শিকড় না ছেড়ে যারা বাঁচতে চাইলো, তাদের গল্প – ‘নিতান্তই সহজ সরল’

৫২তম ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অফ ইন্ডিয়ায় (গোয়া) ভারতীয় প্যানোরমায় দেখানো হবে ছবিটি

ইসকিরিম…আইসকিরিম…

কাঠের একটা বাক্স, তার ভিতরে প্লাস্টিকের দু-তিনতে লেয়ার। সেই লেয়ারে থাকতো অরেঞ্জ, বেল অথবা নারকেলের আইসক্রিম। মফস্‌সলের অলস দুপুরে হাঁক দিয়ে যেত ভেলো দাদু। শীর্ণ চেহারা নিয়ে নিজের থেকে ওজনে বেশি কাঠের বাক্স কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াতো পাড়ায় পাড়ায়। মাঝে মাঝে মাঠে-ঘাটে-বাড়ির উঠোনে বিশ্রাম। আমরা তখন কচিকাঁচা। ঘুমের ভান করে কান পেতে রাখতাম। ‘আইসকিরিম’ শুনতে পেলেই এক ছুটে ভেলো দাদুর হাতে ধরিয়ে দিতাম ১টাকার কয়েন। ফোকলা হাসি নিয়ে তিনি আমাদের হাতে তুলে দিতেন অরেঞ্জ, বেল বা নারকেলের আইসক্রিম। এছাড়াও কয়েকজন আইসক্রিম বিক্রি করতে আসতেন ঠেলা গাড়িতে। চাঁচা বরফ, রঙিন পেপসি বা কমলা কোনে বরফ আর দুধের অতি সাধারণ আইসক্রিমের স্তূপ। আমাদের কাছে তখন ওসবই ছিল ‘কোয়ালিটি’।  

হঠাৎ এই স্মৃতিচারণের কারণ-

একসময় মানুষের টানে মানুষ চলত, মাটির পথে। ক্রমে মাটি সরে কংক্রিট এল, বড়ো বাড়ি ছোটো ছোটো বাড়িগুলোকে ঢেকে দিল। উঁচু উঁচু পাঁচিল উঠল মনে। লোভ, স্বার্থ, ইটের আড়ালে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল মন। ‘মন! মন আবার কি? টাকা ছাড়া মন মন কি? টাকা ছাড়া আমাদের মন নাই; টাঁকশালে আমাদের মন ভাঙে গড়ে।’ বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্তের উক্তি। ধনতান্ত্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ দান টাঁকশালে এই মন ভাঙে গড়ে। মেট্রোপলিটন মহানগরে আর কোনো টান মানুষকে টানতে পারে না বোধহয়। কিন্তু এরকমও অনেকে থাকে, শিকড় না ছেড়ে যারা বাঁচতে চেয়েছে… বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো কেঁদেছিল যাদের পায়। ‘নিতান্তই সহজ সরল’ বোধহয় তাদেরই গল্প।

সত্রাবিত পালের প্রথম ছবি ‘নিতান্তই সহজ সরল’ এই সময়েরই গল্প। বহমান তিস্তা নদী, বাংলাদেশ বর্ডার, গ্রাম পরিবেশিষ্ট কোচবিহার জেলার ছোট্টো একটা প্রান্তিক শহর, হলদিবাড়ি। সেখানকারই একজন আইসক্রিম বিক্রেতা অরুণ। শহর বা মফস্‌সলে বিক্রি করে না সে। শহরের এত ব্যস্ততা, এত আওয়াজ তার ভালো লাগে না। তাই হলদিবাড়ি সংলগ্ন গ্রামগুলোতে ঘুরে ঘুরেই ও আইসক্রিম বিক্রি করে। খানিকটা উদাসীন ভাবে যেদিন ভালো লাগে সেদিনই আইসক্রিম নিয়ে বেরোয়। অন্যান্য আইসক্রিমওয়ালারা ওকে আওয়াজ দেয় সেকারনে, তাতে ওর হেলদোল নেই। এভাবেই একদিন আইসক্রিম নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে সে একটা নতুন জায়গার সন্ধান পায়, যেখানে ও আগে কখনও যায়নি, সেখানে একটা হাট বসে, মেলা হয়। ও ঠিক করে সেখানে যাবে। এটা তিন দিনের গল্প এবং ওই ক’টা দিন অরুণের জার্নিটা নিয়েই পুরো গল্পটা এগোয়।“কমলেশ রায়, আমি ছাড়া এই গল্পের আর একজন যে লেখক, সেই আমাকে প্রথমে এই কনসেপ্টটা বলে। সেটা ২০১৫-র কথা। তারপর ২০১৭-তে চিত্রনাট্য সাজানো শুরু হয়। আমরা বন্ধুরা মিলেই প্রযোজক খুঁজতে থাকি এবং আমাদের চেয়ে বড়ো কিন্তু বন্ধুস্থানীয় নিমাই শাসমল এই ছবিটা করার জন্য এগিয়ে আসেন। ২০২০-র মার্চে, লকডাউন হওয়ার ঠিক তিনদিন আগে ছবির শুটিং শুরু হওয়ার কথা ছিল। হলদিবাড়িতেই ছবি শুটিং হয়। আমাদের এই ছবিটা পুরোটাই ‘সিঙ্ক সাউন্ড’-এ হয়েছে কোনও ডাবিং হয়নি। সাউন্ড রেকর্ড করেছেন লাল্টু দা (তরুণ মুখার্জি)। এভাবেই একটা দল তৈরি হয়। সাউন্ড ডিজাইন করেছেন রূপকলা কেন্দ্রের ছাত্র ঋদ্ধি মুখার্জি। এই ছবির সিনেমাটোগ্রাফার উত্তরণ দে, সে বোধহয় সবচেয়ে কম বয়সী যার ছবি গোয়ায় আন্তর্জাতিক জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে গেল।” বলছিলেন সত্রাবিত।

এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন অমিত সাহা, বাকিরা সবাই হলদিবাড়ির প্রগতি যুব নাট্য সংস্থার সদস্য। তাঁরাই গান করেছেন, অভিনয় করেছেন। টলিউড ইন্ডাস্ট্রির পরিচিত মুখ হিসেবে তথাকথিত ‘পপুলারিটি’ না থাকলেও তরুণ প্রজন্মের ছবিতে বিশেষত, প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের বেশ কিছু ছবিতে অমিত সাহা-কে শুরু থেকে দেখা গেছে। থিয়েটার এবং এই সময়ের, মূলত ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবির অভিনেতা হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি রয়েছে। এই ছবিতে অমিত সাহা-কে নেওয়ার কোনও বিশেষ কারণ? সত্রাবিতের কথায়, “সেভাবে বলতে গেলে, অমিত সাহার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়, প্রায় দশ বছরের বন্ধুত্ব আমাদের। ও প্রথম থেকেই গল্পটা জানতো এবং নিজেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, অভিনয়ের জন্য কাকে ভাবছি। তখন আমি কাউকেই ভাবিনি এমনকি শুরুতে এটাও ভাবতে পারিনি যে ছবিটা করার জন্য কেউ এগিয়ে আসবে, ছবিটা হবে। ওকে মজা করেই বলতাম, কাউকে না পেলে তুইই করবি। পরবর্তীতে যখন সব ফাইনাল হল, তখন আর কারো কথা না ভেবে অমিতকেই বলি চরিত্রটা করার জন্য। ও আমারও খুব পছন্দের অভিনেতা। আগামীতেও আমি ওকে নিয়ে কাজ করবো।”   

ইফি-তে ছবিটি প্রদর্শিত হবে ২২ তারিখ সকাল দশটায়। ছবিটা আরও কয়েকটা উৎসবে পাঠানো হয়েছে, যদিও সেখান থেকে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া আসেনি। এখানে ডিসেম্বর নাগাদ একটা প্রাইভেট স্ক্রিনিং-এর আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং চলচ্চিত্র উৎসবগুলো ঘুরে আসার পর, সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এখানকার সব দর্শকদের কাছে কিভাবে ছবিটা তুলে ধরা হবে; এমনটাই জানিয়েছেন পরিচালক। সত্রাবিতের এই ছবিটি ছাড়াও ৫২তম ‘ইফি’ বা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অফ ইন্ডিয়ায় (গোয়া) ভারতীয় প্যানোরমায় দেখানো হতে চলেছে ‘মানিকবাবুর মেঘ’। দেখানো হবে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত শেষ ছবি ‘অভিযান’। 

Developed by DXDasia