সিনেমার ম্যাজিকে পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যই আসলে শ্রীকান্ত

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য পরিচালিত ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ ছবির রিভিউ

এই তুচ্ছ এবং আপাত সহজসাধ্য মনে হওয়া জীবনে অজান্তেই আমরা হারিয়ে ফেলি কত কত সময়। যে সময়ের ধারে একদিন চুপ করে বসে থাকার কথা ছিল। কথা ছিল নিজেই নিজের সঙ্গে আড্ডা দেব, একটি অদৃশ্য হাতে ভারি হয়ে উঠবে কাঁধ। ফিসফিস করে কেউ বলে উঠবে, পালাও শ্রীকান্ত, পালাও। কারণ তোমার কোনো নিশ্চয়তা নেই, তোমার বাড়ির কোনো ছাদ নেই। তোমার জীবন চললান বিস্তৃত এবং আকর্ষণীয়। তোমাকে থেমে থাকলে চলবে না। তোমাদের কোনো স্থির নদীর ঘাট নেই, বহমানতার মধ্যে উৎস খুঁজে চলাই তোমার এক এবং একমাত্র কর্ম। অতএব শ্রীকান্তরা ছুটে ছুটে চলে যায় এই পৃথিবীর মাঠ, ঘাট, নদী, জঙ্গল, সমুদ্র, পাহাড় পেরিয়ে আরও আরও দূর। শ্রীকান্তরা বারবার মরে যায়, বারবার বেঁচে ওঠে। শ্রীকান্ত। হয়তো আমিই। কিংবা আমার প্রিয় বন্ধুটি। কিংবা শ্রীকান্ত আমরা সবাই। 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত পড়ার পর কমবেশি আমরা প্রত্যেকেই শ্রীকান্ত হতে চেয়েছিলাম। এই জীবনের মায়া ত্যাগ করে অন্য আরেকটা জীবনের খোঁজে পথও হেঁটেছিলাম হয়তো। তারপর এই কর্পোরেট দুনিয়ার ছোবলে কারোরই আর শ্রীকান্ত হয়ে ওঠা হয়নি। শ্রীকান্তরা বাস্তবে থেকেও যেন তার চলার সংগ্রাম সময়ের থেকে অনেকখানি এগিয়ে থাকে। বেঁচে থাকার মধ্যে তারা খুঁজে পায় ম্যাজিক। আর আমাদের মতো সাদামাটা মধ্যবিত্ত মানসিকতার মানুষদের জীবনেও ম্যাজিক ছড়াতে ছড়াতে কাঁধে হাত রেখে তারা বলে ওঠে, দৌড়াও বন্ধু, দৌড়াও। থেমে থেকো না। নিজের থেকে হারিয়ে যাবে। 

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের নতুন ছবি ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের প্রথম পর্বকে আশ্রয় করে নির্মিত। অনুপ্রাণিত হলেও এই ছবিটি আদতে পরিচালকের। কারণ এখানে নির্দিষ্ট কোনো টাইম-ফ্রেমে গল্পকে আটকে না রেখে, বিস্তৃতির পথে হেঁটেছেন পরিচালক। পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যই আসলে শ্রীকান্ত। আর তাঁর চলার পথে পা বাড়িয়েছেন ইন্দ্রনাথ, অন্নদাদিদি, রাজলক্ষ্মীরা। একটা গুলিয়ে দেওয়া সময় এবং এই মুহূর্তের অবস্থানকে রীতিমতো অস্থির করে তুলেছেন নিজস্ব মুন্সিয়ানায়। ঠিক যেমনটি আমরা দেখি জাদুবাস্তবতায়।  

প্রত্যেকটি মানুষের জীবন আলাদা আলাদা গতে বাঁধা। সে যেখানে বাস করে বা বেড়ে ওঠে, সেই অঞ্চলের বা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। সেই মানুষটি যে দেশে বাস করেন, সেখানে যদি প্রতিকূল পরিস্থিতি বিরাজ করে, তাহলে সেই পরিবেশের সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। জাদুবাস্তবতার নায়ক তাঁর নিজস্ব জীবনবোধ এবং দৃষ্টিকোণের মাধ্যমে দেশ-কাল-মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। হয়তো সেই নির্দিষ্ট সময়ে তাঁকে ছোঁয়া যায় না, কিন্তু একদিন সে-ই হয়ে ওঠে মানুষের আত্মা। মানুষকে অস্থির করে তোলে। প্রেম আসে তার নিজস্ব স্বভাবে। প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ দুই সময়ে এবং দুই মেজাজে একটা কেন্দ্রে এসে উপনীত হয়। এই ছবিতে শ্রীকান্ত আর রাজলক্ষ্মীর ভাষা, ভঙ্গী, অভ্যাস, প্রেম একরকম। ঠিক তার পাশাপাশি ইন্দ্রনাথ আর অন্নদাদিদির ভাষা, ভঙ্গী, অভ্যাস, প্রেম অন্যরকম। এই দুটো সময় দুইরকম হলেও তারা চরম অস্থিরতার স্বীকার। তারা প্রত্যেকেই নিজের জীবনবোধের কাছে আদর্শ ‘হিরো’। এই ছবি কী বলতে চেয়েছে বা ক্লাইম্যাক্স কী তা বলার উদ্দেশে এই লেখা নয়। সে সবকিছু দেখার দায়িত্ব আপনাদের। কিন্তু যে কথাগুলো না বললেই নয় তা হল, প্রেমের পরিণতি আসলে কোথায়? ছবিতে পরিচালক যেভাবে প্লট বুনেছেন তার বাইরেও আলাদা একটা প্লট আছে আমার আপনার মধ্যে। আমাদের সেই সমস্ত গল্পগুলি সযত্নে সাজাতে পারবেন এই ছবির সঙ্গে। এখানেই পরিচালক জিতে গেলেন। প্রেম যতটা আরামের ততটাই অস্থিরতার, যতটা মালাবদলের ততটাই রক্তাক্তের। ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ছবিতে গ্রামবাংলার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা প্রেমের কথা বলেছিলেন প্রদীপ্ত। যে প্রেম বয়সের কাছে হার মেনে যায়। সেই মোহিনী গ্রামকে আমরা যে যার নিজের মতো আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম। আমরাও চেয়েছিলাম মোহিনীতে ঢুঁ মারলে কেমন হয়! ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’তে যে গ্রামবাংলার দৃশ্য পরিচালক দেখিয়েছেন তার ফ্রেমজুড়ে রয়েছে আরেকটি গ্রাম- নিশ্চিন্দিপুর। বিভূতিভূষণের উপন্যাসে সেই ছেলেবেলার গ্রামকে চোখে দেখার অভিজ্ঞতা ভিতর ভিতর ঋদ্ধ করে। 

সাত্যকি ব্যানার্জির আবহসংগীত, জয়তু মণ্ডলের শিল্প নির্দেশনা, শুভদীপ দে’র চিত্রগ্রহণ, তিমির বিশ্বাস, কানাইদাস বাউলের কণ্ঠ আপনাকে পাগল করবেই। চরিত্রের অস্থিরতার সঙ্গে দৃশ্যত মানিয়ে যায় পুরুলিয়া, মৌসুনি দ্বীপ এবং কলকাতার ফ্রেমগুলি। চরিত্রের সঙ্গে মানানসই এবং শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার সায়ন ঘোষ (ইন্দ্রনাথ) এবং অপরাজিতা ঘোষ দাস (অন্নদাদিদি)। শারীরিক অভিনয় এবং দৃপ্ত দৃষ্টিতে যিনি সত্যিই শ্রীকান্ত হয়ে উঠলেন, সেই ঋত্বিক চক্রবর্তীকে আরেকবার স্যালুট। অন্যান্যদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাজলক্ষ্মীরূপী জ্যোতিকা জ্যোতি। আর অবশ্যই চিত্রনাট্য, সম্পাদনা ও পরিচালনায় যিনি ম্যান অফ দ্য ম্যাচ, তিনি জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। ক্যামেরায় যেভাবে এক্সট্রিম ক্লোজ-আপ এবং লংশটের ব্যবহার যেভাবে নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে, তা আজকালকার বাংলা ছবিতে প্রায় দুর্লভ।

এই ছবি কীভাবে মুক্তি পেল, সেইসব ঝড়ের কথা প্রায় সকলেই জানি। ভাগ্যিস সিনেমাহলের মালিকরা বুঝলেন, নাহলে বাংলা ছবির দর্শকদের বড্ড ক্ষতি হয়ে যেত। শুধুমাত্র গল্প বলা নয়, যাঁরা আজও সিনেমায় ম্যাজিক দেখতে চান, এই ছবি তাঁদের জন্যই। সেকাল এবং একালের শ্রীকান্তকে নতুনভাবে চেনানোর জন্য প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যকে ধন্যবাদ। চলচ্চিত্রের জাদুবাস্তবতায় শ্রীকান্ত আসলে তিনিই। আশা, শ্রীকান্তরা বারবার ফিরবে, কারণ তারা থেমে থাকতে জানে না। অস্থিরতাই তাদের নিজস্ব ধর্ম।

Developed by DXDasia