‘কালো’ বলে হেনস্থা! শিল্পী মিঠু সেনের কাজে ‘ফেমিনিজম’-এর নতুন পাঠ

প্রান্তিক স্বরের প্রতিরোধের শিল্পী তিনি

‘প্রান্তিক’ বলতে মনে আসে সমাজের মূলধারার সুবিধা থেকে বঞ্চিত মানুষদের কথা। কিন্তু প্রান্তিক কি শুধুই একটি বিশেষ গোষ্ঠীর নাম? মানুষের ইচ্ছে, হতাশা, রাগ, যৌনতা যেকোনো বিষয়ই যদি সমাজের মূলধারা থেকে আলাদা হয়, তাহলে তা হয়ে ওঠে প্রান্তিক, আর একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী মিঠু সেনের শিল্প চর্চায় তাই উঠে আসে বারবার।

মিঠু সেনের জন্ম বাংলায়, পেইন্টিং নিয়ে পড়াশোনা করেছেন বিশ্বভারতীর কলাভবন থেকে। তাঁর মা কবি, তাঁর শিল্পী সত্ত্বার আগে প্রাথমিক ভাবে কবিতাই ছিল উৎসাহের বিষয়। কী নিয়ে চর্চা মিঠু সেনের, কোন বিষয়ই বা উঠে আসে তাঁর শিল্পে?মিঠু সেন তাঁর দর্শককে ‘টিজ’ করতে চান, ‘প্রোভোক’ করতে চান, একাধিক সাক্ষাৎকারে উঠে আসে কাজের প্রতি তাঁর এই দর্শন। তাঁর প্রতিটি চর্চায়, অভ্যাসে এবং শিল্পে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কীভাবে তিনি এই প্রোভোকেশনের খেলা সূক্ষ্মতার সঙ্গে খেলেছেন।

একে এদেশে গায়ের রং কালো হলে রক্ষে থাকে না, তার ওপরে যদি লিঙ্গগত পরিচয় হয় ‘মহিলা’, বর্ণ-বৈষম্যবাদী মানুষ এবং সমাজ তাকে যাবতীয় মানসিক হেনস্থা আর অপমানের মধ্যে দিয়ে যেতে বাধ্য করে। কালো হওয়ার কারণে মিঠু সেনকে যখন থেকে অবশ্যম্ভাবী অপমান ও নিরাপত্তাহীনতার ভার মাথায় নিতে হয়েছে, তখন তিনি নিতান্তই শিশু, গোলাপি জামা পরার কারণে কটাক্ষের শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের এই ক্ষতের প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর কাজে, যখন তিনি গোলাপি চপ্পলের চারপাশে লিখে দেন, ‘বুরি নজরওয়ালে তেরা মু গুলাবি’।‘আর্ট টক’-এ দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান গায়ের রঙ সংক্রান্ত এই ট্রমার জন্য তাঁর প্যালেট থেকে গোলাপি রংটাই উধাও হয়ে যায়, ‘আই হেট পিঙ্ক’- এর মত শক্তিশালী কাজে তিনি রিক্লেইম করেছেন গোলাপি রঙকে, গোলাপি রঙ এবং তার গভীরে লুকিয়ে থাকা লিঙ্গ-রাজনীতি এবং বর্ণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে এটি একটি সুচিন্তিত প্রতিবাদ।চুল, কঙ্কাল, মাড়ি, দাঁত তাঁর কাজের অন্যতম প্রধান উপাদান হয়ে উঠেছে বারবার। নিজের মাথার চুল ব্যবহার করে অথবা কৃত্রিম ভাবে পলিমারের দাঁত তৈরী করে মিঠু সেন তাঁর কাজে দর্শকদের সঙ্গে এক অদ্ভুত সংযোগ তৈরী করেন। মানব শরীরের এই ধরণের লিঙ্গ নিরপেক্ষ অংশগুলো তাঁর কাছে বুনিয়াদি মাত্রা হয়ে ধরা দেয়।২০১৪ সালে মিশিগানের এলি অ্যান্ড এডিথ ব্রড আর্ট মিউজিয়ামে বিরাশি ফুট দীর্ঘ মাড়িসহ দাঁতের আদলে পলিমারের স্কাল্পচার বানান মিঠু সেন। এই প্রদর্শনীর নাম দেন ‘বর্ডার আনসিন’। ভাষা, গোষ্ঠী, ধর্ম, গাত্রবর্ণ বা লিঙ্গ, এ জাতীয় মুখ্য বিষয়গুলো সমাজে মানুষে মানুষে যে অদৃশ্য বিভাজন তৈরী করে, তারই প্রতিবাদী ভাষ্য হল ‘বর্ডার আনসিন’। দীর্ঘ এই স্কাল্পচার কয়েকটা বিভাগে ভাগ করা, যা মানবজীবনের অন্তর্নিহিত বিভাজনগুলোকেই ইঙ্গিত করে। এই স্কাল্পচার দর্শককে প্রলুব্ধ করে গন্ধ নিতে, তার নীচ দিয়ে বা ওপর দিয়ে হাঁটতে, স্কাল্পচারটিকে ছুঁয়ে দেখতে। যেকোনো রাষ্ট্রের কাছেই জাতির একতার চিন্তা প্রধান হওয়া উচিত, তবে স্বার্থলোভী প্রতিষ্ঠানের কাছে জাতির একতার প্রবণতা বৈধতা না পেয়ে প্রান্তিক হয়ে ওঠে আর মিঠু সেন তাঁর কাজের প্রোভোকেটিভ অ্যাপ্রোচে এই প্রান্তিকতারই প্রতিবাদী স্বর হয়ে ওঠেন।ছকে বাঁধা শ্রেণীভুক্ত করা নারী-শিল্পীর তালিকায় পড়তে চান না মিঠু সেন, তবে তাঁর শিল্প-চর্চার দর্শন অবশ্যই ফেমিনিস্ট এবং ললিত কলা একাডেমিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি ‘টিপিক্যালি ক্যাটাগোরাইজড ফিমেল-আর্টিস্ট’র তালিকায় পড়তে চাই না কারণ এই কয়েনেজটাই ভিত্তিগত ভাবে পুরুষতান্ত্রিক। তবে অবশ্যই দেশের কন্টেম্পোরারি আর্ট-প্র্যাক্টিসের ক্ষেত্রে একটি ‘ফিমেল ভয়েস’ বা ‘জেন্ডার্ড আইডেন্টিটি’ গুরুত্বপূর্ণ। বরং ফেমিনিস্ট হিসেবেই আমি স্বচ্ছন্দ বোধ করি।”মিঠু সেনের দর্শনে নারীবাদ উঠে আসে ব্যঙ্গ বিদ্রূপের রূপে, কৌতুকপূর্ণ উদ্ভট কম্পোজিশনে যেন নারী চরিত্রের কৌতুকপ্রিয়তা, প্রলুব্ধ করার প্রবণতার মধ্যে দিয়েই উঠে আসে আকাঙ্ক্ষার তুমুল, প্রবৃত্তির অপলাপ। নারীবাদী এই শিল্পীর কাছে ‘নারীবাদ’-এর অস্তিত্ব কখনোই আরোপিত নয় বরং সমাজের মূলধারা ও প্রান্তিকতার মধ্যে পাহাড়প্রমাণ দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ারই একটি রূপ।

“নারীবাদী শিল্প বা রচনার মধ্যে সীমাবদ্ধতা দেখতে পাই, আসলে নারীবাদী হতে হলে তা যে কেবল নারী সম্পর্কিতই হতে হবে তার কোনো মানে নেই, বরং লিঙ্গ-নির্বিশেষে সমাজের মূলধারা বঞ্চিত, অবৈধ প্রবৃত্তিগুলোর নির্ভীক প্রকাশের স্বাধীনতাই আমার কাছে নারীবাদ” মিঠু সেনের উপলব্ধি, “এখন প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ‘ফেমিনিজম’ তাকে নিজেকেই ‘ক্রাফট’ করতে হয়। ব্যক্তিবিশেষে এর চর্চা আলাদা আলাদা রকম হতে পারে, তবে ফেমিনিজম ‘ইন্ডিভিজ্যুয়ালিস্টিক’ নয়। এটা এমনই এক বিষয়, যা প্রতিনিয়ত ‘রি-ডিফাইন্‌ড’ হতে চায়”।

নিউ ইয়র্কের ‘বোস প্যাসিয়া’ গ্যালারিতে প্রদর্শনী হয় তাঁর প্রথমদিকের অন্যতম শক্তিশালী কাজ, “হাফ-ফুল”। নিজের মুখের কাট-আউট নানারকম ভাবে ব্যবহার করছেন তিনি, কখনো পেশিবহুল পুরুষ শরীরে, কখনো বৃদ্ধার শরীরে বা কখনো হাতে আঁকা কঙ্কালের ওপরে মর্ফিং করে বসিয়ে। নানারকম চরিত্রে তাঁর সেলফ-পোর্ট্রেট ব্যবহার করে নিজেকে নিয়ে তৈরী করতে চাইছেন এমন একটি জগত, যেখানে নিজেকে নানারকম ভূমিকায় রোল-প্লে করতে দেখছেন।

কেন নিজের মুখ ব্যবহার করছেন তিনি আপাত-সম্বন্ধহীন উদ্ভট এই ফিগারেটিভ ফর্মের সঙ্গে? শিল্পীর গভীর অন্তর্দৃষ্টির আভাস পাওয়া যায় যখন আর্ট টকে তাঁর কাজ সম্পর্কে বিবৃতি দেন, “আমি অন্যের মধ্যে নিজেকে দেখতে পছন্দ করি, অথবা বলা যায়, আমি একধরণের আইডেন্টিটিকে অন্য ধরণের আইডেন্টিটির মধ্যে মর্ফিং করে ঢুকিয়ে দিতে চাই”। ছবির ম্যানিপুলেশনে নিজের হাসিমুখের যেসব ছবি ব্যবহার করেছেন, ইচ্ছাকৃত ভাবেই তা যেন লিঙ্গ বিষয়ক নিপীড়ন বা বদ্ধমূল ধারণাগুলোকে ব্যঙ্গ করে, হিউমার দিয়ে চ্যালেঞ্জ করার জন্যেই।

মিঠু সেনের শিল্পী সত্ত্বার এই সচেতনতা শুধুমাত্র দৃশ্যগত মাধ্যমেই আটকে নেই, কাজের প্রয়োজনে বিভিন্ন রকম ভাবে কাজে লাগিয়েছেন ভাষাকে, স্পর্ধা দেখিয়েছেন মার্কেটকে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে দিল্লীতে পরিযায়ী হয়ে চলে যাওয়ার পরে তিনি ভাষার ওপর এক অদ্ভুত প্রাদেশিক কর্তৃত্ব অনুভব করেন। যেখানে ভাষার একমাত্র উদ্দেশ্য যোগাযোগ-স্থাপন করা, সেখানে যথেষ্ট মুনশিয়ানার সঙ্গে সঠিক উচ্চারণে ইংরাজি বা হিন্দি না বলতে পারার কারণে অপমানের শিকার হতে হয় তাঁকে। ক্রমে তিনি বাংলা ভাষা হারিয়ে ফেলেন, যিনি মাতৃভাষায় কবিতাকে তাঁর জীবনের প্রথম প্রকাশের মাধ্যম করেছিলেন, সেই তিনিই ভাষা হারিয়ে নীরব হয়ে পড়েন। ভাষাগত কারণে একটা বিরাট শূন্য গহ্বর তৈরী হয় তাঁর মধ্যে। কিন্তু প্রকাশের অদম্য ইচ্ছা কবি, শিল্পীকে আটকে থাকতে দেয় না। ফলে ভাষার এই হায়ারার্কি এবং হেজিমনি তাঁকে এমন এক ভাষার স্রষ্টা করে তোলে, যে ভাষার কোনো ব্যকরণ নেই, যে ভাষা মনে রাখার জন্য নয়, পুনর্বার পঠিত হওয়ার নয়, অভ্যাস করে শেখারও নয়, সর্বোপরি অন্য কোনো ভাষা সৃষ্টি করাও এর উদ্দেশ্য নয়। কীভাবে সৃষ্টি হল এমন এক ভাষা যে ভেতরে ও বাইরে এতটা স্বাধীন?কবি মগ্ন হয়ে কীবোর্ডে টাইপ করে কবিতা লেখার সময়ে তাকাননি স্ক্রিনের দিকে, সবটা শেষ করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখেন টেকনিকাল ফল্টে স্ক্রিন জুড়ে উদ্ভট ভাঙা এবং বিশ্লেষিত বর্ণের এক দুরূহ দুষ্পাঠ্য স্ক্রিপ্ট জন্ম নিয়েছে। মিঠু সেন লিখলেন না নতুন করে, সংশোধন করার চেষ্টাও করলেন না, বরং সেইসব ভুল করে জন্ম নেওয়া অক্ষরমালার স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান দিয়ে তৈরী হল ‘নো-ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা ‘আন-ল্যাঙ্গুয়েজ’। সেই কবিতার বই ছাপানো হল এবং পাঠককে অনুরোধ করলেন অর্থ বোঝার প্রত্যাশা না রেখে সেইভাবেই পড়তে অথবা তাঁর আবৃত্তি শুনতে। না-ভাষার এই স্বকীয় শক্তি প্রেরক ও গ্রাহকের মধ্যে তর্জমার অযোগ্য, ভাষার মালিকানা-মুক্ত এক বিশুদ্ধ সম্পর্ক স্থাপন করতে পারল। ললিতকলা অ্যাকাডেমির ‘আর্টিস্ট টক’-এ তিনি উল্লেখ করেন, “আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমার শ্রোতারা কাজের সঙ্গে কানেক্টেড ফিল করছে, যে ভাষা বুঝতে না পারলেও তাদের মধ্যে একটি অতৃপ্ত তাড়না তৈরী হচ্ছে। এই ভাষায় যোগাযোগ করতে পেরে এম্পাওয়ার্ড ফিল করি আমি।” “ডেস্পারেশন অফ কমিউনিকেশন” থেকেই এই আন-ল্যাঙ্গুয়েজ বা আন-ওয়ার্ডের জন্ম বলে মনে করেন মিঠু।শিল্পের বাজারীকরণকে সবসময় এড়িয়ে চলতে চেয়েছেন মিঠু সেন। কন্টেম্পোরারি আর্ট প্র্যাক্টিসে বাজারকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা সম্ভব নয় তিনি জানেন, একে অপছন্দও করেন না, কিন্তু নিজেকে বাজারের বশবর্তী করতে চান না তিনি। লন্ডনে এক প্রদর্শনীতে একজন পোটেনশিয়াল ক্রেতা তাঁর “আই ডিগ, আই লুক ডাউন” কাজটি কিনতে চাইলে তিনি পেইন্টিংটির ওপরে গ্লো-পেইন্ট দিয়ে কিছু অদ্ভুত অক্ষর লিখতে শুরু করলেন, যা আপাত ভাবে বিকৃতকরণ মনে হলেও মিঠু সেনের কাছে ছবিটির পুনর্জন্ম। তাঁর কথায় ‘শিল্পীর সমস্ত কাজ বিক্রয়যোগ্য নয়’।

‘আর্টিস্ট টক’-এ বলেন, “বাজারের প্রবণতা হল তোমাকে সে হিস্টোরিকাল সিক্যুয়েন্সের মধ্যে ফেলতে চায়, শিল্পীকে সময়ের ফ্রেমে বেঁধে কাজ বিচার করতে চায়। আমি তাই প্রতিনিয়ত নিজের কাজের মাধ্যম বদলাতে চাই, আমি পুনরাবৃত্তি পছন্দ করি না।” বাজারীকরণের মূলগত পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এই তাঁর প্রতিবাদ।তরুণ এই শিল্পী তাঁর স্বতন্ত্র শিল্পচর্চা ও জীবনদর্শনের কারণে ইতিমধ্যেই সারা পৃথিবী জুড়ে প্রভাব রেখেছেন। মিউজিয়াম বিনালে, গ্যালারি- nature morte, নিউ দিল্লির ব্রিটিশ কাউন্সিলে, মুম্বাইয়ের গ্যালারি কিমোল্ড, নিউইয়র্কের বোস প্যাসিয়া, ভিয়েনা, সিঙ্গাপুর, তাইপেয়ি, জুরিখ ও প্যারিসে তাঁর কাজ প্রদর্শিত হয়েছে। ২০১০-এ পান SKODA অ্যাওয়ার্ড। এছাড়া নিউইয়র্ক, ব্রাজিল, চীন, অস্ট্রিয়া, কেনিয়া, জাপান, সাউথ অ্যাফ্রিকায় পেয়েছেন আর্টিস্ট রেসিডেন্সি, কাজ করেছেন, স্পেস বদলে দিয়েছেন, বিপ্লব করেছেন স্পেস নিয়ে। প্রদর্শনীকে গ্যালারির মধ্যে আবদ্ধ রাখতে চাননি, নিয়ে এসেছেন দৈনন্দিন জীবন চর্যায়। 

Developed by DXDasia