বাড়ির ছাদ বাগানে প্রকৃতি-প্রেমের সহজপাঠ শেখাচ্ছেন শিলিগুড়ির কৌস্তভ বিশ্বাস

এক চিলতে ছাদই যেন এক অপরূপ স্বর্গোদ্যান

বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু আবিষ্কার করেছিলেন, গাছেদের প্রাণ আছে। আর সম্প্রতি একদল বিজ্ঞানী গবেষণার পর জানিয়েছেন, গাছেদের যে শুধু প্রাণ আছে তাই নয়, গাছেরা ব্যথা পেলে হাউমাউ করে কাঁদে। আবার তাদের আনন্দের অনুভূতিও রয়েছে। কিন্তু গাছেদের সেসব অনুভূতির শব্দ খুব উচ্চ কম্পাঙ্কের। একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক পর্যন্ত শব্দ শুনতে পায় মানুষ, তার ওপরে পায় না। সেই উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দেই আওয়াজ করে গাছ, যা কাঠবিড়ালি, বাদুর, ইঁদুরেরা শুনতে পায়। অন্তত তেমনই বলছে গবেষণা। শিলিগুড়ি এস এফ রোড নিবাসী কৌস্তভ বিশ্বাস গাছেদের ওই আওয়াজ শুনতে না পেলেও, গাছেদের এমনভাবে ভালোবাসেন যে তা আলাদা করে উল্লেখ করার মতো।

শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে আগের মতো প্রকৃতির সেই অকৃত্রিমতার খেলা দেখতে পাবেন না বটে, তবে এরমধ্যেও কোনো কোনো প্রকৃতিপ্রেমী শহরের মধ্যেই ছাদের ওপর তৈরি করছেন অপূর্ব এক পরিবেশ। তাদের হাতের স্পর্শে গাছেরা যেন অন্য আনন্দে মেতে ওঠে! সেসব আনন্দের অভিব্যক্তি আমাদের জানা নেই, তাদের আনন্দ প্রকাশের শব্দ আমরা শুনতে পাই না। লাল নীল বেগুনি হলুদ – হরেক রঙের ফুলের খেলায় বাড়ির এক চিলতে ছাদই যেন হয়ে ওঠে এক অপরূপ স্বর্গোদ্যান। প্রতিভাবান প্রকৃতিপ্রেমী কৌস্তুভ বিশ্বাস এমনই এক পরিবেশ তৈরি করেছেন বাড়ির ছাদে। 

পেশায় তিনি ইঞ্জিনীয়ার, নেশায় গাছ-প্রেমী। একটি বড়ো বেসরকারি কোম্পানিতে মোটা বেতনে চাকরিও করতেন। কিন্তু,  চাকরি করতে গিয়ে দেখলেন তাঁর গাছেদের প্রতি ঠিকঠাক যত্ন নেওয়া হচ্ছে না। গাছেদের প্রতি অযত্ন মেনে নিতে না পেরে শেষমেশ চাকরিটাই ছেড়ে দিলেন। তারপর থেকে সারাদিন পরম যত্নে গাছেদের লালন পালনেই নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। আর রুটিরুজির জন্য বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস সামগ্রী মেরামতের দোকান খুলেছেন। সকাল দশটার পর থেকে বিকেল পর্যন্ত দোকান সামলে বাকি সময়টায় এমনকি মাঝরাত পর্যন্ত বাড়ির ছাদে গাছেদের সঙ্গে সময় কাটান। আম, কাঁঠাল, ডালিম, পেয়ারা, বেল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফুল ও সব্জি বাগান তিনি তৈরি করেছেন বাড়ির ছাদে।

নানান রকমের ফুলের সঙ্গে টবের মধ্যে আম, কাঁঠাল ছাড়াও আমলকি, তেঁতুল এবং বিভিন্ন সব্জি চাষ তিনি করছেন। গোটা বাড়ির ছাদে দূষণমুক্ত সবুজ পরিবেশ তৈরি হওয়াতে আজকের দিনে বিলুপ্তপ্রায় টুনটুনি, চড়াই, বাবুই, টিয়া সহ আরও নানা রকম পাখি আসছে সেই ছাদে। ভোরবেলায় সেই ছাদ-বাগানে কোনো পাখি ফল খেতে, কোনো পাখি জল খেতে আসে। তার সঙ্গে কাঠবিড়ালির নাচানাচি তো রয়েইছে। আসলে এই বাগান করে তিনি নির্ভেজাল এক আনন্দ পান, তাই নিজের সন্তানের মতোই যত্ন নেন টবের গাছগুলোর প্রতি। গাছেদের নিয়মিত যত্ন সব একা হাতেই সামলে নেন। বাড়ির অন্য সদস্যরাও তাঁকে উৎসাহিত করেন। উত্তরবঙ্গ পুষ্প প্রদর্শনীতে প্রচুর পুরস্কারও জোটে। এবারও ব্যতিক্রম ঘটেনি।

গাছগুলোর পরিচর্যার জন্য প্রতি মাসে পাঁচ-সাত হাজার টাকা খরচ হয়। মূলত জৈব সারের জন্যই এই খরচ। তবে, বাগানের ফুল, সব্জি বা ফল বিক্রি করেন না তিনি। কৌস্তভবাবুর কাছে সবকিছুর ঊর্দ্ধে প্রাধান্য পায়- নিজের আত্মতৃপ্তি, সবুজের প্রতি ভালোবাসা। আবহাওয়ায় যেভাবে পরিবর্তন আসছে, তাতে কৌস্তভবাবুর মতো এরকম সবুজ নিয়ে মেতে থাকা অকৃত্রিম পরিবেশবান্ধব ব্যক্তির সংখ্যা যত বাড়বে ততই পরিবেশ ও সভ্যতার মঙ্গল।

Developed by DXDasia