
পিয়াল ভট্টাচার্যের সাক্ষাৎকার
তিনি সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত, টেগোর ন্যাশানাল স্কলার, নাট্যনির্মাতা, মার্গনাট্য-চর্চায় পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। মার্গনাট্য, কথাকলি, ভাবানুকীর্তণ, ভরতের ‘নাট্যশাস্ত্র’ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা, ভরতমুনির নামে নাট্যমণ্ডপ বানানোর ইচ্ছে, সবকিছু নিয়েই বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে কথা বললেন ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রের ‘মহামহোপাধ্যায়’ পিয়াল ভট্টাচার্য।
_______________________
ভরতের নাট্য হিসেবে ‘মার্গনাট্য’ কথাটা আপনার আগে কেউ ব্যবহার করেননি। ‘মার্গনাট্য’ এই শব্দবন্ধটিই কেন?
দু’টো শব্দ আছে — পথ আর মার্গ। সংস্কৃতে যখন আমরা পথ বা পন্থা শব্দ ব্যবহার করি, সেটি নির্দিষ্ট লক্ষে পৌঁছানোর নির্দিষ্ট একটি রাস্তা। কিন্তু মার্গ শব্দের প্রয়োগে জড়িয়ে রয়েছে ‘মৃগ্যতে’ কথাটি — ধরো যখন কেউ মৃগয়া করতে যান — শিকারের সেই রাস্তাটি তো নির্দিষ্ট নয়! শিকার হিসেবে লক্ষ্য যদিও বা স্থির, ধরা যাক হরিণ বা শূকর, কিন্তু সে কোন দিকে দৌড়বে, কোথায় লাফ দেবে তা তো আগে থেকে নির্দিষ্ট নয়। এক্ষেত্রে লক্ষ্য স্থির, পথ অনির্দিষ্ট। তাই মৃগয়ায় শিকারির চলার রাস্তা তৈরি হয় শিকারকে ধাওয়া করতে করতে। এই যে চলতে চলতে পথের জন্ম হচ্ছে — এটাই মার্গ। আমার প্রক্রিয়াটিও পূর্ব নির্ধারিত নয়, সেটাও ক্রমশ তৈরি হয়েই চলেছে, এবং মৃত্যুর আগে অবধিও হয়তো সেটা চলতেই থাকবে। এর পরেও যদি কেউ যদি এই পরম্পরাকে বা আমার এই অন্বেষণকে অনুসরণ করতে চান, তাহলে তার জন্যেও এই মার্গ কোনোদিন পথের মতন নির্দিষ্ট হয়ে যাবে না। তাঁকেও নিজের মার্গ নিজেকেই বানিয়ে নিতে হবে! এই হচ্ছে এর লাক্ষণিক অর্থ। আমার মার্গ, আমার অন্বেষণকে নির্দিষ্ট কোনও পথে বাঁধেনি কখনওই। যেদিন কাজ শুরু করেছিলাম, সে ছিল আমার অপরিণত ও অপরিপক্ব দশা। ১৯৯৭ সালে, পদ্মা সুব্রহ্মনিয়মের নাচ দেখে, সেই নাচই আমার মৃগয়ায় যাওয়ার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ধরা দিল। কিন্তু তারপর সেই লক্ষ্যবস্তু অনুসরণ করতে করতে এখন কোথাও একটা এসে পৌঁছেছি, বছর কয়েক আগেও তো অন্য কোথাও এসে পৌঁছেছিলাম! সেদিন যেমন জানতাম না আজ কোথায় এসে পৌঁছাবো, তেমনই আজ জানি না এর পরে কোথায় গিয়ে পৌঁছাবো। মৃত্যুর সময়ে কোথায় থাকব সেটাও জানি না। এই খোঁজ, এই ধাওয়া করা তাই এক নিরবচ্ছিন্ন খেলা, অ্যাকাডেমিক ভাষায় তুমি ‘প্রসেস’ বলতে পারো। পারফর্মিং আর্টসকে আমরা কীভাবে দেখব, চিনব, আত্মসাৎ করব — সেই পদ্ধতিটি নির্মাণের সময় আমি সামনে নাট্যশাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তু করে এগিয়েছি, কিন্তু এই লক্ষ্যবস্তুটি সকলের কাছে এক নয়। ব্যক্তি নির্বিশেষে সেই লক্ষ্যবস্তু কী হবে, কেমন হবে সেটি তাঁর ব্যাপার; তবে শব্দার্থ এক্ষেত্রে একই থাকবে।
একটা ভরত নাট্যমণ্ডপ বানানোর ইচ্ছা আছে! মনে হয়েছে ভরতমুনির নামে পৃথিবীর বুকে কিছু নেই! চেষ্টা হয়েছে অনেক, কিন্তু শেষমেশ ঘটেনি। আমি সেই চেষ্টা করেই দেখব একবার!

স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে ‘থিয়েটার অফ দি রুটস’ বলে একটি আন্দোলনের জন্ম হয়, খুব জেনারালাইজ করে বললে তার উদ্দেশ্য ছিল নাট্যের ভিতর দিয়ে আমাদের শেকড়ের অনুসন্ধান করা। মার্গনাট্য কি সেই পথকেই অনুসরণ করে? নাকি মার্গনাট্যের উদ্দেশ্য তার থেকে আলাদা?
আমার চর্চা আলাদা নয়, আবার একও নয়। থিয়েটার অফ দ্য রুটস-এ হঠাৎ আমরা “রুট”-এর দিকে গেলাম, শেকড়কে জানলাম, শেকড়ের উপকরণগুলি দিয়ে থিয়েটার করা শুরুও করলাম। কিন্তু আমি একটা কথা বলি — আমরা কি গরুর বাঁটের দুধ সরাসরি দুইয়ে খাই? না। সেটা শোধন করি, প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে নিই। তাহলে শেকড়কে অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি থিয়েটারে প্রয়োগ করব কেন? ভরত আমাদের একটা পদ্ধতি শেখান — শোধনের পদ্ধতি। সেই পদ্ধতির নাম ভাবানুকীর্তণ। শেকড় তৈরি করে দেয় আমাদের চেতনা, নির্মাণ করে দেয় আমাদের বোধ। যে বোধ কখনওই বই পড়ে তৈরি হওয়া যম্ভব নয়। এখন এই শেকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি দেশকাল। একটি নির্দিষ্ট দেশকালের শেকড় চর্চা করে, তাঁকে শিখে সেই দেশকালকে অতিক্রম করার যে পদ্ধতি, ভরত আমাদের তা ভাবানুকীর্তণ তত্ত্বের দ্বারা শেখাচ্ছেন। আমিও তো কথাকলি শিখেছি, একবারে শেকড়ে গিয়ে, গুরুপরম্পরায় শিখেছি, এবং সেখানে গিয়ে বুঝেছি, কথাকলি নির্মাণের সময় কোট্টারাকারা তাম্পুরণকে কখনওই ভাবতে হয়নি যে তিনি হঠাৎ ‘রুটেড’ কীভাবে হবেন। তাই ‘রুটেড’ হতে হবে, এই বোধটি আমার কাছে কোথাও একটা আরোপিত বলে মনে হয়। প্রথাগতভাবে ধরে নেওয়া হয় যে কথাকলি আসলে কলারিপায়ট্টু বা কৃষ্ণনাট্যমের নানান উপকরনের দ্বারা নির্মিত, কিন্তু এই আদান-প্রদানটি কে কবে করল? সেই পদ্ধতিটি কী আমায় ‘রুটেড’ হতে হবে এই ভাবনার উপজ? তা নয়। আসলে আমাদের দেশে যখনই নতুন কোনও শিল্পের জন্ম হয়, নতুন শিল্পকে লালন-পালন করা হয়, বা তার কোনও নিয়ম বা পদ্ধতি বাঁধা হয়, তখনই সেখানে ভরতসূত্রের প্রাধান্যতার প্রয়োজন পড়ত। এই ভরতসূত্র তো একজন দ্রষ্টার রচনা, এবং বেদ, বেদ মানে কিন্তু চতুর্বেদ নয়, এ আসলে পার্ফরমিং আর্টসের ইউনিভার্সাল কনশাসনেস! আগে আমাকে তাই আমার বুদ্ধিকে যুক্ত করতে হবে এমনই এক সর্বজনীন চেতনার সঙ্গে। সেই সংযোগের জন্য একটা সূত্র চাই। সেই সূত্র দেন ভরতমুনি। কখন দেন? যখন ভরতের উপর আমাদের আস্থা থাকে! এখন আমি যদি ‘মুনি কনশাসনেস’কে মনুষ্য কনশাসনেস ভাবি, তাহলে এই আস্থা জন্মানোর কথা নয়! আমার সেই অসুবিধা হয়নি যেহেতু আমি গুরুপরম্পরায় থেকে শিখেছি। গুরুর প্রতি আস্থা আমার ছিল, তাঁকে মেনে, ও সেই গুরুচৈতন্যের দ্বারা ‘রুট মুভমেন্ট’-এর যে তাত্ত্বিক দিক, তাকে আমি শোধন করে ফেলেছি। আমার প্রক্রিয়া তাই শুরু হয় নাভিশুদ্ধিকরণের মাধ্যমে। আমাদের যা মূল। এই নাভিশুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়াটিই রয়েছে কলারিপায়ট্টুতে, সেখান থেকে কথাকলিতে এসেছে, এই একই জিনিস রয়েছে কুটিয়াট্টমেও। কলারিপায়ট্টুর ক্ষেত্রে এই যে মূল, যা যুদ্ধের জন্য, কথাকলিতে অভিনয়ের জন্য তাকেই উপযোগী করে নেওয়া হয়েছে, একইভাবে তার প্রক্রিয়াকরণ করে নেওয়া হয়েছে কুটিয়াট্টমের জন্যেও, প্রয়োজনের নিরিখে। তাহলে কী আমার থিয়েটার ‘রুটেড’ হলো না? হলো তো। তাই আমার থিয়েটার, আমার নাট্য ‘থিয়েটার অফ দ্য রুট’ নয়, এই কথা যদি বলি তাহলে সে উচ্চারণ তো মিথ্যে হয়ে যায়। আসল প্রশ্নটি হলো সেই ‘রুট’ শোধিত হবে কীভাবে! আমি একটি পরিবারে জন্মেছি, সেই পরিবারের শেকড় আমার মধ্যে আছে। কিন্তু আমি পরিবারের প্রত্যেক মানুষের মতো হুবহু আচরণ করি না। কেন? কারণ আমার নিজস্ব চেতনা আছে। সেই চেতনা পরিবারকে অস্বীকার করে না — তাকে বিকশিত করে। রুটকেও তেমনই বিকশিত করতে হয়। কেবল ব্যবহার করলেই হয় না, তাকে চেতনার ভিতর দিয়ে উত্তীর্ণ করতে হয়। আর নাট্যে এই পদ্ধতিটিই হলো ভাবানুকীর্তণ!
ভাবানুকীর্তণকে কি আরেকটু একটু ব্যাখ্যা করবেন?
ভাবানুকীর্তণকে ব্যাখ্যা করলেও কেউ কোনোদিন পুরো বুঝবে না। কারণ ভাব হলো সত্ত্ব, সত্যস্বরূপ। ভাবানুকীর্তন মানে সেই ভাবকে পুনরুচ্চারণ করা, ‘রিটেলিং’ বলতে পারি আমরা ইংরেজিতে — কিন্তু তার আগে দুটো কাজ দরকার: গভীর পর্যালোচনা, তারপর সেই পর্যালোচনা অনুযায়ী অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গে শিল্পের নবরূপনির্মাণ। অ্যাকাডেমিক ভাষায় বলি যদি তাহলে প্রথমে ‘রিভিউ’ করতে হবে, তারপর ‘রিডু’ করতে হবে। বাঙালি হিসেবে যখন আমি তাই কথাকলি পারফর্ম করছি সে আমার কথাকলির ‘রিডুইং’। এখন মালায়লম যার মাতৃভাষা, যিনি ঐ চেতনায় জন্মেছেন, আমার পক্ষে তো তাঁর সত্ত্বে নিজিকে মিলিয়ে দেওয়া, বিলিয়ে দেওয়া সম্ভব না। বাঙালি হিসেবে আমরা ভাবুক প্রকৃতির, আমরা প্রশ্ন করি, উত্তর খুঁজি, আমাদের সংস্কারে বইছে অবন ঠাকুরের, সত্যজিৎ রায়ের উত্তরাধিকার। সেই সত্ত্বা দিয়েই আমি কথাকলিকে কোনও এক সময় নবরূপনির্মাণ করেছিলাম বলেই হয়ত আজ এই কাজটি আমি করতে পারছি! এই হলো ভাবানুকীর্তণের পদ্ধতি, অনুশীলন। একে এর চেয়ে বেশি বৌদ্ধিক চর্চায় বোঝা সম্ভব বলে আমি মনে করি না। এর আরেক কারণ এটাও হতে পারে, আমার পদ্ধতি তো প্রয়োগনির্ভর! শিল্পের পর্যালোচনা ও নবরূপনির্মাণের দ্বারাই তাঁর সত্ত্বের পুনরুচ্চারণ সম্ভব। এ ভীষণ কঠিন এক নৈয়ায়িক পদ্ধতি। একে ব্যাখ্যা করতে গেলেই জটিলতার সৃষ্টি হয়। কিন্তু অনুশীলন করলে হয়ে যায় সহজ। আমাদের দেশে তাই এই জটিলতাগুলি এড়ানোর জন্য কিছু সূত্র রেখে দেওয়া হয়েছে। এই সূত্র কেবল অনুশীলনের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায় — ব্যাখ্যা দিয়ে নয়।
আপনার নাট্যের অভিজ্ঞতালব্ধ দর্শকমাত্রই জানেন যে সেটা ভীষণভাবে নতুন। বিষয়ে এবং সেই বিষয়ের উপস্থাপনে। নৃত্য, গীত, বাদ্য, টেক্সট, অলঙ্কার, আঙ্গিক, বাচিক, প্রপস বা মঞ্চ নির্মাণ যাকে আমরা সিনোগ্রাফি বলি, প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রে, যা এর আগে কেবল পশ্চিমবঙ্গ শুধু না সারাভারতেই এর কোনও দৃষ্টান্ত-এর সঙ্গে মেলে না। আবার নতুন মানেই তা যে সমকালীন নয়, এমনটা বলা যায় না।
আমি কিছুই নতুন করি না। ওই যে বললাম, আমি পুরনোকে রিভিউ করি, তারপর রিডু করি। একে আমি নতুন বলি না। ধরো এই যে মঞ্চ তুমি দেখছ সামনে, এটি কি নতুন? নতুন তো নয়! যদি আমাদের নামঘরে যাও, তুমি এরকম দেখতে পাবে! এবার নামঘরে গিয়ে আমার ভিতরে কিছু প্রশ্ন জাগে; এটা এমন কেন হলো? এই প্রশ্নটি আমি নামঘরের কাউকে গিয়ে করেছি এমনটি নয় কিন্তু। কিন্তু প্রশ্নটি আমি বরং করেছি নিজেকে! নামঘরের কাউকে এই প্রশ্নটি করলে, সে তো আমাকে তাঁর পরম্পরার একটা থিওরিটিক্যাল উত্তর দেবে! সে তো আমার নাট্যের উপযোগী হবে না। তাকে সরাসরি প্রয়োগ না করে শোধনের মাধ্যমে উপযোগী করতে হবে।
এবার আমি দেখলাম শ্রীযন্ত্র—আবার পিরামিডের গঠন দেখলাম, মিশর বা মায়া সভ্যতার। বুঝলাম, বিষয়টা আসলে এক ধরনের এনার্জি গ্রিড। যদি আমি সেই শক্তিক্ষেত্র তৈরি করে কথা বলি, তাহলে চেতনা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এখন এখানে এই মঞ্চ নির্মাণের কারণ? এই নাট্যের (সৌগন্ধিকাহরণম্) দুটি চরিত্র হনুমান ও ভীম, যথাক্রমে একজন ত্রেতাযুগের ও অপরজন দ্বাপরযুগের; ত্রেতাযুগের একজনের সঙ্গে দ্বাপরযুগের এক চরিত্রের সংবাদ সৌগন্ধিকাহরণম্! এখন আমরা তো কেউ যুগপরিবর্তন বা যুগসন্ধিক্ষণে বাঁচি না, তাই তার অভিজ্ঞতাও আমাদের নেই, আমরা একটা যুগে বাঁচি, আর একটা যুগেই শেষ হয়ে যাই! যুগান্তর আমাদের বোধে তাই ধরা দেয় না। যুগান্তরের বোধকে তাই যিনি ধরতে পারেন, তিনি নিশ্চয়ই আমাদের পঞ্চভূতের যে দেশকাল, বা সীমা-পরিসীমা তার বাইরের কেউ। সেই অতিক্রমণকে ধরতে পারার জন্যই, এই যে পিরামিড আকারের মঞ্চনির্মাণ আমরা করলাম, তাকে পাঁচটি লেয়ারে করা হলো! এখন পাঁচটি লেয়ারের পাঁচটি রং! এই প্রপঞ্চকে অতিক্রম করে বসে আছেন আমাদের হনুমান, পূর্বযুগীয় এক চৈতন্য, যাকে আমরা মানতে বুঝতে চেষ্টা করি না! আমাদের যা কিছু সবকিছুই তো সময়ের ভবিষ্যৎ কল্পনায়। অতীতের সঙ্গে আমাদের সংযোগ হয় ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্টের নইলে উপেক্ষায়। অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনযাপনের পদ্ধতি তো মানুষের স্বাভাবিক নয়। তাহলে মঞ্চে সময়ের যে এই ত্রিমাত্রিক বোধ বা গতি, তাকে আমি কী করে বলব! প্রথাগত ভাবে হয়ত মানুষ বলবেন মত্তবারণী ব্যবহার করো! মত্তবারণীর ব্যবহার না করে তাই একে আমরা অন্যরকম ভেবেছি। কিন্তু একে তুমি নতুন বলতে পারবে না। ভারতীয় জ্ঞানধারায়—এখানে “ভারতীয় জ্ঞান” মানে শুধু বেদান্ত নয় বরং অন্য এক বিস্তৃত অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র—এটা ভাষায় বোঝানো যায় না, আমি শুধু সেই ক্ষেত্রকে ‘রিভিসিট’ করেছি, আর সেই যে বললাম, ‘রিভিউ’, তাই-ই করেছি, এই পুনর্দর্শনের ভিতর আমার যে প্রশ্নটি ছিল তার উত্তরটি পেলাম, সেই তাকেই আবার শোধন করে নাট্যে প্রয়োগ করেছি। আমার নাট্যে তাই নতুন কিছু নেই, সবই শোধিত, পুরনো। কেউ পারফিউম পছন্দ করে আবার কেউ আতর! এভাবেই তো অধিকারী আলাদা হয়ে যায়! কোনও ভারতীয় শাস্ত্রকার বা শিল্পী কখনও নতুন কিছু নির্মাণ করার দাবি কখনওই করেন না! তাঁরা ইউনিভার্সাল কনশাসনেসকে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছেন, তাকে যৌক্তিক উপায়ে গ্রহণ ও শোধনের মাধ্যমে পুনরুচ্চারণ বা রিটেল করেছেন বলতে পারো!
একজন বড়ো গুরু, তাঁর মনে হয়েছে আমি এই ফিল্ডের মহামহোপাধ্যায়, তাই দিয়েছেন! অদ্ভুত! আসলে আমাকে দেওয়ার কথা ছিল পুরু দধীচ সম্মান। হঠাৎ করেই একদিন বলা হলো—“আপনাকে এই উপাধি দেওয়া হচ্ছে।”

আমার বিস্ময়টা এখানে: আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি যে যক্ষের বিরহ আর লকডাউনের মানুষের একাকিত্ব এক সুতোয় গাঁথা যেতে পারে। এত ক্লাসিক পড়েও এটা মাথায় আসেনি।
আসলে এটা কানেক্ট হয় তখনই, যখন তোমার ভিতরের অভিমুখ আলাদা। আমার মধ্যে পাশ্চাত্যের ওরিয়েন্টেশন নেই। ছোটোবেলা থেকে ভারতীয় আখ্যান, গল্প, শাস্ত্র—এসবের মধ্যে বড়ো হয়েছি। ফলে আমি খুঁজে কানেক্ট করি না—ওগুলো নিজে থেকেই যুক্ত হয়ে যায়। পুরনো বন্ধুর সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলে, আমি চিনতে না পারলে, সে ঠিক আমাকে চিনে ডেকে ওঠে, “এই পিয়াল…চিনতে পারছিস?”, ঠিক তেমন ভাবেই লকডাউনের সময়, আমার পুরনো পাঠ সেই কালখণ্ডটিকে চিনতে পেরে আমারই ভিতর থেকে ডেকে উঠেছিল, “কী রে, বুঝতে পারছিস, যক্ষের বিরহ ঠিক কেমন ছিল!”
আরও একটি দিক আছে, অধ্যাত্ম। আপনার নাট্যে দেখি লৌকিক থেকে অলৌকিকের দিকে যাত্রা। আপনার নাট্যে অলৌকিক ঠিক কী? অধ্যাত্ম আপনার কাছে কী?
আসলে আমি সারাজীবনই অলৌকিক জগতে বাস করি। লৌকিক জগতে খুব কম থাকি। রবীন্দ্রনাথ “কল্পলোক”-এর কথা বলেছেন—আমি সেই কল্পলোকেই বাস করি। আমার ঘর, আসবাব, রং, পর্দা—সবকিছু আমি অন্যভাবে সাজাই। এর সঙ্গে অর্থের সংযোগ যে আছে তা কিন্তু নয়। একসময় তো আমার আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না, তখনও আমার ভিতর সেই কল্পলোক বিরাজ করেছে। এই অলৌকিকত্ব-এর সঙ্গে কীভাবে কম্প্রোমাইজ করতে হয় সেটা আমি শিখিনি কোনোদিন। আমি বীণা বাজাই, বাইরে খুব একটা বেরোই না। আমার কোনও বন্ধুও নেই তাই। আমি আজও আমার নাট্যে প্লাস্টিকের ফুল ব্যবহার করি না। শোলার ফুল করাই—খরচ বেশি হলেও। কারণ প্লাস্টিকের মধ্যে মানুষের চেতনা নেই। আমার নাট্যের কোনও প্রপস-ই তাই যন্ত্রনির্মিত নয়! আমি চাই বহু মানুষের চেতনাকে এক জায়গায় এনে একধরনের সমষ্টি চেতনা ঘনীভূত করতে। এই ঘনীভবনের মধ্যেই আমার অলৌকিক, মানবিক চেতনার ম্যাজিক! তাই যখন আমরা মঞ্চকে ডিসম্যান্টেল করি, তাকে কিন্তু জড় ভেবে করি না। বরং তাকে আমরা দেখি একটি অবয়ব হিসেবে! এই ভাবনাই নিয়ে আসে আসল পরিবর্তন। আমার নাট্যনির্মাণের পদ্ধতিটিতেও তাই শিশিক্ষুর চেতনার মাহাত্ম্য বেশি, তাকে জোর করে কিছু করানোর চেষ্টা কম।
সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পাওয়ার পর পরই এক ইংরেজি পোর্টালে কথোপকথনের সময় বলেছিলেন, শিল্পী হিসেবে আপনি ‘টোট্যালিটি’-তে বিশ্বাসী। আপনার সঙ্গে কিছুটা সময় যা কাটিয়েছি, তাতে বুঝি সেই টোটালিটির অর্থ বস্তু-সামগ্রিকতা নয়, বরং এক প্রকারের পূর্ণতা। তাই কি? যদি তা হয়, তাহলে একটু বুঝিয়ে বলবেন একজন শিল্পীর পূর্ণতা কীসে? সেই পূর্ণতা বোধটা ঠিক কী?
এটা শিল্পীভেদে আলাদা। আমি সংজ্ঞা দিতে পারি না—দিলে সেটা জ্ঞান দেওয়া হয়ে যাবে। আমি পূর্ণতাকে সবসময় পূর্ণতা হিসেবেই দেখি। নিজেকে ভেঙে ফেলতে চাই, সীমা ছাড়িয়ে যেতে চাই। আমি অসীমে ভাসতে চাই, সীমাবদ্ধতায় থাকতে চাই না। পূর্ণতা মানে আমার কাছে শেষ নয়—অসীমের দিকে ধাওয়া।
যখন এসব মঞ্চে উপস্থাপিত হয়, যখন সায়ক শাস্ত্রোচ্চারণ করে, নিতান্ত সংস্কৃত না জানা দর্শকও সংস্কৃত উচ্চারণ শুনে, তার মর্মার্থ অনুভব করে হাততালি দিয়ে ওঠে, বা জেনজি প্রতিনিধিরা রিল বানায়। অথচ এই বিষয় ও উপস্থাপনে অনভিজ্ঞ দর্শক প্রত্যেকেই দেশকাল ভুলে গিয়ে সেই মঞ্চায়নের রসাস্বাদন করেন, নির্মাতা হিসেবে একে আপনি ঠিক কেমনভাবে দেখেন? (এই কি ভারতীয় সেই চেতনা যা যা ভীষণ সুপ্ত হিসেবে ভিতরে থাকে, এবং কেবল একটি স্পর্শে জেগে যায়?)
আমার ধারণা আমার নাট্যের যে “মেটেরিয়াল অ্যাট্র্যাকশন”, তার কারণে করে—দেখে করল, বুঝে করল—এভাবে ভাবি না। কেউ রিল বানায়, বানিয়ে বলে এত ভিউ হয়েছে, তাতেই সে খুশি! আমি যদি বলি, আমি রাস্তায় হাঁটলে গরু, বাছুর, কাক, পশুপাখি, গাছ, পাহাড়, ধুলো, বাড়ি—দেখেছো সবাই আমাকে দেখছে, আমি কেমন গণ্যমান্য—তাহলে আমার মতে সে পাগলামির লক্ষণ। কিন্তু এটা আমার মত, অন্যের মত জানি না!
আজ থেকে তিনদশক আগে, এই চর্চার পিছনে যে প্রয়োজনবোধ ছিল, আজও কি সেই একই প্রয়োজনের অনুভব হয়?
তিন দশক আগে আমার মানসিক পরিপক্বতা ছিল না। চেতনা কী, জানতাম না। জীবনের উত্থান–পতন আমাকে শিখিয়েছে। (কিছুক্ষণ থেমে) চেতন হওয়া যায় না—অচেতন হওয়াই যায়। এখন আমার জীবনের কোনো নির্দিষ্ট পারপাস নেই। এই যে মার্গনাট্য, তাকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার কোনও তাগিদ তাই আমার নেই। জীবনের কোনও এক সময় আমি বুঝেছিলাম যে, আমি হলাম ‘এপিটোম অফ অচেতনতা’, আমার যাবতীয় ভোগান্তির কারণও ছিল তাই। আমি আমার সেই সাফারিং থেকে উত্তীর্ণ হতে চাইছি। কারণ আমি দেখেছি—যদি কষ্ট ভোগ করি, সেই ফ্রিকোয়েন্সি অন্যদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। তাই যদি চাই অন্যরা কম কষ্ট পাক, আমাকে আগে কষ্টের স্তরটা অতিক্রম করতে হবে। সেই কাজটাই আমি শিল্পের মাধ্যমে করেছি। আমি বর্ন আর্টিস্ট, আমার এটাই উচিত বলে মনে হয়েছে আমার জন্য। (আরেকটু থেমে) জীবনে কিছুই পরিকল্পিত নয়। হবে কি হবে না—দুটোই ভালো। তবু কাজ করতে হয়—এত মানুষকে সামলাতে হয়, বিল্ডিং সামলাতে হয়, অর্থ জোগাড় করতে হয়। যেদিন এগুলোর বাইরে বেরোতে পারব, সেদিন আর টাকার দরকার হবে না—সেটাই পরিকল্পনা। আমরা কিছুই তৈরি করি না। তৈরি করার অহংকারটাই করি। বাড়ি বানালেও জমি পৃথিবীর, ইট পৃথিবীর, সিমেন্টও পৃথিবীর। সবই পৃথিবীর ধার। একটা ভরত নাট্যমণ্ডপ বানানোর ইচ্ছা আছে! মনে হয়েছে ভরতমুনির নামে পৃথিবীর বুকে কিছু নেই! চেষ্টা হয়েছে অনেক, কিন্তু শেষমেশ ঘটেনি। আমি সেই চেষ্টা করেই দেখব একবার! করে ফেলতে পারবো তেমন আত্মবিশ্বাসী নই, তবে চেষ্টা করে দেখতে তো ক্ষতি নেই। যদি হয়! আর যদি না হয় জীবনের শেষে যেখানে পৌঁছব, সেখানে সামান্য ইট বাঁশ খাড়া করে একটা চাল বেঁধে উৎসর্গ করে চলে যাব। আমার প্রাকজীবনের সেই যে প্রয়োজন আজ আর তাই মনে পড়ে না! আমরা বাঁচি প্রয়োজন মেপে, না কি প্রয়োজনের বাইরেও কিছু আছে—এই প্রশ্নটাই আসল।
এবার একটু পশ্চিমবঙ্গের দিকে ফিরে আসি। এখানে শেষ সত্তর বছরের কালক্রমে সবচেয়ে বেশি করে যা চর্চিত হয়েছে তা হলো রাজনৈতিক নাটক বা বেশিরভাগ কলোনিয়াল কৃতি। কলকাতার এই রাজনৈতিক থিয়েটার নিয়ে আপনার মত কী?
তথাকথিত রাজনৈতিক নাটক আমি সে অর্থে দেখি না, দেখার সুযোগ হয় না। আসলে শিল্প তো মানুষের অন্তর্চেতনার প্রকাশ। যার অন্তর্চেতনায় রাজনীতি, সেই রাজনৈতিক থিয়েটার করবে! আমি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই। আমার থিয়েটারে আমি রাজনীতি আন্ডারলাইন করে দেখাই কি না—লোক বুঝলে বুঝবে। আর আমার নাট্যের মাধ্যমে আমি কী দেখাই সেটা দর্শককে আমি বলে দেব না। যদি কেউ বলে, “আমি রাজনীতি দেখাচ্ছি”, তাহলে সেটা আমার কাছে বোকামি। আসলে আমাদের দেশে রাজনীতি যেটা হয়, সেটা আমরা নিজেরাই বুঝি না, আর বুঝি না বলেই সেটার শিকার হই।
পশ্চিমবঙ্গের, মফস্সল হোক কিংবা কলকাতা, সামগ্রিক থিয়েটারচর্চা ভীষণভাবে স্যালারি-গ্রান্ট-নির্ভর, অথচ তারপরেও দল, সেই দলের ভাঙন, কুৎসা, এবং শেষমেশ নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে আমরা কেউই তেমন অপরিচিত নই। অথচ সেই চর্চারই প্রাণকেন্দ্রে থেকে স্যালারিগ্রান্ট ছাড়া, কিংবা ক্ষমতার বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষের প্রিয়জন না হয়ে, এমনকি ছাত্রছাত্রীদের থেকে এক পয়সা না নিয়েও কীভাবে চিদাকাশ এক দশকেরও বেশি সময় সার্ভাইভ করে এখন দেশের অন্যতম ব্যস্ত এক প্রতিষ্ঠান সে বিষয়ে যদি কেউ জানতে চায় তাকে কী বলবে?
গ্রান্টের প্রয়োজন আছে—এটা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু জীবনে কোনোদিন জানতাম না গ্রান্ট বলে কিছু আছে। আমি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার জায়গা থেকে আসিনি। নিজের উপার্জনে শিল্প শিখেছি, রিসার্চ করেছি।
আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি যে যক্ষের বিরহ আর লকডাউনের মানুষের একাকিত্ব এক সুতোয় গাঁথা যেতে পারে। এত ক্লাসিক পড়েও এটা মাথায় আসেনি। আসলে এটা কানেক্ট হয় তখনই, যখন তোমার ভিতরের অভিমুখ আলাদা।

অনেকেই জানেন না, আপনি মহাভারতের টীকাকার মহামহোপাধ্যায় হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের বংশজ। মহামহোপাধ্যায় হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ থেকে মহামহোপাধ্যায় পিয়াল ভট্টাচার্য, একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো কখনও এমনটা মনে হয়?
ওই “মহামহোপাধ্যায়”হতে চেয়েছিলাম—পারিনি। সংস্কৃত পড়তে গিয়ে আমার এসবের প্রতি ভীষণ টান ছিল। ভাবতাম অনেক পড়াশোনা করব। কিন্তু একার জীবন, কোনো খুঁটি ছিল না—শেষ পর্যন্ত পড়াশোনাটা সম্পূর্ণ হয়নি। এটা স্বীকার করতে আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু ওই যে, কখনও কখনও সন্তানের সামর্থ্যের বাইরে হলে বাবা এসে বলেন, কী রে তোর একটা বাইকের ইচ্ছা ছিল, এই নে কিনে দিলাম! আমার ভিতর মহামহোপাধ্যায় উপাধির প্রতি যে কৌতূহলটি ছিল, হবার বাসনা নয়, বরং সেটি কেমন জানার, সেভাবেই একদিন কেউ এসে আমাকে উপাধিটি দিয়ে দিল। আমি কি ওটি হবার যোগ্য আদৌ! সন্দেহ আছে, তাই কোথাও লিখিও না নামের আগে! একজন বড়ো গুরু, তাঁর মনে হয়েছে আমি এই ফিল্ডের মহামহোপাধ্যায়, তাই দিয়েছেন! অদ্ভুত! আসলে আমাকে দেওয়ার কথা ছিল পুরু দধীচ সম্মান। হঠাৎ করেই একদিন বলা হলো—“আপনাকে এই উপাধি দেওয়া হচ্ছে।” আমি অবাক—“আমাকে কেন?” তবু দিয়েছে। ঘরে টাঙিয়ে রেখেছি।
আমার শেষ প্রশ্ন, নাট্যশাস্ত্র সম্বন্ধে সচেতনতা বেড়েছে। শিল্পচর্চা সম্বন্ধীয় যেকোনো সেমিনার বা পডকাস্ট কিংবা টক শো-এ নাট্যশাস্ত্রের উল্লেখ ইদানীং প্রচলিত। একটি প্রথম শ্রেণীর ইংরেজি দৈনিক বেশ কয়েকবছর আগে তাঁদের একটি প্রতিবেদনে আপনাকে ‘গুরু অফ এ লস্ট ট্র্যাডিশন’ আখ্যা দিয়েছে। নাট্যশাস্ত্র সম্বন্ধে কৌতূহলী, আগ্রহীজনদের প্রতি সেই গুরুর কোনও উপদেশ?
আমার কোনো উপদেশ নেই। যার কৌতূহল জেগেছে, সে জেনে যাবে—আমি এই বিশ্বাস করি। আমাদের শাস্ত্রেই এর উত্তর আছে, তাই প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। তার মনে যদি প্রশ্ন জেগে থাকে, তবে পথও খুলবে। কিন্তু সে যেন নিজের মতো জানে। আমার মতো জানলে মুশকিল। যে সত্যিই জানতে চায়, সে জানবে। আমার কাছে না এলেই আমি খুশি। এইটুকুই উপদেশ।
