হাতে আঁকা বিয়ের কার্ড পৌঁছে যাচ্ছে নিমন্ত্রিতদের ঘরে ঘরে, নেপথ্যে বিরাটির চন্দ্রিমা বিশ্বাস

২৯ বছর বয়সী চন্দ্রিমা বিশ্বাস হাতের কাজ দিয়েই মন ছুঁয়েছেন মানুষের

“প্রথা মেনে আঁকা শিখিনি কোনোদিনই, তবুও আঁকার প্রতি অদ্ভুত একটা টান অনুভব করতাম ছোটো থেকে। – এমনটাই বললেন বিরাটির চন্দ্রিমা বিশ্বাস। কিন্তু কে এই চন্দ্রিমা? তাঁর আঁকার বিশেষত্বই বা কী?

চন্দ্রিমার আঁকা বিয়ের নিমন্ত্রন পত্র

ফেসবুকের একটি গ্রুপ, ‘আঁকিয়েদের আড্ডা’। একদল অঙ্কন প্রেমী মানুষের সহাবস্থান সেখানে। চন্দ্রিমাও ছিলেন তাঁদেরই একজন। নিজের স্বল্প পরিসরটুকুকে নিত্যনতুন ভাবনায় সাজিয়ে তুলে পোস্ট করতেন চন্দ্রিমা। এরকমই একটি পোস্টে চোখ আটকে যায় একদিন। যার বিষয় ছিল, "হাতে আঁকা বিয়ের কার্ড বানাতে চাইলে অবশ্যই যোগাযোগ করুন।” দেখেই খানিক অবাক হতে হয়। এতদিন বিয়ের কার্ড বলতে আমরা জানতাম পরিচিত কিছু রঙিন মোড়কে বাহারি কার্ড। মেশিনে ডিজাইন করা। কিন্তু হাতে এঁকে বিয়ের কার্ডের ভাবনা, এ নেহাৎই অভিনব। যোগাযোগের সূত্র ধরে তাই কথা বললাম চন্দ্রিমার সঙ্গে।

বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে এমএসসি শেষ করে তারপর বিএড। পড়িয়েছেন দুটি স্কুলেও। কিন্তু এসবে ঠিক মন বসছিল না চন্দ্রিমার। আঁকার নেশাটা তাঁকে তাড়া করে বেরিয়েছিল সবসময়ই। তাই নিত্যনতুন ভাবনাকে সঙ্গী করে আঁকতে শুরু করেন চন্দ্রিমা। চন্দ্রিমার বলেন, “আমি সাধারণত মাইথলজিক্যাল আঁকাগুলোকে একটু অন্যরকম রুপ দিয়ে আঁকতে চেষ্টা করতাম।” মান্ধাতা আমলের যুবক কিংবা জীবনাশ্ব, একের পর এক পুরাণভিত্তিক ছবি আঁকতে শুরু করেন চন্দ্রিমা। মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, ভ্যানগঘ, পল গগা, রঁদ্যা এঁদের দেখেই আঁকার হাতে খড়ি চন্দ্রিমার। ভালোবাসার কথা উঠতেই চন্দ্রিমা জানান, “সুররিয়ালিটি আমার ভালোলাগার বিষয়।” 

ইনিই সেই  মান্ধাতা 

এরপর ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ে যায় একদিন। তাঁর কাজ নজরে পড়ে এক বুটিক মালিকের। শুরু হয়ে যায় চন্দ্রিমার কাজের পথ চলা। শাড়ির সঙ্গে মানানসই কার্ড আঁকতে শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে আরও অভিনব কাজের কথা ভাবতে থাকেন চন্দ্রিমা। কখনও গয়না, কখনও মাথার সাজ আবার কখনও কাঠের চিরুনির ওপর রং তুলির অসাধারণ সাজ, একের পর এক কাজ শুরু করেন তিনি। চন্দ্রিমাকে আরও খানিক জানতে গিয়ে চোখে পড়ে, হাতের গুণে স্বয়ং বিশ্বকর্মা তিনি। কার্ড, গয়না, শোপিস, বাহারি সাজ এসব তো আছেই, তার সঙ্গে গড়েছেন সরস্বতীর মূর্তিও। 

পোশাকের সঙ্গে মানানসই কার্ড কিংবা রাখি, ভাইফোঁটা, পুজো ইত্যাদি উৎসবের কার্ড বানাতেন আগেই। “সবরকম অনুষ্ঠানের কার্ড যদি হাতে আঁকা যায়, তবে বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র কেন নয়?” এই প্রশ্নটাই তারপর তাড়া করে চন্দ্রিমাকে। ব্যাস, যেমন ভাবনা তেমন কাজ। 

রং তুলির ছোঁয়ায় সাজিয়েছেন চিরুনিকে 

শীতকাল মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে বিয়ের মরশুম। আর বিয়ের অনুষ্ঠানে একটা বড়ো জায়গা জুড়ে থাকে বিয়ের কার্ড। মন্দিরে বিগ্রহের সামনে কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রণ করেই শুরু হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিক তোড়জোড়। সেই কার্ডের প্রচলিত ধারণাকে খানিক ভাঙতে চেয়েছেন চন্দ্রিমা। মেশিনের কারুকাজ নয়, নিজের হাতে সাজিয়ে তুলতে চেয়েছেন নতুন সম্পর্কের সূচনাকে। বর-বউ, ছাদনাতলা, কলাতলা কিংবা বিয়ের পিঁড়ি এসবকেই রং তুলির টানে ফুটিয়ে তুলেছেন কার্ডে।

চন্দ্রিমা বিশ্বাস 

অনিশ্চয়তার সময়ে দাঁড়িয়েও ছক ভাঙতে চেয়েছেন চন্দ্রিমা। পড়াশোনার পাশাপাশি হাতের কাজ দিয়েই স্বপ্ন আঁকছেন প্রতিদিন, রং ভরে দিচ্ছেন তাতে। কথায় বলে, মানুষের হাতের ছোঁয়ায় ভালোবাসা মিশে থাকে। মেশিনের কার্ডে তো কেবল জাঁকজমক। কম সময়ে হয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু হাতে আঁকার আন্তরিকতা তাতে থাকে কি?

তৈরি করেছেন সরস্বতী মূর্তি 

চন্দ্রিমা বিশ্বাস। বয়স ২৯। থাকেন বিরাটিতে। হাতের কাজ দিয়েই মন ছুঁয়েছেন তিনি। শিল্পের প্রতি টান মানুষের চিরকালীন। ফলে চন্দ্রিমার রং তুলির টানে সহজেই যে মানুষ আসক্ত হবেন এমন আশা করা বৃথা নয়। চন্দ্রিমার কথায় মেলে সেই ভালোলাগার রেশ, “রেসপন্স তো বেশ ভালো, ফেসবুকে আমার হাতের কাজ দেখে সবাই ভালো বলছেন। আমায় উৎসাহ দিচ্ছেন। আমিও তাই কাজের সাহস পাচ্ছি।”

আধুনিক সময়ের চাহিদাকে মাথায় রেখে ভালোবাসা আর পরিশ্রম দিয়ে তৈরি করছেন ছবির দুনিয়া। যে দুনিয়ায় বেচেঁ থাকবে চন্দ্রিমার স্বপ্ন দেখার সাহস এবং একরাশ রঙের মহল।

Developed by DXDasia