টিলা আর জঙ্গলে ঘেরা জিলিংগোড়া – লাল টুকটুকে দরজা পেরোলেই ‘খুশিরালয়’

পুরুলিয়া আর ঝাড়খন্ডের সীমা ছুঁয়ে ছোট্টো একটা গ্রাম

টিলা পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা লাল মাটির দেশ। সরু বন পথ দিয়ে কষ্টেশিষ্টে গড়িয়ে যায় চারচাকা। বুনোগাছের ডালপালা ধাক্কা দেয় কাচের জানলায়। যতদূর এগোবে জনমনিষ্যি নেই। তবে ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্ট আর বিজলিবাতির তার বুঝিয়ে দেয় এ পথে মানুষের চলন আছে। চলতে চলতে কানে আসে পাতা ঝরার পলকা আওয়াজ আর দিন দুপুরে ঝিঁঝিঁর ডাক। চোখ জোড়া আকাশ আর জঙ্গলের গন্ধ যখন মনের ভিতর থিতু হতে শুরু করেছে আর আপনি ভাবছেন কোথায় এসে পড়লাম, তখনি দূর থেকে ভেসে আসবে কলকলানির স্বর।

কচি গলায় ধারাপাতের সুর। খিলখিলে হাসি। মধ্যে মধ্যে দিদিমনির মিষ্টি বকুনি।

উৎসের সন্ধান করতে গেলে, এসে দাঁড়াতে হয় একখানা পাথুরে ঘরের সামনে। লাল টুকটুকে তার দরজা। দরজা ঢেলে ভিতরে ঢুকলেই অন্য পৃথিবীর খোঁজ। দুয়ার খুললেই ধরা দেবে ‘খুশিরালয়’ – কিছু আলোমাখা মুখ। সংখ্যায় তারা মেরেকেটে চল্লিশ। গত সাতমাস ধরে এই ঘরখানাই হয়ে উঠেছে জিলিংগোড়া আর পাশের তিন গাঁয়ের প্রাণের টান। দিন বদলের কারণ। জিলিংগোড়া শিশু শিক্ষা প্রাঙ্গন।

পুরুলিয়া আর ঝাড়খন্ডের সীমা ছুঁয়ে ছোট্ট গ্রাম জিলিংগোড়া। পাহাড়, জঙ্গল নদী আর ঝর্ণায় ঘেরা এখানকার জীবন। হঠাৎ দেখলে  আর পাঁচটা উপজাতি গ্রামের সঙ্গে সেভাবে তফাৎ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

কিন্তু জিলিংগোড়ার বিশেষত্ব এখানকার মানুষরা। জিলিংগোড়ার জোরও তাঁরাই। জল-জঙ্গল-নদী-মাটি আঁকড়ে বাঁচা জীবন। সেই ভালবাসার অধিকার আর দাবির কথা তাঁরা লিখে রাখেন ঘরদোর আর দেওয়ালের গায়ে।চাষবাস আর পাতা কুড়িয়ে চলে সংসার। সেন্সাসের কাগজে এ গ্রামের নাম মেলে না। গুগলে সার্চ করলে মুশকিলে পড়তে হয়। ওদের ঘরের ভাঙা চালের মতোই স্থানীয় অর্থনীতি। পড়াশোনা তো অনেক দূরের স্বপ্ন!

সেই স্বপ্নই দেখেছিলেন এ গ্রামের কয়েকজন মানুষ। নাছোড় জেদে লড়ে যাওয়া। এই লড়াইতে রক্তপাত নেই। রণসাজ নেই। আগামীর চোখে অক্ষর চেনার আগ্রহ ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ আছে। জিলিংগোড়া প্রাথমিক স্কুলের বুনিয়াদ শুধু স্বপ্ন।২০২১, মার্চ।

গ্রামে কোন কোন বাচ্চা পড়তে চায়?

তারা কি আসতে চায় ইস্কুলে?

কেন আসতে চায়?

কী বলছে পরিবার?

এমন সব প্রশ্ন নিয়ে গ্রামের মানুষের দরজায় দরজায় এসেছিল মিতভাষী এক যুবক। নাম চিত্তরঞ্জন টুডু। তাদের মত জেনে তৈরি করেছিল এক তালিকা। তার ইচ্ছের জোরকে ‘না’ করতে পারেনি গ্রামের মানুষ। তারা বলেছিল ‘পড়তে পাঠাবে ছেলেমেয়েগুলোকে’।

ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে আসবে, কিন্তু বসবে কোথায়। গাছের তলা, পাহাড়ের কোল, কোথাও একটা হবে পড়াশোনা; এগিয়ে এলেন শ্রাবণ হেমব্রম। তার ঘরেই বসবে ইস্কুল। মেটে ঘর। তাতে কী!

২০২১-এর মাঝ এপ্রিল। বৈশাখের প্রথম দিন – পয়লা বৈশাখ। জিলিংগোড়ার মানুষদের কাছে সেদিনটাই হয়ে উঠেছিল আলাদা পরবের। আজ থেকে ইস্কুল বসবে যে!

২৫ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছিল স্কুল। মাস্টারমশাইয়ের নাম চিত্তরঞ্জন টুডু। আর আছেন জ্যোৎস্না দিদিমণি। পুরো নাম জ্যোৎস্না টুডু। এই ইস্কুলের ‘মা’। তাঁর টানেই বারবার ক্লাসে ফিরতে চায় অবোধ মুখগুলো।

জ্যোৎস্না দিদিমণির সঙ্গে কচিকাঁচারা

বাংলা, অলচিকি ভাষায় চলে পড়াশোনা। সঙ্গে সহবত, আচারব্যবহার আর মিলেমিশে থাকার পাঠ। রোজ ইস্কুল এসে পড়াশোনা আর সাথীদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকলেই পাওয়া যাবে স্কুল থেকে উপহার। কেক কেটে, মোমবাতি জ্বেলে জন্মদিন পালনও হয়। ছাত্র-শিক্ষক মিলে গাওয়া হয় জন্মদিনের গান। দেওয়ালে জ্বলজ্বল করেন বিআর আম্বেদকর, সিধুকানহু আর রঘুনাথ মুর্মুর মুখ। শিকড়ের টান এভাবেই বেঁধে রাখে ওদের।

জিলিংগোড়া শিশু শিক্ষা প্রাঙ্গন-এর মেটে ঘর পাথর দিয়ে পাকা হয়। জ্যোৎস্না দিদিমণি ডেকে আনেন গ্রামের মহিলাদের। মিলেমিশে মাটি লেপা হয় দেওয়ালে। এবড়োখেবড়ো মেঝে মেজে বসার ব্যবস্থা। এই দু'জন মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন শ্রাবণ হেমব্রম আর কৃষ্ণ মুর্ম। কৃষ্ণ নিজেও কিশোর ছাত্র। আর আছেন গ্রামবাসীরা। এই স্কুলের ঘন্টার আওয়াজ যাঁদের বদলে দিয়েছে একটু একটু করে। অন্য সব নেশাকে হারিয়ে পেয়ে বসেছে অক্ষর চেনা আর অক্ষর চেনানোর নেশা। গড়া হয়েছে স্কুলের কমিটিও।

পুষ্টির জন্য শিশুদের আহারের ব্যবস্থা করেছে এই স্কুল। ডিম, কলা আর সোয়াবিন দেওয়া হয়। জ্যোৎস্না দিদিমণি নিজে হাতে রান্না করেন কচিকাঁচাদের জন্য। শীতে সোয়েটারের ব্যবস্থা করেন। বাধা অনেক তবু চেষ্টা চলছেই গড়ে তোলার। এক হাতের সঙ্গে অনেক হাত মিলে।চেনা শহর থেকে খুব দূরে নয় , তবু যেন মনে হয় অনেক দূর। কোনও এক কল্প কাহিনির দেশ জিলিংগোড়া। সব গল্প বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে সেখানের। মন এমনিই গুনগুন করে ওঠে বাঁচবো বাঁচবো রে আমরা…

ছবি: নিজস্ব

Developed by DXDasia