
প্রাচ্য প্রযোজিত ও বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশিত ক্যালিগুলা-র রিভিউ
গাইউস সিজার অগাস্টাস জার্মানিকাস, ডাকনাম ‘ক্যালিগুলা’, ৩৭ থেকে ৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রোমে সাম্রাজ্য চালান। জুলিয়াস সিজারের মতো বিখ্যাত নন (হয়তো শেক্সপিয়ার নাটক রচনা করেননি বলেই), কিন্তু তার থেকেও অনেক বেশি হিংস্র এবং তুঘলকি। কেন? তাহলে বরং তাঁর নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের কথা আপনাদের বলি। যেমন, রাষ্ট্রের কোষাগার ভরার জন্য সরকারি কর্মচারীদের সকল ধনসম্পদ সমর্পন করতে হবে রাষ্ট্রের কাছে, না করলে মৃত্যুদণ্ড। যেমন পতিতালয়ের আয় বৃদ্ধির জন্য পতিতালয়ে যাওয়া এবং মদ্যপান প্রত্যেক নাগরিকের জন্য আবশ্যক। যেমন, রাজ্যের শস্য ভাণ্ডার করা হবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। কিন্তু ক্যালিগুলা এগুলো কেন করেন? নিজেকে দেবী ভেনাস হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে, বা কখনও ঈশ্বরের থেকেও ক্ষমতাশালী প্রমাণ করে এবং মানুষের জীবন বিপন্ন করে কী প্রমাণ করতে চাইছেন ক্যালিগুলা?

একটি উচ্চমানের শিল্প যেমন হওয়া উচিত, অর্থাৎ বহুমাত্রিক, এই নাটক যেন ঠিক তাই। এই নাটক যেমন আজকের সময়কে, সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে (দেশের তথা বিশ্বের) প্রশ্ন করে, আবার তেমনই ভয়ংকরভাবে প্রশ্ন করে মানুষের অস্তিত্বকে, প্রশ্ন করে বেঁচে থাকাকে। এ যেন কামুর ‘মিথ অফ সিসিফাস’-এর বিস্তৃত রূপ।
এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কতটা সম্ভব জানি না, তবে প্রশ্নগুলো আরও প্রকোটভাবে পাওয়া যাবে নাটক ক্যালিগুলা-তে (প্রাচ্যের নাটক ক্যালিগুলা)। প্রযোজনায় প্রাচ্য, মূল নাটক অ্যালব্যের কামু, ভাষান্তর ও সম্পাদনা রতন কুমার দাস, নির্দেশনা বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়। এই নাটক ২০১৪ সাল থেকে মঞ্চস্থ করতে শুরু করে প্রাচ্য, মাঝে কিছু বছর বন্ধ ছিল এর অভিনয়। আবারও ২০২৫ সালে দ্বিতীয় পর্যায়ে শুরু হল ক্যালিগুলার অভিনয়। একটি উচ্চমানের শিল্প যেমন হওয়া উচিত, অর্থাৎ বহুমাত্রিক, এই নাটক যেন ঠিক তাই। এই নাটক যেমন আজকের সময়কে, সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে (দেশের তথা বিশ্বের) প্রশ্ন করে, আবার তেমনই ভয়ংকরভাবে প্রশ্ন করে মানুষের অস্তিত্বকে, প্রশ্ন করে বেঁচে থাকাকে। এ যেন কামুর ‘মিথ অফ সিসিফাস’-এর বিস্তৃত রূপ। জীবনের যাত্রা একমাত্র মৃত্যুর দিকেই, এই বেঁচে থাকা অর্থহীন। অর্থহীনতাই সত্যি, এই সত্যই হিংসা ও ঘৃণার পথ ধরে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে ক্যালিগুলা।
বোন তথা প্রেমিকা দ্রুসিলার মৃত্যুর পর থেকে ক্যালিগুলা বদলে যায়। সে ক্রমাগত ‘চাঁদ’ খুঁজতে থাকে। ক্যালিগুলার লক্ষ্য, তাকে এমন কিছু পেতে হবে, যা আর কেউ পেতে পারে না। ক্যালিগুলা হয়ে ওঠে একটি ‘vulnerable identity’। সঙ্গে সঙ্গে খয়ের মুখে দাঁড় করায় গোটা সমাজকে, দেশকে। শূন্যের ভিতর এই ঢেউ খুঁজতে যাওয়া লড়াইয়ে ঝুঁকির মুখে পড়ে যায় দেশ, জনগন। ক্যালিগুলার ব্যক্তি চরিত্র পৃথক হলেও, তার নেওয়া পদক্ষেপের সঙ্গে মিলে যেতে থাকে দেশের তথা পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের বর্তমান অবস্থা।

গৌতম হালদার বিগত কিছু বছরে নিজের অভিনয়রীতি থেকে অনেকটাই ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন এই নাটকে, তাই তাঁর অভিনয় দেখতে বিশেষভাবে ভালো লাগে। তবে একজন অভিনেতার কথা বলতেই হচ্ছে, সৃজিতা দত্ত।
এই কারণেই কি বিপ্লববাবু আবারও ফিরে দেখতে চাইছেন ক্যালিগুলাকে? নির্দেশক বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “ক্যালিগুলা প্রথম মঞ্চে আসে ২০১৪ সালে, তবে টেক্সটটি পাওয়া তারও কিছু বছর আগে। এই টেক্সটের মধ্যে যে অ্যাবসার্ডিটি আছে, সেটিকে মঞ্চে নির্মাণ করা এবং আর্টিস্টিক প্রেজারের দিক থেকে সেটিকে উপভোগ করা, এই দুটিই খুব গুরুত্বপূর্ণ, তবে তারই সঙ্গে থেকে যায় চারপাশের প্রেক্ষিত। থিয়েটারের দর্শনের দিক থেকে আমি প্রোপাগান্ডিস্ট নই বা আমি যে পলিটিক্যাল থিয়েটার খুব বিশ্বাস করি তাও নয়, তবে তার পরেও পারিপার্শ্বিক সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতিকে বাদ দিয়ে থিয়েটার করতে পারি না। ‘Art for art’s sake’ আমার কাছে খুব একটা প্রয়োজনীয় বিষয় নয়। ২০১৪ সালে দেশে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই নাটকটি আমার কাছে নতুনভাবে উন্মোচিত হয়। তখনই গৌতম হালদারের সঙ্গে কথা হয়, গৌতম রাজি হন। ক্যালিগুলোর মধ্যে যে লিরিক্যাল প্যাটার্ন আছে, যে অ্যাবসার্ডিটি আছে, শব্দের অনুষঙ্গ হিসেবে শব্দকে অতিক্রম করে যাওয়া যে শরীরে ভাষা এই নাটকে প্রয়োজন, সে নিরিখে অভিনেতার দিক থেকে আমাদের প্রজন্মের ক্ষেত্রে গৌতমের সমকক্ষ আর কেউ নেই।”
তিনি আরও বলেন, এই নাটক কি শুধুমাত্র একটি ক্লাসিক হয়ে থেকে যাবে, নাকি একই সঙ্গে সমসাময়িকও হয়ে উঠবে – সে চিন্তা ছিলই। সময়কে প্রশ্ন করা, বিপ্লববাবুর মতে শিল্পচর্চার একটি প্রধান কাজ। এই নাটক ক্লাসিকের পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও রেখে যায়।
এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, কামুর ক্যালিগুলা চরিত্রটি প্রথম থেকেই জীবনকে অর্থহীন হিসাবে ধরে নেয়, এবং সেই সিদ্ধান্ত থেকেই আগামীতে অগ্রসর হয় ও একটি ফ্যাসিস্ট অবয়ব গ্রহণ করে। কিন্তু আমরা স্বচক্ষে যে রাষ্ট্রনেতাদের দেখছি, তারা কিন্তু কেউই জীবনকে অর্থহীন হিসাবে চিহ্নিত করছেন না। তাহলে কি আমাদের চোখে দেখা রাষ্ট্রনেতারা এবং ক্যালিগুলা কোথাও গিয়ে আলাদা হয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরে বিপ্লববাবু বলেন, “কামুর শিল্পের দর্শনগত জায়গা থেকে যে মত উঠে আসছে, সেটি আমাদের শিল্পচর্চার বিষয়। কিন্তু এটা ভিতরের অংশ। তার যে বাহ্যিক অংশ, যেখান থেকে চরিত্রটির সুপারম্যান হওয়ার ইচ্ছা তৈরি হচ্ছে, যেখান থেকে সবকিছুকে ছাপিয়ে চরিত্রটি নিজেই কখনও ভেনাস হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছেন অথবা কখনও ভয়ের আবহ তৈরি করে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করছে, সেই বাহ্যিক আভরণটির সঙ্গে আজকের ফ্যাসিজমের একটি তুলনা করা যায়। একজন মানুষ হিসেবে ক্যালিগুলা যখন তার অনুভূতি প্রকাশ করছে সেই ক্যালিগুলা এবং শাসক, প্রশাসনিক ক্যালিগুলো আলাদা। তার মধ্যে বরং পারস্পরিক বিরোধী আছে। এখান থেকে ক্যালিগুলো আলাদা হয়ে যাচ্ছে তার গভীর অনুসন্ধানে জীবনচর্চার জন্য। ক্যালিগুলার ব্যক্তিজীবন এবং রাজনৈতিক জীবন দুটো সার্বিকভাবে ভিন্ন চেহারা নিতে থাকে। যে দর্শক ক্যালিগুলোর অ্যাবসার্ড দর্শনটা বুঝতে পারবে, তাদের কাছে নাটকটি একটু অন্য আর্টিস্টিক প্লেজার নিয়ে আসবে, তবে আজকের সময়ে আমি ক্যালিগুলোকে কীভাবে দেখতে বা দেখাতে চাইছি সেটি এই নাটকটির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।”

ক্যালিগুলা নব পর্যায়ে মঞ্চে আসার ফলে আবারও উন্মাদনা দেখা দিয়েছে, যা উপচে পড়া একাডেমি মঞ্চ থেকেই বোঝা যায়। গৌতম হালদার বিগত কিছু বছরে নিজের অভিনয়রীতি থেকে অনেকটাই ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন এই নাটকে, তাই তাঁর অভিনয় দেখতে বিশেষভাবে ভালো লাগে। তবে একজন অভিনেতার কথা বলতেই হচ্ছে, সৃজিতা দত্ত। সৃজিতা নিজের বাস্তব বয়সকে ছাপিয়ে গিয়ে মঞ্চে যে বলিষ্ঠ অভিনয়টি করেছেন, সেটি বাংলা মঞ্চে বর্তমানে বিরল। থিয়েটারের মঞ্চও যে একটি দৃঢ় রাজনৈতিক বক্তব্য রাখতে পারে, সেটি প্রমাণ করে ক্যালিগুলার মঞ্চ নির্মাণ। সার্বিকভাবে ক্যালিগুলাকে একটি মেদহীন ঝরঝরে আধুনিক বাংলা নাট্য প্রযোজনা বলাই যায়। সবশেষে এটুকুই বলার, প্রযোজনাটির শেষ ৩০ সেকেন্ডের জন্যই এটি একাধিকবার দেখা যায়, কেন? নিজেরা গিয়ে দেখে আসুন…
