
নিজের হাতে ফলানো সবজি বাজারে বিক্রি করতে নারাজ পিন্টু সাহা
পাকা তিন তলা বিল্ডিং। সে বাড়ির ছাদ আর সামান্য ছাদে সীমাবদ্ধ নেই, হয়ে উঠেছে চাষাবাদের স্থান। কোনো টবে সাড়ে তিন কেজি ওজনের ফুলকপি, কোনোটায় বাঁধাকপি, কোথাও আবার রঙিন ফুলকপি। তার সঙ্গে মিলবে ওলকপি, কাঁচা লঙ্কা, বেগুন, টম্যাটো, ক্যাপসিকাম, শসা, ধনেপাতা, পালংশাক। এককথায় সবকিছুই।
বিভিন্নরকম শাকসবজির (Green Vegetables) সঙ্গে নানারকম ফুল গাছও সাজানো রয়েছে সুন্দরভাবে। সবমিলিয়ে শিলিগুড়ির (Siliguri) একজন সামান্য সবজি বিক্রেতা তাঁর বাড়ির ছাদকে অন্যরকম এক সবুজায়ন সৌন্দর্যে পৌঁছে দিয়েছেন। আরও উল্লেখযোগ্য দিক হল, এই সবজি বিক্রেতার বাড়ির ছাদে নানারকম শাকসবজির চাষ করলেও, সেখানে উৎপাদিত একটি সবজিও দোকানে বিক্রি করেন না। নিজের পরিশ্রমে উৎপাদিত সবজি নিজের ঘরেও রান্নার কাজে ব্যবহার করতে নারাজ তিনি। নিজের শ্রমে উৎপাদিত সবজির সবটাই দুঃস্থ বা মঠমন্দিরে দান করে দেন। আর এভাবেই তাঁর ছাদের ফুলসবজির বাগান আরও দশজনের কাছে আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। তাঁরই খোঁজ করল ‘বঙ্গদর্শন’ (Bongodorshon)।

শিলিগুড়ির বিধান মার্কেটে সবজি বিক্রি করেন পিন্টু সাহা (Pintu Saha)। বয়স ৪২ বছর। পড়াশোনা তেমন একটা জানা নেই, ওই মাধ্যমিক পর্যন্ত। পেট চালানোর জন্য পেশা সবজি বিক্রি করা। কিন্তু নেশা সবজি ও ফুল চাষ। সুকান্ত নগরে তাঁর ছোটো বাড়ি। ছোটোবেলা থেকেই শুরু হয় এই চাষবাসের নেশা। বাড়ির তিন তলার ছাদে রয়েছে শিব মন্দির। সেখানে ফুল চাষ দিয়ে শুরু তাঁর এই বিপুল কর্মকাণ্ড। ছোটোবেলার সেই নেশা আজও ছাড়তে পারেননি তিনি। এখন ছাদে টবের মধ্যে ফুলকপি থেকে বাঁধাকপি, ওলকপি, টমাটো, বেগুন, ক্যাপসিকাম, পার্পল ফুলকপি বা রঙিন কপি, ধনেপাতা, লঙ্কা সবেরই চাষ করছেন।

সকাল-বিকাল মোট চার ঘণ্টা তাঁকে নিয়মিত সময় দিতে হয় চাষের জন্য। গাছের টবে জল দেওয়া, মাটি বদলে দেওয়া সবই নিজে হাতে করেন। গাছের খাবার বলতে গোবর সার, খোল পচানো জল। সেও নিজের হাতে তৈরি করে গাছকে খাইয়ে সবজি বিক্রি করতে বের হন।
নিজের পরিশ্রমে উৎপাদিত সবজি নিজের ঘরেও রান্নার কাজে ব্যবহার করতে নারাজ তিনি। নিজের শ্রমে উৎপাদিত সবজির সবটাই দুঃস্থ বা মঠমন্দিরে দান করে দেন। আর এভাবেই তাঁর ছাদের ফুলসবজির বাগান আরও দশজনের কাছে আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
কিন্তু যে সবজি চাষের পিছনে এত পরিশ্রম করেন, তা বিক্রি করে তিনি অর্থ রোজগার করতে পারেন না? প্রশ্ন করলে পিন্টু বলেন, “পরিশ্রম তো আছেই। গাছের পিছনে খরচও আছে। একটি সাড়ে তিন কেজি ওজনের ফুলকপি ফলাতে খরচ হয়েছে একশো টাকা, কিন্তু একশো টাকায় সেই কপি কেউ কিনবে না বাজারে। কেননা বাজারে এর দাম কম। তাই বিক্রি করে লাভ নেই।” তাছাড়া কষ্ট করে চাষ করা শখের সবজি বিক্রি করে আনন্দ নেই, এর চেয়ে বেশি আনন্দ সেই সবজি গরিব দুঃখী বা মঠ মন্দিরের মধ্যে দান করাতে। এই দানের মধ্যে অন্যরকম তৃপ্তি অনুভব করেন পিন্টু।

পিন্টু জানান, “ছাদের টব বা গাছগুলো যেন প্রেমের পাত্র। এই সৃজন কাজে যে কী অসীম আনন্দ এবং মন ভালো রাখার ওষুধ তা বলে বোঝানো যাবে না। যেসব ছেলেমেয়ের কাজ নেই, তাদের অবসর সময়ে আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করার কোনও প্রয়োজন নেই। হতাশ হয়ে মদ গাঁজার নেশায় ডুব দেওয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই। তাঁরা বাড়ির মধ্যে টবে ফুল সব্জি চাষে একটু মন দিলেই মন ভালো হয়ে যাবে। মদের নেশা থেকে বড়ো নেশা এই সৌন্দর্যের নেশা। আর যারা এর থেকে দুটা পয়সা রোজগার করতে চায়, তারা পরিকল্পনা করে সে চেষ্টা করলে রোজগারও করতে পারে।”

এমন দিলখোলা মানুষ সচরাচর মেলে না। কারণ করোনা পরিস্থিতি অনেককেই আর্থিকভাবে পিছিয়ে দিয়েছে। সেখানে পিন্টুর মতো মানুষ দিনরাত স্বপ্ন বুনে চলেছেন। শুধুমাত্র নিজের জন্য নয়, দুঃস্থদের জন্যেও। সেবার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। যিনি ফসল ফলান, তিনি কৃষক-শিল্পী (Farmer-Artist)। শিল্পীর নিজের হাতে গড়া শিল্প মর্যাদা পাক সর্বত্র। পিন্টুদের ফসল পৌঁছে যাক দরিদ্রদের ঘরে ঘরে।

