প্রেম ও স্পর্ধার ‘চিঠির জুবান’

বজবজ আগামী প্রযোজিত নাটক চিঠির জুবান

প্ৰিয় পাঠক,

নেককাল পর আপনাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। কেমন আছেন? পরিবারের সকলে ভালো আছেন তো? এর মাঝে যোগাযোগ করা হয়নি বলে কিছু মনে করবেন না। আজ একটা গল্প বলার জন্য এই চিঠিটা লিখছি, একটা নাটক দেখার গল্প। কিছুদিন আগে পদাতিক থিয়েটারে একটা নাটক দেখলাম। চিঠির জুবান। বজবজ আগামী-র প্রযোজনা। নাটকটি লিখেছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন ও অভিনয় করেছেন এবং ঈপ্সিতা। নির্দেশকের নামটি প্রথম চমক জাগায়। এবং ঈপ্সিতা। এর সঙ্গে কি ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’-এর কোনো যোগসূত্র আছে? কে জানে। এবার ফেরা যাক আবার নাটকের কথায়। এটি একটি প্রেমের নাটক, ভালোবাসার নাটক, সম্পর্কের নাটক। কিন্তু সত্যিই কি তাই? নাকি সত্যিটা খুবই আপেক্ষিক? আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, বা আমাদের যেটুকু দেখানো হচ্ছে, তার বাইরেও একটা সত্যি থেকে যায়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আপনাদের দেখতে হবে ‘চিঠির জুবান’।

চিঠির জুবান’ নাটকের সবথেকে শক্তিশালী উপাদান অবশ্যই এর সংলাপ। সংলাপ দর্শকদের ভাবায়, ভাবতে বাধ্য করে। একটি বিশেষ মুহূর্তে এক চরিত্রের মুখ দিয়ে নাটককার বলান – সূর্যগ্রহণ যেমন মানুষের অবস্থানের উপর নির্ভরশীল, সত্যও অনেকটা সেইরকমই, অবস্থানভেদে সত্য বদলে যায়।

আমাদের দেশ কোনটা? এই প্রশ্ন প্রাচীন গ্রিস থেকে আজকের বাংলা পর্যন্ত বারবার কালে কালে ফিরে এসেছে, এখনও আসছে। দেশভাগ হয়ে গেলে কি মানুষও ভাগ হয়ে যায়? নায়ক কি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো? এই নাটকের মধ্যে মিশে আছে থ্রিলার এলিমেন্ট, প্রেমের সন্দেহ, বিশ্বাসঘাতকতা এবং ভয়ঙ্করভাবে রাজনীতি। এই রাজনীতি কি দলীয় রাজনীতি? আন্তর্জাতিক রাজনীতি? নাকি তা কয়েকটি মানুষের ব্যক্তি রাজনীতি? যা ছড়িয়ে পড়ে দল, দর্শন, দেশ, সবকিছুর মধ্যে? নাটকের চারটি চরিত্র – আগুন, সিদ্ধার্থ, রঙিন এবং সোহাগ। আচ্ছা, সোহাগের বিয়ে হয়েছে কার সঙ্গে? সোহাগ কি কাউকে ভালোবাসতো? সে কে? আচ্ছা, সোহাগের চিঠিগুলো কি তার প্রেমিকের কাছেই গিয়ে পৌঁছচ্ছে? নাকি সেগুলো যাচ্ছে অন্য কোথাও, অন্য কারোর হাতে? চিঠিগুলো কি খুব সাধারণ কোনো চিঠি, নাকি তা নিজগুণেই অসাধারণ? অনেক, অনেক প্রশ্ন আছে এই নাটকের মধ্যে, প্ৰিয় পাঠক, আমি সেই উত্তরগুলি বলে দেবো না, উত্তর খুঁজবেন আপনারা নিজেরাই। শুধু এটুকু বলার, এই নাটক বাংলা তথা বাঙালির বুকে হয়ে থাকা এক শাশ্বত দগদগে ঘায়ে আবার খুঁচিয়ে আঘাত করবে।

আগেও বলেছি, নাটকটির নাটককার, নির্দেশক এবং সোহাগ চরিত্রে অভিনয় করেছেন ‘এবং ঈপ্সিতা’। ঈপ্সিতা এর আগে ‘ব্লু গ্লাসেস এভিয়েটর’ এবং ‘সাদা সাদা কালা কালা’ নামে দুটি নাটক নির্মাণ করেছেন। নির্দেশক হিসাবে এটি ওঁর তৃতীয় নাটক। ২০১৭ সালে ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামার উইমেন্স ডিরেক্টরিয়াল প্রজেক্ট-এ নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই নির্দেশক হওয়ার ভাবনা মাথায় আসে ঈপ্সিতার মাথায়। দীর্ঘদিনের চর্চা ও বহু দলে কাজ করার সুবাদে দক্ষ অভিনেতা তো ছিলেনই, এখন তিনি একজন দক্ষ নির্দেশকেও পরিণত হয়েছেন। আগুনের চরিত্রে অর্ঘ্য রায়, রঙিনের চরিত্রে সৌম্যজিৎ অধিকারী এবং সিদ্ধার্থর চরিত্রে সুমন সাহা তিনজনেই দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। 

তবে এই নাটকে কি কোনো অসুবিধা নেই? নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেটি একান্তই আমার মতামত। হাতের লেখা বদল ও বিপরীতের চরিত্রের (তার পেশা আমি এখানের উল্লেখ করছি না, তবে সেই পেশা আরও সচেতনতা দাবি করে) সেটি ধরতে না পারার ব্যাপারটা একটু গোঁজামিল বলে মনে হয়। নাটকের প্রথম কিছুক্ষণ অভিনয়রীতির সঙ্গে কানেক্ট করতে একটু অসুবিধা হয় আমার, ইন্টিমেট স্পেসের জন্য সামান্য চড়া দাগের মনে হয়। পরে অবশ্য শুনেছি এই নাটক প্রসেনিয়াম এবং ইন্টিমেট দুটিতেই অভিনয় হয়। এই অভিনয়টি প্রসেনিয়মের ক্ষেত্রে যথাযথ হলেও ইন্টিমেট স্পেসে তা আর একটু সংযত হতে পারতো বলে আমার মনে হয়। বেশ কিছু সংলাপ রেকর্ডেড আকারে আসে, সেক্ষেত্রে আবহ পরিকল্পনা ও প্রয়োগের প্রতি আর একটু সচেতন হওয়া যেত বলে মনে হয়, (তবে এই সমস্যার আরও একটি কারণ নির্দিষ্ট নাট্যগৃহও হতে পারে কিছু ক্ষেত্রে)। আলোক পরিকল্পনা ভালো, তবে কিছু ক্ষেত্রে সেগুলি বাদ দেওয়া যেত, যেমন একটি বিশেষ সিনে সুটকেস খুলে তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসা আলো অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। এবং দর্শক হিসাবে আমার মনে হয়েছে, এই নাটকটিতে যদি শেষে দশ মিনিট না থাকতো, তাহলে নাটকটি আমার কাছে আরও ‘ইমপ্যাক্টফুল’ হতো। 

সবশেষে যে কথাটি বলার, ‘চিঠির জুবান’ নাটকের সবথেকে শক্তিশালী উপাদান অবশ্যই এর সংলাপ। সংলাপ দর্শকদের ভাবায়, ভাবতে বাধ্য করে। একটি বিশেষ মুহূর্তে এক চরিত্রের মুখ দিয়ে নাটককার বলান – সূর্যগ্রহণ যেমন মানুষের অবস্থানের উপর নির্ভরশীল, সত্যও অনেকটা সেইরকমই, অবস্থানভেদে সত্য বদলে যায়। কেবলমাত্র এই নাটকের জন্য নয়, সর্বকালের মানব ইতিহাসের ক্ষেত্রেই সত্য আপেক্ষিক, এটাই একমাত্র সত্য। সেই আপেক্ষিকতার উপর ভর করেই, প্ৰিয় দর্শক, আপনারাও দেখে ফেলুন এই নাটক। অন্যের মুখে ঝাল খাবেন না। যে সকল দল গ্র্যান্টের টাকা ছাড়া থিয়েটার করার চেষ্টা করছে, তারা এককথায় বলতে গেলে সিসিফাসের মতোই পাথর নিয়ে পাহাড়ে ওঠার সংকল্প করেছে। তাদেরকে থিয়েটার ভালো না লাগলে দেখবেন না, তবে পরখ করে দেখুন সেই থিয়েটার ভালো কিনা। ভালো থাকবেন, আবার খুব তাড়াতাড়ি আপনাদের সঙ্গে গল্প হবে। 

ইতি,
আপনাদের দোস্ত

Developed by DXDasia