সুমন সাহা নির্দেশিত-অভিনীত নাটক ‘নিঃসঙ্গ ঈশ্বর’
প্রভাসে নিবিড় অরণ্যানির গভীরে ঈশ্বরকৃষ্ণের মুখোমুখি হয়েছেন মানবকৃষ্ণ। একদা সমগ্র ভারতবর্ষের রাজনীতি যার অঙ্গুলিহেলনে সঞ্চালিত হয়েছে আজ তিনি নিঃসঙ্গ, অপেক্ষা করছেন চিরবাঞ্ছিত মৃত্যুর। তাঁর সুদীর্ঘ শতাধিক বছরের বর্ণময় রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন থেকে তুলে নিয়ে আসছেন একেকটি অধ্যায়। বিশ্লেষণে বিদীর্ণ করছেন নিজেকে। তাঁর সেই অভিব্যক্তি ঈশ্বরত্বের যন্ত্রণা নাকি মানবতার আকুতি?

বেঙ্গল রেপার্টরি-র নিবেদনে এবং সুমন সাহার নাট্যপ্রয়োগ ও অভিনয়ে ‘নিঃসঙ্গ ঈশ্বর’ নাটকটি আদতে শ্রীকৃষ্ণের আত্মকথন বলেই বোধ হয়। মূলত মহাভারতের ‘মৌষল পর্ব’ অবলম্বনে শ্রীকৃষ্ণের অন্তিম মুহূর্তটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই একাঙ্ক নাটকে, যদিও কৃষ্ণজীবনের অন্যান্য অনেক অধ্যায়ই আলোচিত হয়েছে।
বেঙ্গল রেপার্টরি-র নিবেদনে এবং সুমন সাহার নাট্যপ্রয়োগ ও অভিনয়ে ‘নিঃসঙ্গ ঈশ্বর’ নাটকটি আদতে শ্রীকৃষ্ণের আত্মকথন বলেই বোধ হয়। মূলত মহাভারতের ‘মৌষল পর্ব’ অবলম্বনে শ্রীকৃষ্ণের অন্তিম মুহূর্তটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই একাঙ্ক নাটকে, যদিও কৃষ্ণজীবনের অন্যান্য অনেক অধ্যায়ই আলোচিত হয়েছে। নাট্যকারের ভাষ্যমতে এটি নাট্যশাস্ত্রের ‘ভাণ’ শৈলীর ফলিত রূপ। একক অভিনয়ে শিল্পী সুমন সাহা মহাভারতের বেশ কিছু চরিত্রে অভিনয় করেছেন যা ‘ভাণ’ শৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

এই নাটকের ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে রয়েছে এক অদ্ভুত জীবনবোধ, যা দর্শকের মননে তীব্রভাবে আঘাত করে। ঈশ্বরের জীবন নিয়ে আলোচনায় মানবজীবনের রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে— এ এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা বটে। ধ্রুপদী চলনের সংলাপে সমকালীন জীবনের অনেক অব্যক্ত কথা ফুটে উঠেছে মঞ্চের অঞ্জনাভ আলোয়। নেপথ্যে কত শত বছরের প্রাচীন জয়দেবের গীত ধ্বনিত হচ্ছে। মঞ্চের কেন্দ্রে শ্রীকৃষ্ণের পাষাণোপম একটি মানবপ্রতিমা বসানো রয়েছে। অভিনেতা তাঁর নিজের ইচ্ছেমতো প্রতিমাটি চালিত করছেন, কখনও তাঁকে আবৃত করছেন, কখনও তাঁকে অনাবৃত করছেন— সুদর্শন চক্রলাঞ্ছিত সেই বস্ত্রখণ্ডের আন্দোলনে নাট্যকার শ্রীকৃষ্ণের লৌকিক ও অতিলৌকিক জীবনের মধ্যে পার্থক্য বিশদ করতে চাইছেন। অভিনেতার কণ্ঠে কখনও ‘পুত্রশোকপরিপ্লুতা’ গান্ধারীর অভিসম্পাত, কখনও যুধিষ্ঠিরের অনুনয় আবার কখনও রণক্লান্ত স্বজন বিচ্ছিন্ন শ্রীকৃষ্ণের বিলাপ। আবার কখনও দর্শকের দিকে ছুড়ে দিচ্ছেন প্রশ্নবাণ, আক্ষেপ। কেন শ্রীকৃষ্ণের কেবল ভগবৎসত্তাকে হাতিয়ার করে বেনিয়ার দল বেসাতি করে যায়? তাঁর জীবন কি এতটাই আয়াসসাধ্য ছিল? কেন শুধুমাত্র বাল্য-কৈশোরের সামান্য কিছু বছরের মাধুর্যমণ্ডিত ব্রজজীবন তাঁর বাকি জীবনের সংগ্রামের থেকে বড়ো হয়ে উঠবে? এ কি আমাদের মাধুর্যলিপ্সা না পলায়নপর মনোবৃত্তি? ভগবানের মনুষ্যবৃত্তি আবরিত থাকলে তাতে আমাদের সুবিধা না ভগবানের সুবিধা? এমন নানা প্রশ্ন ধেয়ে এসেছে দর্শকাসনের অভিমুখে। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে যত আচারে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূজা হয়েছে, তত আঙ্গিকে তাঁর মানবসত্তার বিচার হয়নি। নাট্যকার উদাত্ত স্বরে সেই প্রস্তাবনাই রেখেছেন। আজ মানবসভ্যতার সংকটের দিনে এই সহজিয়া প্রস্তাব অত্যন্ত সমীচীন।

সংগীতে গীতগোবিন্দম্-সহ অন্যান্য সংগীত অত্যন্ত সুললিতভাবে পরিবেশিত হয়েছে। শিল্পী জয়দীপ সিন্হা ও শুভাশিস সরকারের সাংগীতিক দক্ষতা প্রশ্নাতীত। আলোক ও শব্দ প্রক্ষেপণও যথাযথ। কেবল কৃষ্ণবিষয়ক প্রবন্ধে বাংলা বৈষ্ণব পদাবলির প্রয়োগ শোনার প্রত্যাশাটি দর্শক হিসেবে অতি কষ্টে সংবরণ করেছি। আর একটি বিষয়ে একটু প্রত্যাশাভঙ্গ হয়েছে, জরা ব্যাধের নিক্ষিপ্ত তীর শ্রীকৃষ্ণের পদতলে বিদ্ধ হয়েছে এমনটি বোঝাতে কোনও মাটির পায়ের সাহায্য প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না। মূল অভিনেতা সহকারী অভিনেতার সঙ্গে যে আবেগঘন রসায়ন গড়ে তুলেছিলেন অভিনয়ের মাধ্যমে, তা এমনিতেই যথেষ্ট শক্তিশালী। সহকারী অভিনেতা তথা শ্রীকৃষ্ণের প্রস্তরবৎ প্রতিমার মধ্যেই সেই আবেগটি স্থিত থাকলে রসাভাসের আশঙ্কা থাকত না।
আরও পড়ুন: প্রেম ও স্পর্ধার ‘চিঠির জুবান’

এক কৃষ্ণ বহু হয়েছেন, লীলাসূত্রে, তাই কি লীলা সংবরণকালে তিনি একা, নিঃসঙ্গ? ঈশ্বরকৃষ্ণ ও মানবকৃষ্ণের কি সাক্ষাৎ হয়েছিল সত্যিই? না এও কবির কল্পনা? পরিপ্রশ্নের মাধ্যমে তত্ত্বদর্শন হয়। এই নাটকটি সেই প্রচেষ্টাকেই উসকে দেয়। প্রচলিত ধারণার প্রতি এমনকি নিজের প্রতিও সন্দেহ জাগায়, প্রশ্ন করতে শেখায়। নাট্যকার এই সাহস দেখালে দর্শককেও তো কিঞ্চিৎ সাহসী হতেই হয়। তবেই চতুষ্কোণ মঞ্চের বাইরে বেরিয়ে নাটকটি বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে।
(সুমন সাহার নিঃসঙ্গ ঈশ্বর সম্প্রতি মেটা মাহিন্দ্রা এক্সিলেন্স ইন থিয়েটার অ্যাওয়ার্ডে দেশের সেরা থিয়েটার প্রযোজনা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। সমকালীন বাংলা থিয়েটারে এই জয় ঐতিহাসিক।)