থিম-মিউজিক ছাড়া ‘থিম’ বৃথা, কী বলছেন পুজোর আবহ-সংগীতশিল্পীরা?

দুর্গাপুজো শিল্পে পরিণত হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে আবহ-সংগীত বা ‘থিম-মিউজিক’

পাড়ার পুজো প্যাণ্ডেল পাহারা দিচ্ছে কয়েকটা টিউবলাইট, দু-চারটে হ্যালোজেন, ঢাকির দল আর পাড়ার গুটিকয় বুড়োবুড়ি, কচিকাঁচারা। সঙ্গে তারস্বরে বজ্রনির্ঘোষ- আশা, লতা, কিশোর, হেমন্ত, মহম্মদ রফি, কুমার শানু। অতি বুদ্ধিমানেরা তখন পুজোয় সিমলা, কুলু, মানালির পথে। উত্তরোত্তর বদলাতে লাগলো সমাজচিত্র, পুজো শিল্পের চেহারা। স্তোত্রপাঠ, ঢ্যাং কুড়া কুড় ঢাক, কাঁসর-ঘণ্টা দুর্গাপুজোর চিরায়ত আবহ-সংগীত হলেও অচিরেই থিম-পুজোর সঙ্গে জায়গা করে নেয় মানানসই আবহ-সংগীত ওরফে ‘থিম-মিউজিক’, ‘থিম সং’। শুরুতে থিমের নাম দেওয়া থেকে শুরু করে থিমের গান রচনা – সবগুলোতেই শিল্পী নিজে দায়িত্ব নিতেন, এখন বিভাগীয় ‘এক্সপার্টরা’ দায়িত্ব নিয়ে নেন। শুধুমাত্র দৃশ্যশিল্পীরাই নন, পুজোকে কেন্দ্র করে অন্যান্য কলাশাখার মানুষ এসে যোগ দিচ্ছেন। শুধু প্রতিমাশিল্পী বা থিম-শিল্পী নন, একটি থিমের সঠিক রূপদানে সাহায্য করেন আলোর ডিজাইনার, শব্দের কারিগর, সংগীত ব্যাক্তিত্বরাও। থিম পুজোর শিল্প ভাবনায় বড়ো জায়গা নিয়েছে থিম মিউজিক। সেখানে স্বনামধন্য শিল্পীরা যেমন কাজ করছেন, কাজের সুযোগ বাড়ছে আনকোরা ও অপরিচিত শিল্পীদেরও। ওস্তাদ রশিদ খান, কবির সুমন, নচিকেতা, সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়, জয় সরকার, পণ্ডিত মল্লার ঘোষ, দেবজ্যোতি মিশ্র, ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, সিধু, বাংলাদেশের সায়ান, গৌতম ব্রহ্ম, মধুব্রত দত্ত, দেবদ্বীপ মুখার্জি, দীপময় দাস প্রমুখ প্রবীণ ও নবীন সংগীতশিল্পীরা পুজোর আবহ সংগীত নির্মান করেছেন, করে চলেছেন।

২০২১-এ যোধপুরপার্ক ৯৫ পল্লী-র থিম শিল্পী ছিলেন ভবতোষ সুতার। অতিমারী, কৃষক আন্দোলনের ছায়া ছিল সেই থিমে। আবহ-সংগীতের দায়িত্বে ছিলেন দীপময় দাস। ‘উনান কে বানাইছে, আগুন কে ধরাইছে…’ লোকভাষায় নির্মিত এই গানটি নিজে পরিচালনা করেছিলেন, গেয়েওছিলেন। গতবছর নাকতলা উদয়ন সংঘের ‘দেশভাগ’ থিমের আবহ সংগীতেও ছিল তাঁর ছোঁয়া। এখনও অনেকের স্মৃতিতে গাঁথা আছে তা। এবছর নাকতলা উদয়ন সংঘ, দমদম তরুণ দল, রাজডাঙা নব উদয়ন সংঘ, হাওড়া সালকিয়ার আলাপন, উত্তর চব্বিশ পরগণার বেশ বড়ো পুজো সোদপুরের উদয়ন সংঘ মিলিয়ে মোট ছ’টা পুজোর আবহ সংগীতের কাজ করছেন দীপময়। গত নয় বছর ধরে তিনি এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। দুর্গাপুজোর থিমের সঙ্গে সঙ্গে থিম সংগীতও গুরুত্বপূর্ণ, এ ব্যাপারে দীপময়ের বক্তব্য-

“একটা উদাহরণ দিই, কোনও ভুতের ছবি যদি আপনি ‘মিউট’ করে দেখেন, দেখবেন ভুতের সিনেমা হিসেবে একটুও প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে না, একটুও ভয় লাগবে না। ঠিক সেরকমভাবেই পুজোর থিম বা কনসেপ্টের সঙ্গে যখন একটা সাউণ্ড যোগ হয় তখনই সেই আর্ট ফর্মটা সম্পূর্ণতা পায়। মূলত আমি যখন থেকে কাজ শুরু করেছি, বহু পরীক্ষামূলক কাজ করেছি, এখন মনে হয় আবহ-সংগীত ছাড়া দুর্গাপুজো অসম্ভব। আগে কী হত, কোথাও থেকে একটা সাউণ্ড ডাউনলোড করে এদিক-ওদিক করে একটা কিছু বানিয়ে ফেলা হত। এখন একেবারে শুরু থেকে মানে পুজোর আট-ন’ মাস আগে থেকেই শিল্পীদের সঙ্গে আলোচনা করে সেইমত প্রস্তুতি নিতে হয়, পরিকল্পনা করতে হয়। বিষয়টা ঠিক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর একটা কথা, ‘আবহ-সংগীত’ কথাটার থেকে আমার মনে হয় ‘শব্দ-প্রয়োগ’ কথাটা এক্ষেত্রে যথাযথ। কারণ, পুজোর আবহ সংগীতে সব সময় লিরিক বা কথা থাকে না, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন শব্দের প্রয়োগ থাকে। তাতে বিষয়টা আরও ভালো ভাবে ফুটে ওঠে।”

পুজোর আবহ-সংগীত নির্মানের ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাধীনতা কতটা পাওয়া যায়? “কাজ করতে গিয়ে খুব মজা পাই। থিমের সঙ্গে শব্দ-বিন্যাসের জন্য অনেক সময় বিভিন্ন গবেষণার সুযোগ চলে আসে। যেমন আগের বছর শিল্পী প্রদীপ দাসের থিম-ভাবনায় কাঁকুড়গাছির একটি পুজোয় সংগীত করেছিলাম। থিম ছিল- যাত্রা। তার জন্য আমি টানা দু’দিন যাত্রা পাড়ায় যাই, ছ’ঘণ্টা করে রিহার্সাল দেখি, এমনকি সুন্দরবনের যাত্রাপালা দেখে সেখানকার যাত্রার নির্যাসটা উপলব্ধির চেষ্টা করি। আর,  স্বাধীনতা তো পরিপূর্ণ ভাবেই থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থিম-শিল্পীরাই বলে দেন এই এই বিষয় ভাবা হয়েছে, এভাবে করো।  আবার, অনেক ক্ষেত্রে তো পুজো কর্তৃপক্ষরা ঠিক করে বলতেই পারেন না কিছু, বলে দেন ‘আপনি যেটা ভালো বুঝবেন করুন’। দুরকম ভাবে কাজ হয়, এই যা।” বলেন দীপময়।

‘থিম-মিউজিক’ না ‘থিম-সং’, এ নিয়ে তর্কবিতর্কের শেষ নেই। এক্ষেত্রে, থিম-মিউজিক হল থিমের সঙ্গে মানানসই নেপথ্য শব্দ-সুর আর থিম-সং হল থিমের সঙ্গে মানানসই পরিপূর্ণ একটা গান, যেখানে সুরের সঙ্গে কথা থাকে, কণ্ঠশিল্পী থাকেন। কলকাতায় থিম-সংগীত তৈরির কাজ যাঁরা শুরু করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রণী গৌতম ব্রহ্ম তাঁর ব্যান্ড ‘জোহার’। গৌতম ব্রহ্ম’র মতে ‘থিম-মিউজিক’-এর থেকে ‘থিম-সং’-এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি কারণ, সুরের সঙ্গে কথা জুড়ে যাওয়ায় তা সাধারণ মানুষ বা দর্শনার্থীদের বেশি আকৃষ্ট করে, বুঝতে সুবিধা হয়। গানের কথা মানুষের মননে ছাপ ফেলে বেশি।

একজন থিমশিল্পী যেমন একসঙ্গে একাধিক থিম পরিচালনা করে থাকেন, একজন থিম-সংগীতশিল্পীও তাই করেন। গৌতমবাবু বলছিলেন, “আমরা দুর্গাপুজোয় থিম-মিউজিক বা গান তৈরি করি তা সত্ত্বেও বলছি, বাণিজ্যিক বিষয় বেশি চলে এসেছে। এক একজন থিম-সংগীতশিল্পী একসঙ্গে পনেরোটা, কুড়িটা করে থিম-সংগীতের কাজ করছেন, ফলত তাঁদের পক্ষে নির্দিষ্ট একটা থিমে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না এবং এর ফলে সমস্যা তৈরি হয় বলে ‘অভিযোগ’ করে থাকেন পুজোকর্তারা। তবে সব ক্ষেত্রে কথাটা ঠিক নয়। অনেকেই আছেন যাঁরা প্রতিটি কাজই সমান মনোযোগ দিয়ে করে থাকেন। সেইসব কাজ মানুষের কাছে পৌঁছাতে বাধ্য।”

গৌতমবাবু আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা দেখি মা দুগ্‌গা ভাসান গেলে তার সঙ্গে সঙ্গে এত কাণ্ড করে বানানো থিম-সংগীতও বিসর্জন যায়। পুজোর পাঁচ দিনই তার মেয়াদ। সরকারি বা বেসরকারি কোনও প্রতিষ্ঠান যদি পুজোর অন্যতম এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলি সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করে তার থেকে ভালো আর কীই বা হতে পারে! দুর্গাপুজো আজ আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বজনীন। যে কাজ জন্মমাত্রেই বিসর্জিত হবার জন্য নির্ধারিত তাকে পাবলিক আর্টের রেফারেন্স হিসাবে ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতের লাভ। সংগঠন এবং শিল্পী, এই দুয়ে মিলে যে একটা সামগ্রিক সমাজচিত্রের জন্ম দেবে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

 

Developed by DXDasia