চন্দননগর – শহর গড়ে ওঠার কাহিনি, পর্ব ১
একদা ফরাসি উপনিবেশ আমাদের চন্দননগর শহরটির প্রাচীনত্ব খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে বিপ্রদাস পিপলাই রচিত “মনসামঙ্গল” বা দাশরথী রায়ের পাঁচালি বা অন্যান্য প্রাচীন কাব্যগ্রন্থে। এছাড়াও পরবর্তীতে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ফিলিপ ডেভিস সপ্তগ্রাম বন্দর পতনের পরবর্তী সময়ে হুগলি নদী সম্পর্কে লিখতে গিয়ে এই শহরের নাম উল্লেখ করেন। এই শহরের নামকরণ নিয়েও রয়েছে অনেক যুক্তি-তর্ক ও মতবিরোধ।
একটি ওয়েব-প্ল্যাটফর্মে ১৩ই এপ্রিল, ২০২০ তারিখে প্রকাশিত “হুগলি নদীর বাঁকে মিনি ইউরোপ” শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, একদা ভারতের ও বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা শহর তথা বন্দর প্রতিষ্ঠার বেশ কয়েক দশক আগে গড়ে উঠেছিল বর্তমান ত্রিবেণীর কাছে সরস্বতী নদীর বুকে ‘সপ্তগ্রাম’ নামক একটি বন্দর যা তৎকালীন যুগে বাংলার বাণিজ্যের মূল যোগসূত্র ছিল বহির্বিশ্বের সঙ্গে। এই সরস্বতী নদী তৎকালীন সময়ে হুগলি নদীর চেয়ে ছিল বেশি স্রোতস্বিনী ও প্রাণচঞ্চল। এই নদীর পূর্বে অবস্থিত হুগলি নদী ছিল ক্ষীণকায়া, পলি জমা এক প্রণালির মতো। এই নদীর তীরে তখন কিছু বিক্ষিপ্ত জনবসতি থাকলেও তাঁরা মূলত কৃষি নির্ভর ছিলেন।
কিন্তু “হুগলি নদীর বাঁকে মিনি ইউরোপ” থেকে আরও জানা যায় যে, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের লেখা “সপ্তগ্রাম অর সাতগাঁও” (এটি ১৯০৯ সালে “জার্নাল অফ দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়) প্রবন্ধে উল্লেখিত হয়েছে ১৫০৫ সালে এক প্রবল ভূমিকম্পের ফলে ভূমির ঢালের পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে সরস্বতী নদীর নাব্যতা হটাৎ কমে গিয়ে পলি জমতে শুরু করে। ফলে, সপ্তগ্রাম বন্দর তার গুরুত্ব হারাতে থাকে উল্টোদিকে, হুগলি নদীর নাব্যতা বেড়ে গিয়ে এই নদী হয়ে ওঠে স্রোতস্বিনী। এর বিভিন্ন তীরে গড়ে উঠতে থাকে ছোটো-বড়ো কিছু বন্দর। এই ঘটনাটিকে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় “রিভার সোয়াপিং” বলে উল্লেখ করেন, যা বিশ্বে একটি বিরলতম ঘটনা। এরপরই পূর্বের হুগলি নদীর তীরবর্তী স্থান ও সেখানকার ছোটো ছোটো জনবসতিগুলি ধীরে ধীরে প্রথমে পল্লি বা পাড়া তারপর গ্রাম ও তারপর শহরের রূপ নেয়। তাদের মধ্যে মূলত বোড়, খলিসানি ও গোন্দলপাড়া এই তিনটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম নিয়ে ও বোড়াইচণ্ডী মন্দিরকে (চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে বর্ণিত) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আমাদের প্রিয় শহর ‘চন্দননগর’ হলো অন্যতম।

রিভার সোয়াপিংয়ের ফলে হুগলি নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পায় ফলস্বরূপ এই অঞ্চলে বিভিন্ন ইউরোপীয় শক্তির আনাগোনা বেড়ে যায়। সর্বপ্রথম হুগলি অঞ্চলের তাদের ঘাঁটি প্রস্তুত করে পর্তুগীজরা, তৎকালীন সময়ে তারা ছিল প্রভূত শক্তিশালী। ১৬৩২ সালে মোঘলদের সঙ্গে যুদ্ধে পর্তুগীজরা সম্পূর্ণ পরাস্ত হয় ও মোঘলরা এই অঞ্চলটির দখল নেয়। শহরের বিশেষ কিছু স্থানে গড়ে ওঠে তাদের পল্লি। এর মধ্যে উল্লেখ্য- বর্তমানের তিলিঘাট সন্নিকটবর্তী অঞ্চল (অঞ্চলটি সুতা প্রস্তুত ও বাণিজ্যে খ্যাত ছিল, এখানে তারা একটি মাজারও প্রস্তুত করে বলে জানা যায়), খলিসানির বিলকুলি (তৎকালীন আঞ্চলিক মোঘল নবাব দয়াবীজ খাঁ ও তাঁর বেগমের কবরখানা ও মসজিদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যা এখনও বর্তমান), গড়বাটি প্রভৃতি।
এর সমসাময়িক সময়ে বা কিছু বছর পর গোন্দলপাড়া স্থিত একটি অংশে (বর্তমানের দিনেমারডাঙ্গা) দিনেমার বা ড্যানিসরা তাদের উপনিবেশ স্থাপন করে ও বসতি গড়ে তোলে। তারা সেখানে মূলত কৃষিকাজ ও কৃষিজাতদ্রব্যের ব্যবসা করত, এছাড়াও তারা ছোট-বড় কিছু কাঁচা-পাকা বসতবাড়ি, নদীর ঘাট প্রস্তুত করে। দীর্ঘ ৪০ বছর পর ১৬৭৩ সালে মোঘল নবাব শায়েস্তা খাঁয়ের কাছ থেকে ডুপ্লেসি নামক এক ফরাসি নাবিক তৎকালীন বোড় কিষাণপুরে ৪০১ টাকায় ২০ অরপাঁ (৬০ বিঘা) জমি কিনে নেয় ব্যবসা জন্য। ব্যবসায় মুনাফা না করতে পেরে তিনি ফিরে যান।
১৬৮৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশরা হুগলির মোঘল ফৌজদারকে পরাস্ত করে নতুন চুক্তির মাধ্যমে এলাকার দখল নেয়। গবেষকরা মনে করেন উক্ত সময়ে বেশকিছু গ্রাম বা পল্লির খোঁজ পাওয়া যায় সেগুলি হল – দেবীপুর, প্রসাদপুর, মহেশপুর, সাবিনাড়া (পূর্ববর্তী নাম সাফ-ই-নারা), দুর্গাপুর প্রভৃতি। ব্রিটিশদের মোকাবিলা ও নিজেদের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে ১৬৮৮ সালে মোঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব দেলতর নামক এক ফরাসি নাবিককে ৪০হাজার টাকায় ৯৪২একর জমিতে ব্যবসা ও কুঠি স্থাপনের অনুমতি দেন। পরবর্তীতে ১৬৯৩ সালে ফরাসি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সম্রাটের থেকে অবাধে বাণিজ্য ও কুঠি স্থাপনের অধিকার পায়। তখন থেকেই গড়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন পল্লি ও একটি ছোটো বন্দরও (মূলত কৃষিজাত দ্রব্য, সুতা, বস্ত্র, নীল ও অন্যান্য সামগ্রী আমদানি-রপ্তানি করার জন্য, এছাড়াও শোনা যায় চন্দন কাঠের ব্যবসাও নাকি হতো এখান থেকে) গড়ে তোলা হয়। এরপর ১৬৯৬ সালে ফরাসিরা মূলত নিজেদের ও নগরের সুরক্ষার কথা ভেবে গড়ে তোলে ‘ফোর্ট দ্য অর্লেয়া’ নামক একটি দুর্গ। এর ফলস্বরূপ এখানকার তথা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের মনে পরোক্ষে হলেও নিরাপত্তাজনিত নিশ্চিয়তা বাড়ে। ঠিক এই সমসাময়িক (১৬৯৫ ও তার পরবর্তী সময়ে) সময়ে তৎকালীন মেদিনীপুরের চেতুয়াবরদার (বর্তমানে ঘাটাল) বিদ্রোহী শাষক শোভা সিংহ বর্ধমান দখল করে।
(শেষ পর্ব প্রকাশিত হবে আগামী মঙ্গলবার)
তথ্যসূত্র :
সংক্ষিপ্ত চন্দননগর পরিচয় – হরিহর শেঠ।
আমার শহর চন্দননগর – বইমেলা, ২০১২ সংস্কলন।
চন্দননগরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – অধ্যাপক বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
চন্দননগরের সেকাল ও একাল – শুভ্রাংশু কুমার রায় ।
banglalive.com ওয়েবপেজ ১৩ই এপ্রিল, ২০২০ তারিখে প্রকাশিত "হুগলি নদীর বাঁকে মিনি ইউরোপ" শীর্ষক প্রতিবেদন।