১৭৭২ সালে এই গ্রামেই সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা বসতি স্থাপন করেছিলেন
কলকাতার সাবেক জমিদার সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের অনেক কীর্তিই বহুশ্রুত। জোব চার্ণককে কলকাতা-সহ তিনটি গ্রাম ইজারা দেওয়ার কথা বা কালীঘাটের কালী প্রতিষ্ঠার কথা আজ ইতিহাস। প্রচারের দৌলতে সাবর্ণদের কিংবদন্তি দুর্গাপুজোর কথা সকলেই জানেন, কিন্তু কালীপুজো? অনেকেই ভাববেন, সাবর্ণদের বাড়িতে কালীপুজো হয় না তো। তাহলে?
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাসপুর থানার অন্তর্গত খেপুত গ্রাম। এই গ্রামেই কমিউনিস্ট নেতা মানবেন্দ্র রায়ের পৈতৃক ভিটে। অনেককাল আগে এই গ্রামেই সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা বসতি স্থাপন করেছিলেন। সে অনেক যুগ আগের কথা। ১৭৭২ সাল। সাবর্ণদের পূর্বপুরুষ রামদুলাল রায়চৌধুরী মেদিনীপুর জেলার চেতুয়া পরগনায় জমিদারি লাভ করেছিলেন। বড়িশা এবং কালীঘাটে তাঁর যাতায়াত ছিল। রূপনারায়ণ তখন উথালপাথাল ঢেউয়ে কানায় কানায় ভরে থাকত। তার বুকে পাল তুলে জলযান যেত গন্তব্যে। রামদুলালও যেতেন। দুর্গাপুজোর সময় বড়িশাবাড়িতে উৎসব দেখে খেপুতে এমন ঘটা করে পুজো করার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। তবে দুর্গা নয়, কালীঘাটের বৈষ্ণবীরূপী কালীই হয়ে উঠলেন খেপুত উত্তরবাড়ের সাবর্ণদের আরাধ্যা। সাবর্ণ জমিদারদের দেখাদেখি গোটা খেপুত গ্রাম পঞ্চায়েতেরই পরম আরাধ্যা হয়ে উঠলেন কালী। আজও যদি পুজোয় খেপুতে গিয়ে হাজির হন, দেখবেন গোটা গ্রাম মেতে আছে। ছোটো-বড়ো প্রায় সব বাড়িতেই করালবদনীর আগমন। কালো মেয়ের পায়ের তলায় আনত পশ্চিম মেদিনীপুরের অখ্যাত গ্রাম।
খেপুতে সাবর্ণদের কালীপুজোয় রীতিনীতি, আচার এখনও পালন করা হয় পরম্পরা মেনে। বাড়ির জলঘড়িতে চোখ থাকে। সেটা দেখেই ঘট ডোবানোর সময় চিহ্নিত করা হয়। দেবীর চক্ষুদানের সময় চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। কার্তিক মাসের শ্যামা লক্ষ্মীপুজোর রীতিতে অলক্ষ্মী বিদায়ের পালাও চলে। কালীঘাটের পুজোর নিয়ম অনুসরণ করা হয়। এই লক্ষ্মীপুজোয় কাঁসর-ঘণ্টা বাজানো চলে না। লক্ষ্মীর জন্য থাকে নিরামিষ ভোগ। কালীর জন্য ছাগবলির ব্যবস্থা করা হয়। সাবর্ণদের মন্দিরে বিষ্ণু, শিব এবং শক্তির আরাধনা চলে। ছাগবলির পাশাপাশি আগে মহিষ ও মেষ বলিরও রেওয়াজ ছিল। সেই পরম্পরায় অবশ্য ছেদ পড়েছে।
শ্রীরঘুনাথের নিত্যসেবা হয় সাবর্ণদের বাড়িতে। রোজ দুপুরে অন্নভোগ উত্সর্গ করা হয়। তবে শ্যামাপুজোর দিন অন্নভোগ দুপুরে উৎসর্গ করা হয় না। কালীঘাটে বাসুদেব যেমন বৈষ্ণবরূপিণী শ্যামাকালীর অপেক্ষায় থাকেন, তেমন ভাবেই রঘুনাথজীউও সারাদিন অপেক্ষা করে থাকেন। রাতে শ্যামাকালীর ভোগ উৎসর্গ করার আগে তিনি নিরামিষ ভোগ দর্শন করেন। তারপর হয় শিব ও শ্যামাকালীর ভোগ দর্শন।
সাবর্ণদের বাড়ির ভোগ মানে এলাহি ব্যাপার। খেপুতের ভোগে কী কী থাকে? রায়চৌধুরী বাড়ির সদস্যরা জানিয়েছেন, ১৩ ধরনের ভোগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কলার বড়া, লুচি, বিভিন্ন সব্জির তরকারি। তবে বিশেষ আকর্ষণ শোল মাছ পোড়া। বাড়ির দীক্ষিত মহিলারাই রাঁধেন। শুধু কি তাই, নৈবেদ্য সাজিয়ে তোলা হয় পরম যত্নে। বাড়ির পুরুষ সদস্যদের অংশ নিতে হয় এ কাজে। পুরুষরা নৈবেদ্য সজ্জা, ফল কাটা, পান সাজাতে ব্যস্ত থাকেন। সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের গোষ্ঠীপতি জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরী বলেন, “কোভিডের সময় সমস্ত বিধিনিষেধ মেনে মায়ের পুজো হয়েছে। এ বছরও সেই নিয়মই বজায় থাকবে। হাজারখানেক মানুষকে ভোগ খাওয়ানো হবে, নজর রাখা হবে সামাজিক দূরত্ব বিধিতে। খেপুত-সহ আশপাশের গ্রাম থেকেও মানুষ এখানে ভোগ নিতে আসেন।” 
সাবর্ণদের পুজো আক্ষরিক অর্থেই হয়ে ওঠে মিলনমেলা। সমাজের গণ্ডিকে অতিক্রম করার লক্ষ্যেই যেন এই সাধনা। আজও বংশানুক্রমিক ভাবে ছুতোর, নাপিত, গয়লা, কামার, মালাকার সম্প্রদায়ের মানুষজন সাবর্ণদের পুজোয় যোগ দেন। এই পরম্পরার কথা জানতে সেই ইতিহাসের শরণ নিতে হবে। জমিদারি পত্তনের সময় ১০০ বিঘে জমির মালিক সাবর্ণরা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসতি স্থাপন করেছিলেন নিজেদের বাড়ির চৌহদ্দিতে। সেই ধারা অক্ষুণ্ণ রেখে সাবর্ণদের কালীপুজো হয়ে ওঠে সকলের উত্সব। ছুতোর (কুমোর) আজও সাবর্ণদের ঠাকুর তৈরি করে অন্য প্রতিমা নির্মাণে হাত দেন। বিজয়া দশমীতেই বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠর হাত ধরে কালীঠাকুরের পায়ে মাটি দেওয়া হয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে দেবীর গায়ের রং করা হয়। দশমীর পরে প্রদীপের শিখায় তেল মিশ্রিত সরা ধরে কালো রঙ তৈরি হয়। শন দিয়ে দেবীর চুলও নিজেরা তৈরি করেন এই পরিবার।
খেপুত উত্তরবাড়ে সাবর্ণদের ২৩-২৪ পরিবার বসবাস করে। প্রায় শ-চারেক সদস্যের সকলেই প্রায় পুজোতে উপস্থিত থাকেন। একসময় কালীপুজোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল জমজমাট। জমিদারি চলে যাওয়ার পর সেসব বন্ধ না হলেও জৌলুস কমেছে স্বাভাবিক নিয়মেই। সারা খেপুত গ্রামে সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের মতো প্রথা মেনে মোট ৯টি প্রাচীন কালীপুজো হয়, তাদের মধ্যে ছোটো রায়বাড়ি, চট্টোপাধ্যায়, নাগবাড়ির কালীপুজোও বেশ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া আরও কত যে পুজো হয়, তার ইয়ত্তা নেই। গ্রামের দেবী খেপুতেশ্বরীর কাছে জমায়েত হয় সমগ্র গ্রামের কালীপুজোর ডালা। খেপুতেশ্বরীকে পুজো জানিয়েই শুরু হয় গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়ির পুজো। সাবর্ণরা অবশ্য তাঁদের ভিটে থেকেই দেবী খেপুতেশ্বরীকে পুজো দেন।
সাবর্ণদের ২২৪ বছরের পুরোনো এই কালীপুজোর ব্যয়ভার বহন করে মূলত সাবর্ণ রায়চৌধুরী গোষ্ঠী সংসদ। পারিবারিক চাঁদার পাশাপাশি দেবোত্তর সম্পত্তি থেকেও চলে খরচখরচা। সংসদের যুগ্ম সম্পাদক কমলেশ রায়চৌধুরী বলেন, ‘মানতের জন্য প্রচুর সংখ্যায় বলিও পড়ে। করোনার জন্য দূরত্ব মেনে কাজ হয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুতে ভাটা পড়েনি।’
এই পুজো এলাকার মানুষের কাছে জনপ্রিয় অন্য কারণেও। পাগলা কুকুর বা শেয়াল কামড়ালে এখানে চলে মানত করার পদ্ধতি। বিজ্ঞানের দাপটে সে সবে ভাটা পড়লেও এখনও অনেকে আসেন মানত করতে।