, কীভাবেই বা সেই থিমকে সাজিয়ে তুলছেন শিল্পীরা এইসব নিয়ে দর্শকদেরও কৌতূহলের অন্ত নেই। তাই প্রাক পুজো পর্বে কলকাতার এরকমই কিছু শিল্পী এবং তাঁদের কাজ নিয়ে আলোচনা রইল এই প্রতিবেদনে।

১৯৪৭-এর দেশভাগ, রাতারাতি হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুহারা, অচিরেই তাদের পরিচয় হয়ে গেল ‘শরনার্থী’। আজকের কলকাতার নাকতলা অঞ্চলে সেদিন গড়ে উঠল উদবাস্তু কলোনি। সেদিনের চেহারাটা হয় তো সময়ের সঙ্গে অনেকটাই বদলেছে তবে ইতিহাস তো বদল হওয়ার নয়। সেই স্মৃতিকে ঘিরেই এবছরের মণ্ডপ সজ্জার কাজটি করছেন শিল্পী প্রদীপ দাস। নাকতলা উদয়ন সংঘের এবারের থিম ‘মোটা কাপড়’। মণ্ডপে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে অসাধারণ সব ‘হুক আর্ট’। প্রদীপবাবু বঙ্গদর্শনকে জানান, “দেশভাগের প্রেক্ষাপটে বাংলার যেসব মেয়ে-বউরা সূচ-সুতো সম্বল করে সংসারের হাল ধরেছিল। এবছর তাদের কথাই বলব আমরা। কীভাবে বাংলার ঘরোয়া শিল্পকে সম্বল করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল তারা, সেই সমস্তু আলোচনাও উঠে আসবে মণ্ডপসজ্জায়।” সেলাই শিল্পকে স্বীকৃতি দেওয়ার নেপথ্যে এ যেন সাক্ষাৎ নারী শক্তির পরিচায়ক। বাস্তব দুর্গাদের গল্প। প্রদীপবাবুর সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে জানা যায়, তিনি আরও একটি কাজ করছেন উত্তরে, দমদম তরুণ দল। এখানে তাঁর থিম ‘সিটি অফ জয়’। শিল্পীর কথায়, “শহরটা প্রতিদিন যেভাবে একটু একটু করে সময়ে সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে, সেই ভাবনার ছোঁয়া থাকবে কাজে।”

নাকতলা উদয়ন সংঘের থিম ‘মোটা কাপড়’

অন্যদিকে বেহালা নতুন দল (Behala Natun Dol) দুর্গোৎসব ক্লাবের সেক্রেটারি দুধকুমার মন্ডল জানান, তাদের এবছরের থিম ‘আশ্রয়’। আজ যা সুরক্ষিত, কাল তা অনিশ্চয়তার গভীরে, অথচ ধ্বংসস্তূপের বিপন্নতা পেরিয়ে মানুষ খুঁজে পায় নিরাপদ আশ্রয়। মাথার অপর ছাতা ধরার মতো মানুষেরা এই সমাজেই দিকে দিকে ছড়িয়ে রয়েছেন। এই সব টুকরো টুকরো গল্পের গাঁথুনিতে সারি সারি দাড়িয়ে আছে জীবনের অনুচ্চারিত কন্ঠস্বর। অপ্রতিরোধ্য জীবনের ধারাপাত। যার শুরু নেই, শেষ নেই। যা আবহমান… এমনই এক কাহিনি ফুটে উঠতে চলেছে বেহালা নতুন দল দুর্গোৎসবের ‘আশ্রয়’ থিমের মধ্য দিয়ে। 

প্রতিবারের মতো এবারেও শিল্পী সনাতন দিন্দার (Sanatan Dinda) ভাবনায় মিলছে ছকভাঙার প্রয়াস। ‘আকশভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ’-  নামে এবারের থিম বকুলবাগানে। অভিনব ভঙ্গিতে প্রবাদপ্রতীম শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের চিত্রশিল্পের আদলে মণ্ডপ সাজিয়ে তুলছেন শিল্পী সনাতন দিন্দা। শিল্পীর কথায়, “এই দুর্গাপুজোয় এমন একজনকে হাজির করব, যাঁকে সারা বিশ্ব চেনে। তাঁর নাম ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ। ভিনসেন্টের থেকে যা শিখেছি, প্রত্যেকটা তুলির টান থেকে দর্শন, সবটা এখানে নিঙড়ে দিতে চাইছি।” ভ্যান গঘের তুলির আঁচড় শুধু ক্যানভাসে বেঁধে রাখেননি সনাতন দিন্দা, তাঁর কাজের রেশ ছড়িয়ে দিয়েছেন সমগ্র পাড়া জুড়ে।

‘আকশভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ’ থিম বকুলবাগানে

দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্কের ৯৫ পল্লীর দুর্গাপুজোয় এবারের থিম ‘ত্রিকাল’। শিল্পী সুশান্ত পালের (Susanta Pal) শৈল্পিক প্রেক্ষাপটে ত্রিকাল দর্শন করবেন দর্শনার্থিরা। শিল্পীর কথায়, “অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ এই তিনটি সময়কে নিয়ে কাজ করছি। একই মণ্ডপের মধ্যে বর্তমানের পাশাপাশি অতীতের রূপক হিসেবে থাকছে বদ্ধতা, অর্থাৎ যা কিছু আমাদের পা চেপে ধরে, সময়ের সঙ্গে এগোতে দেয় না। অন্যদিকে ভবিষ্যতের রূপক হিসেবে থাকছে শুন্যতা, অর্থাৎ যা কিছু অজানা।”

ইতিহাসের পাশাপাশি বর্তমান সময়ের কথা যখন এলোই, তখন উল্লেখ করা যাক এমন কিছু মণ্ডপের কথা, যেখানে পুজোর প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে বর্তমান। যেমন, সুরুচি সংঘের থিমের নাম ‘পৃথিবী আবার শান্ত হবে’। শিল্পী রিন্টু দাস সমসাময়িক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখেই এখানে মারণ ভাইরাস করোনার হাত থেকে মুক্তির কথা তুলে ধরছেন। তাঁর সৃজনে উঠে আসতে চলেছে আগামী দিনের আশার আলো। এছাড়াও বর্তমান সময়ে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে যাওয়ার দিকটিকে তুলে ধরতে ৬৬ পল্লীর এ বারের থিমের পোশাকি নাম ‘এক অন্ন বর্তী’। ৭২ বছরে পা দেওয়া এই পুজোর পরিকল্পনা এবং সৃজনের দায়িত্বে শিল্পী পূর্ণেন্দু দে। প্রতিমা গড়ছেন শিল্পী অর্ধেন্দু দে। মণ্ডপের আবহ গল্প বলবেন ডক্টর নন্দিনী ভৌমিক। অপরদিকে আরও একটি সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে বিশেষ থিম ভাবনা নজরুল পার্কের দুর্গাপুজোয়। এখানে পুজো-প্যান্ডেলে ফুটিয়ে তোলা হতে চলেছে যুদ্ধের আবহ, ভয়াবহতা। পাশাপাশি থাকছে বিশ্বশান্তির বার্তাও। শিল্পী অভিজিৎ গণ সাম্প্রতিক ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ছবি সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরে যুদ্ধ শেষে বিশ্বশান্তির বার্তা দিতে চেয়েছেন বিশেষ থিম ‘অসমাপ্ত’-এর মধ্য দিয়ে।

পরিশেষে যে কথাটি না বললেই নয়, এবছর বাংলার পুজো বিশ্বজনীন। সম্প্রতি এই স্বীকৃতি নিয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনেরও সাক্ষী থেকেছে কলকাতা। তবে বিশ্বজনীন যখন, তখন আলোর বিপরীত জগতটাকেও চেনার প্রয়োজন। সমাজের বিভিন্ন দিকে প্রচলিত ছক ভাঙার যে গল্প, স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটার যে প্রয়াস তার কথা বাদ দিলে হয়তো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এ প্রতিবেদন। আলিপুর ৭৮ পল্লি পুজো কমিটির কর্মকর্তারা তাই হাতে তুলে নিয়েছেন বিপরীত প্রয়াসের সেই মশালটা। উৎসবের সময় সমাজের যে অংশে আলো অথবা রং পৌঁছয় না, সেই যৌনপল্লিগুলিতেও আলো পৌঁছে দেওয়ার দায় নিয়েছেন তাঁরা। থিমের নাম ‘চৌকাঠের আড়ালে’। এক বেরঙিন গল্প শোনা যাবে এখানকার থিমে। কী সেই বেরঙিন গল্প? শিল্পী অনির্বাণ দাসের সৃজনে ফুটে উঠতে চলেছে এমন একটি পরিবেশ, যেখানে কান পাতলে শোনা যাবে কলকাতার বিভিন্ন নগর কন্যাদের কথা। পুরাণ মতে, যাঁদের দুয়ার থেকে মাটি নিয়ে এসে প্রতিমা গড়ার শুরু, সেই যৌনকর্মীদের কথাই লেখা থাকবে এখানে।

কোনো কোনো ক্লাব পুরস্কার পাবে, কোনো ক্লাব একটুর জন্য সুযোগ হারাবে। কিন্তু যেটুকু থেকে যাবে, তা হল নিখাদ মুগ্ধতা। শিল্পীদের সমসাময়িক-মূল্যবান কিছু হাতের কাজের স্মৃতি।

Developed by DXDasia