অর্পিতা, অবন্তীর ‘মাই নেম ইজ জান’ : গওহর জানের প্রতি যোগ্য ট্রিবিউট

অ্যাঞ্জেলিনা ইয়োওয়ার্ড, মানুষটিকে চেনেন? আচ্ছা বলুন তো, ভারতবর্ষের কোন কণ্ঠশিল্পী প্রথম গ্রামোফোনের জন্য নিজের গান রেকর্ড করেন? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো অনেকেই জানেন, সেই শিল্পী হলেন গওহর জান (Gauhar Jaan)। এখন যদি বলি অ্যাঞ্জেলিনা এবং গওহর দুজন অভিন্ন ব্যক্তি! হ্যাঁ, আমরা কতটুকুই বা জানি মানুষটা সম্পর্কে? আর সেই জানানোর কাজটা করার জন্যই ওঁর জীবনের অনেক জানা-অজানা কাহিনি নিয়ে ভারতীয় থিয়েটার মঞ্চে অভিনীত হচ্ছে নাটক ‘মাই নেম ইজ জান’ (My Name Is Jaan)।

জীবন গল্পের থেকেও অনেক বেশি চমকপ্রদ, মানব সভ্যতার ইতিহাসের প্রমাণ বারবার দিয়েছে, এই তালিকার একটি উজ্জ্বলতম নাম গওহর জান। আর্মেনিয়ান বংশোদ্ভূত মানুষটি অ্যাজমগড় থেকে বেনারস হয়ে কীভাবে এসে পৌঁছালেন কলকাতায়, ভাগ্য বিপর্যয়ে কীভাবে হয়ে উঠলেন ‘তওয়াইফ’, আবার সেখান থেকে কীভাবে হয়ে উঠলেন ভারতীয় সংগীতের নক্ষত্র, এই সম্পূর্ণ জীবনটিই যেন এক নিখুঁত চিত্রনাট্য। আবার গওহর জানের সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে একাকিত্ব এবং আবারও ভাগ্যবিপর্যয়ের কাহিনিটিও ঠিক ততটাই নাটকীয়। যে মানুষটা জুড়িগাড়ি চড়ার জন্য ফাইন দিতেন হাজার-হাজার টাকা, নাজরানায় পাওয়া লক্ষাধিক টাকা বিলিয়ে দিতেন জনসাধারণের মধ্যে, সেই মানুষটারই শেষ জীবন কাটাতে রাজানুগ্রহে প্রাপ্ত সামান্য ভাতায়। কিন্তু হাজার ওঠা পড়ার মধ্যেও একটি বিষয় তাঁর সঙ্গে থেকে গিয়েছিল আজীবন – গান। গওহর জানের সেই গান এবং অবিশ্বাস্য জীবন কাহিনি নিয়ে মঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়। ‘মাই নেম ইজ জান’ নাটকটি অর্পিতার একক অভিনয়ে উপস্থাপিত। নির্দেশনায় অবন্তী চক্রবর্তী, সংগীত পরিকল্পনা জয় সরকারের।

অর্পিতা, এই নাটকে বিভিন্ন ঘরানার, এমনকী বিভিন্ন ভাষার দশটিরও বেশি গান দক্ষতার সঙ্গে গেয়েছেন। অভিনয়, গান এবং নাচের এই মেলবন্ধন সত্যিই বিরল। নাটকের আখ্যানে একেবারে শৈশব থেকে যৌবন হয়ে শিল্পের মধ্যগগনে উত্তরণ এবং সেখান থেকে পতন, গওহর জানের জীবনের এই প্রতিটি পর্যায় সূক্ষ অভিনয়ের মাধ্যমে অর্পিতা যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা প্রশংসনীয়।

এই নাট্য-প্রযোজনাটি বিগত কয়েক বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন অংশে অভিনীত হয়েছে, অভিনীত হয়েছে কলকাতাতেও। সম্প্রতি আবারও এই প্রযোজনা মঞ্চস্থ হল কলকাতায়। অর্পিতা চট্টোপাধ্যায় একজন সুদক্ষ অভিনেতা, বহু বছর ধরে কাজ করছেন চলচ্চিত্রে, একসময়ে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, অভিনেতা ছাড়াও তিনি একজন দক্ষ কণ্ঠশিল্পী, শিখেছেন নাচও। ওঁর এই সবকটি দক্ষতা এসে মিলিত হয়েছে গওহর জানের চরিত্রে। বাংলা নাট্যমঞ্চে এর আগে একাধিকবার গওহর জানের চরিত্র উপস্থিত হয়েছে, অর্পিতা সেই চরিত্রের জুতোয় পা গলিয়েছেন, আবার বেশ কিছু কালজয়ী একক অভিনয় বাংলা (তথা ভারতীয়) থিয়েটারের ইতিহাসে আগেও হয়েছে, এখনও হয়ে চলেছে, দুই ক্ষেত্রেই অর্পিতা সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন, একথা বলাই যায়। আলাদা করে বলতে হয় গানের কথা, অর্পিতা এই নাটকে বিভিন্ন ঘরানার, এমনকী বিভিন্ন ভাষার দশটিরও বেশি গান দক্ষতার সঙ্গে গেয়েছেন। অভিনয়, গান এবং নাচের এই মেলবন্ধন সত্যিই বিরল। নাটকের আখ্যানে একেবারে শৈশব থেকে যৌবন হয়ে শিল্পের মধ্যগগনে উত্তরণ এবং সেখান থেকে পতন, গওহর জানের জীবনের এই প্রতিটি পর্যায় সূক্ষ অভিনয়ের মাধ্যমে অর্পিতা যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা প্রশংসনীয়। মাঝেমাঝে বিভিন্ন মঞ্চ সামগ্রীর ব্যবহার (পান, গড়গড়া, পানপাত্র প্রভৃতি) এবং সেগুলির সঙ্গে অভিনয়ের মেলবন্ধন চরিত্রটিকে পূর্ণতা দেয়।

এই নাটকটি নির্দেশনা করেছেন অবন্তী চক্রবর্তী। থিয়েটারের ক্ষেত্রে অবন্তী চক্রবর্তী একজন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা। তিনি কী পরিমাণ দক্ষ একজন নাট্যশিল্পী, সেটি আর নতুন করে বলে দিতে হয় না, মাই নেম ইজ জান-এর ক্ষেত্রেও ঠিক একইরকম মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন অবন্তী। সাজেস্টিভ সেট, কোনো আলাদা ‘গিমিক’-এর ব্যবহার না করা, পরিমিত আলোর ব্যবহার, সবটা মিলিয়ে প্রযোজনাটি একটি শৌখিন প্রযোজনার রূপ পেয়েছে। জয় সরকার যে সংগীত পরিকল্পনা করেছেন, তাতে লাইভ মিউজিক এবং রেকর্ডেড মিউজিক-এর এক মসৃণ যুগলবন্দি শুনতে পাওয়া যায়। প্রজেকশনের ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়, গওহর জানের জীবনের এক একটি অধ্যায় প্রজেকশনের মাধ্যমে প্রকাশ করার সিদ্ধান্তটি নাটকটিকে অন্য মাত্রা দেয়, এক ভিন্ন ইলিউশন তৈরি করে। নির্দিষ্টভাবে এই প্রযোজনাটি বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের ঘরানায় তৈরি হয়নি, তবে তাতে প্রযোজনার ক্ষেত্রে কোনো খামতি ঘটেছে বলে মনে হয় না। ইতিহাস ভিত্তিক এই প্রযোজনার একটা ব্যাপ্তি আছে। সীমিত সংখ্যক দর্শকের কথা মাথায় রেখে এর নির্মাণ হয়নি। এককথায় এই নাট্য-প্রযোজনাটি একটি উচ্চমানের এককনাট্য হিসেবেই আলোচিত হবে।

গওহর জান সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে বারবার মনে আসে বাংলা শিল্পজগতের আরও এক নিঃসঙ্গ সম্রাজ্ঞী বিনোদিনীর কথা। দুজনের জীবন আপাতভাবে আলাদা আবার কোথাও গিয়ে একও বটে। জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে একজনকে সঙ্গ দিয়েছে অভিনয়, অন্যজনকে গান। তবে আজ ২০২৫-এ দাঁড়িয়ে বিনোদিনীকে নিয়ে যতটা কথা হয়, তাঁকে যতটা স্বীকৃতি দেওয়া হয়, গওহর জানকে ঠিক ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয় কি? যে মানুষটি ১০টি ভাষায় ৬০০-এরও বেশি গান রেকর্ড করেছিলেন, তাঁর আর একটু বেশি স্বীকৃতি বোধহয় প্রাপ্য ছিল। সেই প্রাপ্য স্বীকৃতিই যেন তাঁকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন অর্পিতা, অবন্তীরা; তাঁর প্ৰিয় শহর কলকাতা থেকেই।

______________________

মাই নেম ইজ জান (My Name Is Jaan)/ নির্দেশনা: অবন্তী চক্রবর্তী/ সংগীত: জয় সরকার/ অভিনয়ে: অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়/ প্রযোজনা: স্টুডিও নাইন

Written by