
আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন ভবতোষ সুতার, পার্থ দাশগুপ্ত, সুশান্ত পাল, বিমল কুণ্ডু, দেবদত্ত গুপ্ত প্রমুখ
ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে উমা আসেন আর চলে যান, এই আসা-যাওয়ার মাঝে ও আগে-পরে কতকিছু থাকে যা সাধারণ দর্শনার্থীদের জানার উপায় থাকে না। আমাদের নাগালের বাইরে থেকে সারা বছর ধরেই বিশেষ কিছু মানুষ নিমগ্ন থাকেন পুজোকে শিল্পে উত্তীর্ণ করার প্রয়াসে। সেই প্রয়াসের নেপথ্য কাহিনিই দুর্গাপুজো পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময়ের আবহে প্রতি বছর ডকুমেন্ট করা হয় ‘মায়া আর্ট স্পেস’-এর উদ্যোগে। গতবছর কোভিডের কারণে অনলাইনে হলেও ২০২১-এর ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হলো সপ্তম বর্ষের ‘পুজো শিল্প’ আড্ডা (যদিও আড্ডা@মায়া'র এটি ছিল ৭৭তম সন্ধ্যা)। আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন শিল্পী ভবতোষ সুতার, শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত, শিল্পী সুশান্ত পাল, শিল্পী প্রদীপ দাস, শিল্পী বিমল কুণ্ডু, পুজো আয়োজক-তত্ত্বাবধায়ক ধ্রুবজ্যোতি বসু এবং শিল্প-ঐতিহাসিক দেবদত্ত গুপ্ত। মায়া’র পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের অয়োজক ছিলেন মধুছন্দা সেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রদর্শিত হয় উপস্থিত চার শিল্পীর (ভবতোষ সুতার, পার্থ দাশগুপ্ত, সুশান্ত পাল, প্রদীপ দাস) এবছরের পুজোর কর্মকাণ্ড। ভিন্ন ভিন্ন আবহ সঙ্গীত সহ দুর্গাপুজোর ভিন্ন ভিন্ন ভাবনার এই প্রদর্শনী হয়ে উঠেছিল আড্ডার স্ফুর্তি। ১৮৩০-৪০ দশকে উইলিয়াম প্রিন্সেপের আঁকা একটি পুরোনো বাড়ির দুর্গাপুজোর ছবিতে দেখা যায়, গর্ভগৃহ বা ঠাকুর দালানের বাইরে টাঙানো হয়েছে শামিয়ানা। প্যান্ডেল-শিল্পের প্রাথমিক ধারণা এসেছিল এর মাধ্যমেই। বনেদি থেকে বারোয়ারি, চাঁদোয়া থেকে থিম, প্রতিমার গড়ন ও সাজ –বিবর্তনের হাত ধরে দুর্গাপুজো কীভাবে শিল্পে পরিণত হলো এবং এর যে দীর্ঘ যাত্রাপথ, সেখানে অহরহ পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। অনুষ্ঠান পরিচালনার মধ্য দিয়ে একথাগুলোই বলছিলেন দেবদত্ত গুপ্ত। তাঁর কথার সূত্র ধরেই শিল্পী বিমল কুণ্ডু বলছিলেন বিচারক হিসেবে তাঁর এবছরের পুজো-পরিক্রমার অভিজ্ঞতা। তাঁর কথায়, শিল্পীরা থিম এবং প্রতিমা নিয়ে যে পরীক্ষানিরীক্ষা করছেন, কয়েকজন বাদে বেশিরভাগের কাজেই ধরা পড়ছে একঘেয়েমি, কাজের ভিতর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। আমরা বলি ‘ঠাকুর দেখতে যাচ্ছি’, সেই ঠাকুরই যদি দায়সারা ভাবে উপস্থাপিত হয়, তাহলে আর কী হলো! অনেক সময় দেখা যাচ্ছে থিমের সঙ্গে প্রতিমা বেমানান। তাই সব দিক বিচার করে ‘ঠাকুর-শিল্প’ নিয়ে আরও বেশি করে ভাবতে হবে শিল্পীদের।
এই বক্তব্যের রেশ টেনে শিল্পী সুশান্ত পাল বলেন, তাঁর কাছে ঠাকুর আর প্রতিমার সংজ্ঞা আলাদা। ঠাকুরের মধ্যে দেব-মাহাত্ম্য থাকে আর প্রতিমা হল শিল্পীর মননজাত অবয়ব। তাঁর মতে মণ্ডপ-আবহ-প্রতিমা সবটা নিয়েই জাগ্রত হয় ঠাকুর। এবছরের বেশ কিছু পুজো-ভাবনায় উঠে এসেছে সমসাময়িক এবং ঐতিহাসিক সামাজিক-বক্তব্য। যেমন, শিল্পী ভবতোষ সুতারের যোধপুর ৯৫ পল্লী, অর্জুনপুর আমরা সবাই ক্লাব, নাকতলা উদয়ন সংঘের কাজ। তাঁর কাজে ফুটে উঠেছিল যথাক্রমে কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রা, একটি চেয়ারের ইনস্টলেশনের মাধ্যমে শাসকের অবস্থান, প্রতিমার শরীরে দেশছাড়া মানুষের অভিব্যক্তি। তাঁর কথায় উঠে এসেছিল যে পুজোগুলো প্রচারের আলোয় আসে না, সেগুলির কথা। তিনি প্রতি বছরই পুজোয় ‘ছোটোখাটো' পুজো পরিদর্শনে বেরোন এবং অনেক কাজই তাঁকে অবাক করে, আনন্দ দেয়।
আবার, তুলনামূলক ভাবে তরুণ শিল্পী প্রদীপ দাসের ভাবনায় এবছর সাড়া ফেলেছিল নাকতলা উদয়ন সংঘ (দেশভাগ), কাঁকুড়গাছি যুবকবৃন্দ শারদীয়া দুর্গোৎসবের (যাত্রা শুরু) থিম। পার্থ দাশগুপ্তের কাজে বরাবরই ঐতিহ্যের শিকড় জেগে ওঠে, আর তার রূপরেখা ধরা থাকে প্রতিমায়। এবছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তিনি বলছিলেন প্রশয়ের কথা। দুর্গাপুজো শিল্পীদের প্রশয় দেয়। জানা ও অজানা ক্ষেত্রকে কাজে লাগিয়ে নিজের ভাবনা নিয়ে ‘এক্সপেরিমেন্ট’ করার সুযোগ তৈরি করা।
দুর্গাপুজো থেকে একজন শিল্পীর ঠিক কী পুরস্কার পাওয়ার থাকতে পারে? পুজো আয়োজক-তত্ত্বাবধায়ক ধ্রুবজ্যোতি বসু এ ব্যাপারে একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলছিলেন, এক পুজো মণ্ডপে এক ভদ্রলোক ভিড়ের মধ্যে মোবাইল বের করে ছবি তোলার চেষ্টা করছিলেন, সঙ্গে ছিল তাঁর মেয়ে। মেয়েটি তার বাবাকে বলে, যে ছবি তুমি তুলছো তার থেকে ভালো ছবি তুমি ইন্টারনেটে পেয়ে যাবে কিন্তু শিল্পীদের এত যত্ন করে করা কাজের সঙ্গে দুদণ্ড কাটানোর সুযোগ পাবে না। এটাই হল পুজো শিল্পের মাহাত্ম্য এবং শিল্পীর শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
এভাবেই মনজ্ঞ আলোচনায় পুজো-শিল্প নিয়ে ‘মায়া আর্ট স্পেস’-এ প্রখ্যাত শিল্পীদের সান্ধ্যকালীন বিজয়ার বৈঠক চলেছিল আরও কিছুক্ষণ।
