নিসর্গের আড়ালে এক ইন্দ্র : মুর্শিদাবাদের ইন্দ্র দুগার

ভারতীয় শিল্পকলার জগতে মুর্শিদাবাদের আরও একটি বড়ো অবদান

কোম্পানি চিত্রশৈলীর সুবিশাল ঐতিহ্যের পাশাপাশি, ভারতীয় শিল্পকলার জগতে মুর্শিদাবাদের আরও একটি বড় অবদান; ইন্দ্র দুগার। বাংলায় তখন মুর্শিদকুলি খানের শাসনকাল (১৭১৭–১৭২৭)। ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে আজিমগঞ্জ, পূর্বদিকে জিয়াগঞ্জ বালুচর। এটি জৈন বণিকদের আদি বাসভূমি। এই অঞ্চলের বালুচর সিল্কের শাড়ি জগদ্বিখ্যাত। আঠারোশ শতকের প্রথম থেকে বাণিজ্যের আকর্ষণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বণিকশ্রেণী মুর্শিদাবাদে আসতে শুরু করে। নাহার পরিবার, দুধোরিয়া পরিবার, নওলাক্ষা পরিবার যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য‌। ঠিক এই সময় রাজস্থান থেকে নিজেদের ভাগ্যাম্বষণে মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে চলে আসে দুগার পরিবার। এই পরিবারেই ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন নিসর্গ চিত্রের যাদুকর ইন্দ্র দুগার।

জৈন ব্য‌বসায়িক পরিবারের সন্তান হয়েও ইন্দ্র দুগার কিভাবে শিল্পের দিকে ঝুঁকলেন, তার ইতিহাস জানতে আর একটু পিছনে যেতে হবে। ইন্দ্রের দাদু সুরজমলের ব্য‌বসার পাশাপাশি রাজস্থানী ক্ষুদ্র চিত্রকর্ম, জৈন চিত্রকর্ম, হাবেলি বা প্রাসাদ চিত্রের প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি ছেলে হীরাচাঁদ দুগারকে মাত্র ১৬ বছর বয়সে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটে (Government College of Art and Craft ) ভর্তি করে দেন। এখানে শিল্পের পাঠ শেষ করে হীরাচাঁদ কোম্পানি চিত্রকলার জনপ্রিয় শিল্পী ঈশ্বরী প্রসাদ ভার্মার অধীনে কাজ করতে শুরু করেন। ঠিক এই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করলে কলাভবনের দায়িত্ব নেন অসিত কুমার হালদার। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি জয়পুর মহারাজা আর্ট স্কুলে যোগ দেওয়ার জন্য‌ কলাভবন ছেড়ে দেন। এরপর নতুন অধ্য‌ক্ষ হন নন্দলাল বসু। মূলত তাঁরই ইচ্ছায় হীরাচাঁদ কলাভবনে যোগ দিতে কলকাতার পাঠ চুকিয়ে শান্তিনিকেতনে চলে আসেন। কলাভবনের আদিপর্বের ছাত্রদের মধ্যেই ছিলেন হীরাচাঁদ। নন্দলালের শিক্ষায় নিজেকে গড়ে তুলছিলেন তিনি। নন্দলালও তখন শান্তিনিকেতনে গাউচে, টেম্পেরা, বড়ো ফ্রেস্কো এবং ম্যুরাল নিয়ে পরীক্ষা শুরু করে দিয়েছেন। যদিও কলাভবনের পাঠ শেষ করে হীরাচাঁদকে সব ছেড়ে বাবা সুরজমলের নির্দেশে পারিবারিক ব্য‌বসায় যোগ দিতে হয়। কিন্তু শিল্পের প্রতি হীরাচাঁদের টান ছিল আজীবন। সময় পেলেই তিনি ছেলে ইন্দ্রকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে মাস্টারমশাই নন্দলালের কাছে চলে যেতেন।

ছোটো থেকেই কলাভবনের গুণী শিল্পীদের সান্নিধ্যে কেটেছে ইন্দ্র দুগারের। নিজের শিল্পবোধ তৈরির সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তিনি দেন নিজের বাবা হীরাচাঁদ, মাস্টারমশাই নন্দলাল আর কলাভবনের পরিবেশকে। খাতায় কলমে তিনি কখনও কলাভবনের ছাত্র ছিলেন না। সেই কারণে কোনও বিশেষ শিল্পধারাতে আটকে থাকেননি শিল্পী। বাবার মতো ইন্দ্র দুগারও স্বচ্ছ জলরঙে কাজ করতে বেশি পছন্দ করতেন। তেলরং নিয়ে কাজ করলেও মাস্টারমশাইয়ের নির্দেশে তা পরিত্যাগ করে জলরঙে মনোযোগ দেন। নন্দলালের কথা তিনি বেদবাক্য‌ মনে করতেন। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট চিত্র সমালোচক দ্বিজেন্দ্র মৈত্র লিখেছেন, ‘যৌবনে একবার ইন্দ্রর ইউরোপ যাত্রার ইচ্ছা হলো। সেই কথা তিনি নন্দলালের কাছে প্রকাশ করলে, মাস্টারমশাই ইন্দ্রকে প্রশ্ন করেন, তুমি কি অজন্তা, জৈন তীর্থস্থান শ্রবণ বেলগোল দেখেছ? ইন্দ্র নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করলে, নন্দলাল তাঁকে পরামর্শ দিলেন আগে নিজের দেশকে ভালোভাবে জানতে হবে। গুরুর আদেশ মেনে ইন্দ্র আর ইউরোপ গেলেন না।’ এইভাবে কলাভবনের ছাত্র না হলেও তাঁর শিল্পদর্শনে কলাভবনের ছাপ সুস্পষ্ট। এমনকি, ১৯৩৯ সালে রামগড় জাতীয় কংগ্রেসের মণ্ডপসজ্জার কাজ দেখে অনেকে মনে করেন তিনি কলাভবনে নন্দলাল বসুর ছাত্র। 

আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্দ্র দুগার কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিল্পের পাঠ গ্রহণ করেননি। কিন্তু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসুর শিল্পবোধকে তিনি ধারণ করেছিলেন। যার প্রভাব তাঁর শিল্পকর্মেও ফুটে ওঠে। জীবনের প্রথম ভাগে প্রতিকৃতি চিত্রকর হিসাবে কাজ শুরু করেন ইন্দ্র। প্রথমে বাড়ির কাজের লোক, বন্ধু্-বান্ধবদের ছবি আঁকতেন। এরপর শুরু করেন বিখ্যাত মানুষদের ছবি আঁকা। তবে এর শুরুটা হয় এক মজার অভিজ্ঞতা দিয়ে। শিল্পীর স্মৃতিকথন থেকে জানা যায়, একবার কলকাতায় সভা করবেন বলে এসেছেন শিক্ষাবিদ মদনমোহন মালব্য‌। নিজের আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে ইন্দ্র পৌঁছে গেলেন সভাস্থলে। সামনে দিকে বসার একটা জায়গাও পেয়ে যান। খুব মন দিয়ে পণ্ডিতজির প্রতিকৃতি এঁকে চলেছেন। পিছনে দাঁড়িয়ে এক আধিকারিক যে তা খেয়াল করছেন তা বুঝতে পারেননি শিল্পী। আঁকা শেষ হলে আধিকারিক ব্যক্তিটি ইন্দ্রকে সরাসরি মালব্য‌জির কাছে হাজির করলেন। যদিও পণ্ডিতজি খুশি হয়ে নিজের ছবির উপর সাক্ষর করে দিলেন। এরপর বহু বিখ্যাত মানুষের প্রতিকৃতি তৈরি করেছেন দুগার। 

অবশ্য‌ ইন্দ্র দুগারের শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্মগুলি প্রায় সবই নিসর্গ চিত্র। তিনি নিজের সময়ের একজন প্রথম সারির নিসর্গ চিত্রী এতে কোনও সন্দেহ নেই। তাঁর ছবি দর্শককে এক অসাধারণ অনুভূতির মধ্যে দিয়ে নিয়ে যায়। শিল্পী কখনও বাস্তব জগতকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেননি। নিজের শিল্পবোধ দিয়ে তার পুনর্বিন্যাস করেছেন। কোনও কিছু বিকৃত না করে, শুধুমাত্র অংশগুলির সামঞ্জস্য‌পূর্ণ উন্নতি করে আসল রূপ আরও তীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলায় ছিল শিল্পীর উদ্দেশ্য‌। তাঁর প্রতিটি ছবিতে ইন্দ্র দুগার পর্যবেক্ষককে একটি প্রবেশ পথ তৈরি করে দেন। যেখান থেকে সমগ্র শিল্পকর্মটি একা অন্বেষণ করা যায়। অবশ্য‌ আজীবন ভারতীয় শিল্পধারা অনুসরণ করলেও Mist and Mountains(১৯৬১), Dispersing Gloom(১৯৬৫), View of Nilgiri Hills from Doddabetta(১৯৬৫), A Pair Of Lilies (১৯৮৪)-এর মতো বেশ কিছু শিল্পকর্মে জাপানি নিসর্গ চিত্রের প্রভাব দেখা যায়। এমনকি দুগারের বেশকিছু ছবিতে তাঁর সাক্ষর জাপানি হানকোর (Hanko) দ্বারা প্রভাবিত। জাপানি নিসর্গ চিত্র, কালি চিত্র (Sumi-e) লক্ষ্য‌ করলেই শিল্পীদের সাক্ষরযুক্ত সিল বা হানকো চোখে পড়বে। ইন্দ্র দুগারের সাক্ষরেও হানকোর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

কোনও প্রথাগত শিক্ষা ছাড়া ইন্দ্র দুগার একজন স্বপ্রশিক্ষিত শিল্পী ছিলেন। শুধুমাত্র গুনীজনদের পরামর্শকে পাথেয় করে আর নিজের শিল্প দর্শনকে অবলম্বন করে, ভারতের অন্য‌তম শ্রেষ্ঠ নিসর্গ চিত্রীরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অবশ্য‌, চিরকাল থেকেছেন অন্তরালে।  

তথ্য‌সূত্র- পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, তৃতীয় খন্ড,-বিনয় ঘোষ।
অজন্তা- অসিত কুমার হালদার।
অপ্রকাশিত স্কেচে অজন্তা ও অন্যান্য – ইন্দ্র দুগার।

ছবি- Christie’s, DAG, Artsy

Developed by DXDasia