জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘বিরহী’
“বাসের ভিড়ে চাঁদ ওঠে, চাঁদ ওঠে, চাঁদ ওঠে শুকপাখি…” – যান্ত্রিক সভ্যতার ফাঁদে অধরা একটুকরো প্রকৃতিকে ধরতে চাওয়াই যেন ‘বিরহী’ পথের প্রাণ-সুর। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য নির্মিত প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘বিরহী’ (২০২১) বাংলা ওয়েব সিরিজের দেখাকেই বদলে দেয়। পরিচালকের ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ (২০১৩) এবং ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ (২০১৯) ছবি দুটির নির্মাণ এবং ভাষাও প্রায় একই ধাঁচের। বাংলা ভাষা, লোকসংস্কৃতি, মাটির গান এবং গ্রামবাংলার জীবনের নিখুঁত ছবি একের পর এক এঁকে নিজস্ব দর্শন এবং শিল্পশৈলী নির্মাণে সফল হয়েছেন প্রদীপ্ত।
বাংলা ছবির এক অনন্য স্রষ্টা ঋত্বিক ঘটক-এরর ছবিতেও যেভাবে মিথ এবং পুরাণ থেকে চরিত্ররা উঠে আসতেন আধুনিক জীবনের পটভূমিতে, অনেকটা সেভাবেই ‘রাধা’ ও ‘কৃষ্ণ’-র মতো চরিত্ররা উঠে এসেছেন ‘বিরহী’-র যাত্রাপথে। বাংলার সংস্কৃতি এবং জীবনবোধের একটি বিশেষত্বই হল বাংলার দেবদেবী এবং পুরাণের চরিত্ররা বাঙালির সাধারণ জীবন ভাবনা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এখানে দনুজদলনী দেবী দুর্গাও হয়ে উঠতে পারেন ঘরের মেয়ে উমা। চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলীর অতিপ্রাকৃত চরিত্ররাও যেন সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠেন। মধুর বিরহ-নাট্যের চিরন্তন যুগল ‘রাধা’ ও ‘কৃষ্ণ’-র উপস্থিতিও তাই ‘বিরহী’-তে যোগ করেছে এক বিশুদ্ধ রং।
বিশ্বায়ন এবং বাজার-সভ্যতার জালে আমরা হারিয়ে ফেলছি মৌলিকতা। মুহূর্তে মুহূর্তে বিবর্তিত হচ্ছি আমরা এবং হয়তো সেটিই সময়ের দাবি, তবু কিছু বুনো গন্ধ বোধহয় মাতাল করে দিতে পারে ইঁট-কাঠ-পাথরের জঙ্গলে আটকে পড়া মনগুলিকে। শহুরে দর্শকদের পক্ষে বিরহী গ্রামের অস্তিত্ব কল্পনা হয়তো শুধুই রোম্যান্টিসিজম, কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ার বাইরেও যে কিছু আদিম বিরহী গ্রাম সময়ের বিরহ-যন্ত্রণা ধারণ করে চলেছে তা বলাই বাহুল্য।
গ্রাম-মফস্সলে বেড়ে ওঠা অনেকেই তাই অনায়াসেই আত্মস্থ করে ফেলতে পারেন কৃষ্ণকে। স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ ও বদলি নিয়ে প্রশাসনিক স্তরের প্রশ্ন সমকালকে ছুঁয়ে যায় গভীরভাবে। ‘বিরহী’ তাই যতখানি রোম্যান্টিক, ততটাই রাজনৈতিক। জীবন্ত কিছু গভীর সামাজিক ক্ষত নিয়ে প্রশ্ন করে ‘বিরহী’। স্কুল ছুট ছেলেটি হেডমাস্টারের মুখের ওপর বলে দেয়, তার বাবা বলেছে পড়াশুনো করে কী হবে! সারা দেশজুড়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মাফিয়া রাজ এসব নিয়েই তো ধুঁকে চলেছে দেশের জনগণ। এ-ও তো বিরহ স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের। বিরহী তারাই, যারা স্বপ্ন দ্যাখে। বিরহী তারাই যাদের স্বপ্ন ভাঙে।
‘বিরহী’ আপাতদৃষ্টিতে অতি সহজ সরল একটি কাহিনি ভিত্তিক সিরিজ। কিন্তু হাস্যরস মিশিয়েও কিছু গম্ভীর পদ পরিবেশন করতে সফল হয়েছেন প্রদীপ্ত। কানায় কানায় পূর্ণ জীবনকে ছোঁয়ার স্পর্ধা রাখেন তিনি। তাই তো বাসের ভিড়েও চাঁদ ওঠে। হাঁস, মুরগি, ছাগল, মানুষ এক পংক্তিতেই বাসযাত্রা করে। গ্রামবাংলার খেটে-খাওয়া মানুষের জীবনযাপনের কাছে অত্যাধুনিক সভ্যতা ও পুঁজিবাদের শর্তগুলি কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে; অথবা এ দুইয়েরই সহাবস্থানকে স্বীকৃতি দিতে হয়।
‘বিরহী’ তাই খাঁটি বাংলার। বরাবরই প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ছবিতে বাংলা গানের প্রয়োগ এক অন্য মাত্রা যোগ করে। বাংলার নিজস্ব বাউল, কীর্তন, যাত্রাগান, পালাগান যে মাটির গন্ধকে চারিয়ে তুলতে পারে তা তুলনারহিত। সাত্যকি ব্যনার্জীর কথা ও সুরের অকৃত্রিম যাদু মোচড় দেয় হৃদয়ের গভীরে। ‘বিরহী’ হয়তো অসম্ভব ছিলো ‘শুকপাখি’, ‘যুগল মিলন’, ‘যমুনা’ গানের মায়াময় বিরহ-অনুভূতি ছাড়া। একাধারে বাউল ও কীর্তনের ব্যবহারে মূর্ত হয়ে ওঠে মানব-মানবীর লৌকিক ও প্রাচীন বিরহ-সুখ।
‘বিরহী’র চরিত্র নির্মাণ এবং কাস্টিং যথাযথ। মুগ্ধ করে শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য, সায়ন ঘোষ, দীপক হালদারের অভিনয়। ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-র অভিনেতাদের অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’-তে আশানুরূপ ফল না পেলেও, ‘বিরহী’ কিন্তু আগের চমক ফিরিয়ে আনতে সফল হয়েছে। যদিও সম্পাদনার ক্ষেত্রে ‘সম্পাদক’ প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য তার আগের কাজগুলিকে ছাপিয়ে যেতে পারেননি বলেই মনে হয়। চোখে পড়ার মতো কিছু দুর্বলতা তাল কেটেছে।
সব শেষে বলতেই হয় ‘বিরহী’ যেভাবে শেষ হয়েছে, তা পরবর্তী সিজনের প্রত্যাশা রেখেই গেছে দর্শকের মনে। পরিচালকই ভালো বলতে পারবেন, দ্বিতীয় সিজন আদৌ হবে কীনা! ‘বিরহী’-র ধারা নিরবধি বয়ে চলুক, আর দর্শকও সেই অধরা শুকপাখির বিরহ-যন্ত্রণা নিয়ে হাওয়া গাড়িতে চেপে থাক চাঁদ ওঠার অপেক্ষায়।
ওয়েব সিরিজঃ বিরহী | চিত্রনাট্য-সম্পাদনা-পরিচালনাঃ প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য | সংগীতঃ সাত্যকি ব্যানার্জি | অভিনয়ঃ সায়ন ঘোষ, শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য, শতাক্ষী নন্দী, অমিত সাহা | প্রযোজনা ঋত্বিক চক্রবর্তী, প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য | পরিবেশনাঃ উরিবাবা