ইতিহাস যেখানে কথা বলে
লাল মাটির জেলা বীরভূম। পর্যটকদের খুব প্রিয় গন্তব্য। এখানেই রয়েছে শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের বিশ্বভারতী। বক্রেশ্বর, তারাপীঠ, মামা ভাগ্নে পাহাড়, দাতা মেহেবুব শাহ ওয়ালির দরগা – সব মিলিয়ে দেখার জায়গা অনেক। সেই তুলনায় অনেকটাই কম পরিচিত হেতমপুর। তবে সিউড়ি সদর মহকুমার এই গ্রামের ঐতিহ্য তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো।
দেওয়ানজি মন্দির
কলকাতা থেকে হেতমপুরের দূরত্ব মোটামুটি ২০০ কিলোমিটার। সড়কপথে গেলে ইলামবাজারের জঙ্গল পেরোতে হবে। দুবরাজপুরের কাছেই হেতমপুর। খুব পুরোনো এক জমিদারবাড়ি রয়েছে এখানে। জায়গাটার আদি নাম ‘রাঘবপুর’। জমিদার রাঘব রায়ের নামে এমন পরিচিতি। রাজনগরের রাজার অধীনের এক জমিদার প্রভুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেন। দমন করতে সেনাপতি হাতেম খানকে পাঠান রাজা। হাতেম খান বিজয়ী হলে তাঁর নামে এলাকার নামকরণ হয় ‘হাতেমপুর’। যা কালক্রমে ‘হেতমপুর’ হয়ে ওঠে।
রাজবাড়ি
১৭৫৫ সালে হাতেম খান মারা যান। হেতমপুরের শাসক হলেন চৈতন্যচরণ চক্রবর্তী। ধীরে ধীরে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছতে থাকে গোটা অঞ্চল। তাঁর বংশধর রাধানাথকে ব্রিটিশ সরকার ‘মহারাজা’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯০৫ সালে রাজা রামরঞ্জন চক্রবর্তী তৈরি করান এক বিশাল প্রাসাদ। তার ৯৯৯টি দরজা। মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারি প্রাসাদের সম্মান যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, সেই কথা ভেবে হাজারদুয়ারির থেকে একটা দরজা কম রাখা হয়েছিল এই প্রাসাদে। তবে স্থানীয় লোকজন এটিকে ‘হেতমপুরের হাজারদুয়ারি’ নামে ডেকে থাকেন।
বাড়িটি ইউরোপীয় রীতি অনুসরণ করে বানানো। ভিক্টোরীয় এবং গথিক স্থাপত্যের মিশ্রণ। রাজপরিবারের প্রতীক বসানো রয়েছে বাড়িতে –হরিণ, একশৃঙ্গ ঘোড়া এবং ফাঁকা এক বৃত্ত। দোতলায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিষ্ণুপুরাণ এবং রামায়ণের নানা দৃশ্য। রামরঞ্জনের ছেলে কমলা নিরঞ্জন ছিলেন শিল্পকলার সমঝদার। রাজবাড়ির রথটিও দেখার মতো। ইংল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিল পিতলের এই রথ।
চন্দ্রনাথ শিব মন্দির
সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ছবিতে গুপিকে তার গ্রাম থেকে যে রাজা গাধার পিঠে করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তার রাজবাড়ির সেট ছিল হেতমপুর প্রাসাদে। আরও অনেক বিখ্যাত ছবির শুটিং এখানে হয়েছে। সত্যজিতেরই ‘অভিযান’, মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’, তরুণ মজুমদারের ‘গণদেবতা’, সন্দীপ রায়ের ‘গোঁসাইপুর সরগরম’, রাজা সেনের ‘দামু’-র কথা তো বলতেই হয়।
আরও পড়ুন: শঙ্করপুর – নিরিবিলি সৈকত
১৮৪৭ সালে গড়ে উঠেছিল চন্দ্রনাথ শিব মন্দির। ব্রিটিশ রীতির এক স্থাপত্য। আটচালা মন্দিরে সামনের দিকে টেরাকোটার ফলকে দুর্গা, লক্ষ্মী, কৃষ্ণ এবং পুরাণের বেশ কিছু নকশা আছে। অন্য দিকের ফলকে খোদাই করা রানি ভিক্টোরিয়া, ব্রিটিশ নরনারী, তাদের পোশাক-অস্ত্রশস্ত্র, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন। রেখ দেউল রীতির দেওয়ানজি শিব মন্দিরও দেখতে পারেন। টেরাকোটার কাজ মুগ্ধ করে পর্যটকদের।
তাহলে সময় করে অবশ্যই ঘুরে আসুন হেতমপুর।
রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি
কীভাবে যাবেন
রেলপথে যেতে চাইলে হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে দুবরাজপুর স্টেশনে নামতে হবে। তবে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে সড়কপথে যাওয়াই ভালো। রাস্তার অবস্থা খুব সুন্দর, দু’দিকে মনোরম দৃশ্য। কলকাতা থেকে হেতমপুরের দূরত্ব ২০০ কিলোমিটারের মতো।
শান্তবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি
কোথায় থাকবেন
শান্তিনিকেতনে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে পর্যটন উন্নয়ন নিগমের শান্তবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি এবং রাঙাবিতান ট্যুরিজম প্রপার্টি। হেতমপুর থেকে এক ঘণ্টার রাস্তা।
বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন –
West Bengal Tourism Development Corporation Ltd
DG Block, Sector-II, Salt Lake
Kolkata 700091
Phone: (033) 2358 5189, Fax: 2359 8292
Website: https://www.wbtdcl.com/
Email: visitwestbengal@yahoo.co.in, mdwbtdc@gmail.com,
dgmrwbtdc@gmail.com
