নবাবি ইতিহাস কথা বলে হাজারদুয়ারি প্রাসাদে

হাজারদুয়ারি প্রাসাদ যেন গোলকধাঁধা

বাংলার নবাবদের রাজধানী মুর্শিদাবাদ। মুঘলদের অধীনে যখন সুবাহ বাংলার রাজধানী ছিল ঢাকা, ওই রকম সময়ে সম্রাট ঔরঙ্গজেব মুর্শিদকুলি খাঁকে বাংলার দেওয়ানের পদে নিযুক্ত করেছিলেন। তখন অবশ্য মুর্শিদকুলির নাম ছিল করতলব খাঁ। করতলবের সততা এবং দক্ষতা সম্রাটকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি করতলব খাঁকে ভাগীরথী গঙ্গার তীরে মকসুদাবাদে রাজধানী সরানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁকে ‘মুর্শিদকুলি খাঁ’ উপাধি প্রধান করেছিলেন সম্রাট ঔরঙ্গজেব, মকসুদাবাদের নাম পাল্টে মুর্শিদাবাদ করার অনুমতিও দেন তার সঙ্গে। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর বেশ কিছু বছর পর ১৭১৭ সালে মুর্শিদকুলি খাঁ ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী সরিয়ে আনেন। ততদিনে তিনি বাংলার সুবাহদার। দিল্লির রাজশক্তি তখন ক্রমশ ক্ষয় পাচ্ছে, সেই সুযোগে প্রায় স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করতেন। হয়ে ওঠেন বাংলার প্রথম নবাব।

নবাব নাজিম হুমায়ুন জা তৈরি করিয়েছিলেন হাজারদুয়ারি

তারপর ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। বাংলার মসনদে বসেছেন সুজাউদ্দিন, সরফরাজ খাঁ, আলিবর্দি খাঁ, সিরাজ-উদ-দৌলা। সিরাজকে পরাজিত করে ১৭৫৭ সালে বাংলার দখল নিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। মিরজাফরকে নবাব বানাল তারা। তারপর মিরকাশিম নবাব হলেন, তারপর আবার মিরজাফর। ততদিনে বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা পুরোপুরি ব্রিটিশদের দখলে। একের পর এক পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে মুর্শিদাবাদ। সেই জীবন্ত সাক্ষীকে চাক্ষুস দেখতে পর্যটকরা মুর্শিদাবাদে ভিড় জমান। 

আলোয় ঝলমল হাজারদুয়ারি 

মুর্শিদাবাদে দর্শনীয় স্থানগুলির তালিকায় মধ্যে পর্যটকরা সবার আগে রাখেন হাজারদুয়ারি প্রাসাদকে। এই দুর্গপ্রাসাদ যেখানে অবস্থিত, সেই পুরো চত্বরটাকে বলে নিজামত কিলা বা কিলা নিজামত। হাজারদুয়ারি ছাড়াও ইমামবাড়া, ঘড়ি ঘর, মদিনা মসজিদ, চক মসজিদের মতো বেশ কিছু স্থাপত্য রয়েছে কিলা নিজামত এলাকায়। অনেকে মনে করেন, হাজারদুয়ারি প্রাসাদ নির্মাণ করিয়েছিলেন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা। কিন্তু এটি একেবারেই ভুল ধারণা। সিরাজের প্রাসাদ ছিল হিরাঝিল। এখন তা ভাগীরথীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

এই প্রাসাদের স্থাপত্যশৈলী ইউরোপীয় ঘরানার

নবাব নাজিম হুমায়ুন জা তৈরি করিয়েছিলেন হাজারদুয়ারি। ১৮২৯ সালে তিনি এই প্রাসাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। গোটা স্থাপত্যের রূপকার ছিলেন ডানকান ম্যাকলিওড। দেখলেই বোঝা যায়, এই প্রাসাদের স্থাপত্যশৈলী ইউরোপীয় ঘরানার, বিশেষ করে ইতালীয় রীতির সৌধগুলোর সঙ্গে মিল প্রচুর। ১৮৩৭ সালে মুর্শিদাবাদের প্রধান আকর্ষণ হাজারদুয়ারির নির্মাণকার্য শেষ হয়। 

৪১ একর জায়গা নিয়ে এই প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে। ১ হাজারটা দরজা আছে বলে এর নাম হাজারদুয়ারি। অবশ্য দরজাগুলির মধ্যে ১০০টাই নকল। তবে চট করে দেখে নকল দরজাগুলোকে চিহ্নিত করা বেশ মুশকিল। দেওয়ালের মধ্যে এমনভাবে ডিজাইন করা, বাইরে থেকে দেখলে হুবহু আসল দরজা মনে হবে। দুর্গপ্রাসাদে যদি হঠাৎ করে শত্রুরা আক্রমণ করে বসে, তাদের বিভ্রান্ত করার জন্যই নকল দরজাগুলো বানানো হয়েছিল। সাধারণভাবে প্রাসাদটি হাজারদুয়ারি নামে প্রচলিত হলেও, হুমায়ুন জা একে ‘বড়ো কুঠি’ নামেই ডাকতেন।

প্রাসাদের রূপকার ছিলেন ডানকান ম্যাকলিওড 

এখন ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের তত্ত্বাবধানে প্রাসাদটির মধ্যে জাদুঘর গড়ে উঠেছে। বাংলার নবাব, অভিজাত এবং ব্রিটিশদের ব্যবহৃত ও শৌখিন নানা জিনিস স্থান পেয়েছে এখানে। রয়েছে তখনকার আসবাব, বাসনপত্র, বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা ছবি, নবাবি আমলের বই, পুঁথিপত্র। যেমন আইন-ই-আকবরির পাণ্ডুলিপি এবং সোনা দিয়ে মোড়া কোরান শরিফ। ২ হাজারেরও বেশি অস্ত্রের সম্ভার আছে। তার মধ্যে পলাশীর যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র যেমন দেখা যায়, তেমনই দর্শকদের জন্য রাখা হয়েছে সেই ছুরি, যা দিয়ে মহম্মদি বেগ সিরাজকে হত্যা করেছিলেন। আলিবর্দি খাঁ এবং সিরাজ-উদ-দৌলার তলোয়ারও সেখানে দেখতে পাবেন। আরো যে কত কিছু রয়েছে, বলে শেষ করা যাবে না। গোটা জাদুঘরটি ঘুরে দেখতে বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় লাগবে। শুক্রবার বাদে প্রতিদিনই সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য জাদুঘর খোলা থাকে। 

হাজারদুয়ারির অবস্থান 

কোথায় কোথায় যাবেন
হাজারদুয়ারির ঠিক বিপরীতে রয়েছে নিজামত ইমামবাড়া। মহরমের দিন এটি সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। বাকি দিনগুলি এই স্থাপত্য কেবল বাইরে থেকেই দেখতে পাবেন। হাজারদুয়ারির প্রাঙ্গণেই আছে বিখ্যাত ঘড়ি মিনার। প্রাসাদের সামনেই দেখতে পাবেন বাচ্চাওয়ালি তোপ। কাছাকাছি অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলি হল খোশবাগ, মোতিঝিল, কাটরা মসজিদ, নসিপুর প্রাসাদ, কাঠগোলা বাগানবাড়ি, কাশিমবাজার রাজবাড়ি ইত্যাদি।
কীভাবে যাবেন
ট্রেনে যেতে চাইলে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে লালগোলা প্যাসেঞ্জার কিংবা ভাগীরথী এক্সপ্রেস অথবা কলকাতা স্টেশন থেকে হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেস ধরুন। নামবেন মুর্শিদাবাদ স্টেশনে। এছাড়া এসপ্ল্যানেড থেকে মুর্শিদাবাদ যাওয়ার বাস পাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন
বহরমপুরে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের বহর ট্যুরিজম প্রপার্টি। সেখানে থেকেই মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখতে পারেন। বহরমপুর থেকে মুর্শিদাবাদের দূরত্ব ১১ কিলোমিটারের মতো। বিস্তারিত জানতে ফোন করুন ৯৭৩২৫১০০৩১ নম্বরে। এছাড়া মুর্শিদাবাদ শহরেও বেশ কিছু হোটেল এবং রিসর্ট আছে।

 

বহর ট্যুরিজম প্রপার্টির অবস্থান

Developed by DXDasia