
এক্সক্লুসিভ আড্ডায় বীরভূমের বহুরূপী শিল্পী কমল মেটে
শ্রীনিকেতনের রাস্তায় হাঁটছি, হঠাৎ চোখ আটকে গেল একজনের দিকে। সাদা রঙের ভূতের মতো দেখতে একজন, স্ট্যাচুর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। হাঁ করে তাকিয়ে আছি ওঁর দিকে, হঠাৎ যেন কে একটা বলে উঠল, “সামনের বোর্ডটা একটু দেখবেন।” চমকে উঠলাম। আশেপাশে তো কেউ নেই! তারপর ঠাওর হল, কথাটা আসলে ওই জীবন্ত মূর্তিটিই বলেছে। খানিকটা ঘোর কাটিয়ে তড়িঘড়ি বোর্ডের দিকে তাকালাম। তাতে লেখা, “শিল্পী কমল মেটে আজকেও বহুরূপী ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। চার প্রজন্ম ধরে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। আশাকরি আপনারাও বহুরূপীর এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন।…”

ভূতের সাজে কমল মেটে
‘বহুরূপী’, অর্থাৎ বহুরূপে যার প্রকাশ, তা ইতিহাসের একটি সুপ্রাচীন শিল্পকলা। শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের সেই বিখ্যাত লাইন, “বাবুমশায় আমি বাঘ-ভালুক নই। আমি ছিনাথ বহুরূপী”। শুধু বাংলা সাহিত্য কেন? সত্যজিৎ রায় অথবা ঋত্বিক ঘটকের ছবির ফ্রেমেও বারবার অন্য মাত্রা পেয়েছিল এই বহুরূপী চরিত্ররা। কখনও সত্যজিৎ রায়ের ‘কাপুরুষ মহাপুরুষ’ ছবিতে রবি ঘোষের কালী সাজ, সমাজের কুসংস্কার আর ভণ্ডামিকে প্রকট করে তুলেছিল, আবার কখনও ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’ ছবিতে এই বহুরূপী চরিত্রের মাধ্যমেই দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যার ছবি ফুটে উঠেছিল।
আরও পড়ুন: কেমন আছেন বহুরূপীরা?
একই অঙ্গে নানান রূপ, এই ছিল বহুরূপীদের মূল উপজীব্য। কখনও শিব, কখনও কালী বা নানান পৌরাণিক চরিত্র কিংবা ভূত, প্রেত, নানান সাজে সেজে উঠতেন তাঁরা। নিত্যনতুন পোশাক আর রং মেখে দর্শকদের নজর কাড়তেন। মূলত গ্রামের মেঠো পথ অথবা গৃহস্থের বাড়ি, এই ছিল তাঁদের অভিনয়ের মঞ্চ। কয়েক বছর আগেও শহুরে রাস্তায় কিংবা কোনো মেলায় চোখে পড়ত চেনা ছবির বহুরূপীরা। বাংলার এই প্রাচীন লোকশিল্পের বয়স ঠিক কত তা আজ হয়তো হিসেব করে বলা সত্যিই কঠিন। আজকাল আর চলতি পথে দেখা মেলে না এঁদের, আধুনিকতার ইঁদুর দৌড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে বাংলার সেই বহুরূপীরা।

বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন বহুরূপী শিল্পী
কিন্তু বাংলার ঐতিহ্য এই ‘বহুরূপী শিল্প’, নিছক শিল্পের গণ্ডিতেই তার যাতায়াত সীমিত নয়। সমাজ, ধর্ম, আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ভাষাগত প্রকাশের নানাবিধ ক্ষেত্রগত দিকের সঙ্গে সেটির সংযোজন। তাই বহুরূপীর ইতিহাস কেবল একটি শিল্পের কথা নয়, ওই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জীবনের ওঠা-পড়ার গল্প, কীভাবে জীবনসংগ্রামের মধ্যে দিয়ে এই শিল্পীরা তাঁদের প্যাশন অবলম্বন করে বেঁচে আছেন, তা তুলে ধরার গল্প। একইসঙ্গে এই ইতিহাস এক বিশেষ ধরনের পারফরম্যান্সের, যা আত্মস্থ করে বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যকে আজও প্রাণপণে টিকিয়ে রেখেছেন কিছু মানুষ। বীরভূমের কমলবাবু হলেন তাঁদেরই একজন। বোলপুর, শ্রীনিকেতনের কমল মেটে, গ্রামীণ বঙ্গজীবনের এক গৌরবময়য় ঐতিহ্যের চতুর্থ প্রজন্মের উত্তরাধিকারী। প্রথম আলাপেই সাগ্রহে জানালেন তাঁর জীবনসংগ্রামের গল্প। আসুন চিনে নিই বাংলার লুপ্তপ্রায় লোকশিল্পের নিবিষ্ট চর্চাকারী সেই মানুষটিকে।
কখনও সোনাঝুরির হাট, কখনও বিশ্বভারতী ক্যাম্পাস আবার কখনও শ্রীনিকেতন চত্বর, রোজগারের তাগিদে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান তিনি। কমলবাবুর কথায়, “রোজ সকাল সকাল সাজতে শুরু করি, কোনোদিন ভূত সাজি, কোনোদিন কালী। যেদিন যেখানে লোক বেশি আসে, সেখানেই যাই।”
সাজের পদ্ধতি থেকে সরঞ্জাম সবই ওঁর নিজের, চার পুরুষ ধরে এগুলকে সম্বল করেই বেঁচে আছেন তিনি। শুধু বোলপুর শহরেই নয়, কাজের সুত্রে ডাক পেয়েছেন, কলকাতা, দিল্লি, নেপাল প্রভৃতি জায়গা থেকেও। গল্প আর একটু জমতেই জানলাম তাঁর ছোটোবেলার কথা, পরিবারের কথা, লড়াইয়ের কথাও। ছোটো থেকেই অভাবের সংসার, পরিবার বলতে স্ত্রী আর চার মেয়ে। কথায় কথায় বলেন, তাঁর মেজো মেয়ের অসুখের কথা। “আগে শুধু শখেই সাজতাম, কিন্তু মেয়েটার অসুখের সময় থেকে টাকা নেওয়া শুরু করি, যাতে মেয়েটার চিকিৎসা করাতে পারি।” রাস্তায় রাস্তায় বহুরূপী সেজে ঘুরে অর্থ রোজগার করেছিলেন তিনি। মেয়েটিকে বাঁচাতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু বোলপুরবাসীর কাছে সেদিন নজির রেখেছিল শিল্পী তথা পিতা কমল মেটের লড়াই।
একটি মানবিক আবেদন
কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলাম আজকের এই যান্ত্রিক সময়ে যখন বহুরূপী শিল্প প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন কীভাবে টিকিয়ে রেখেছেন নিজেকে? জবাবে কমলবাবুর সহজ সরল উত্তর, “সারা বছর তো তেমন ভিড় হয় না, মেলা আর পালা পার্বণে বেশি মানুষজন আসে। তাই অন্য সময় অন্য কাজ করি। চাষের কাজও করি কিংবা যখন যা পাই তাই করি। সংসারটাকে তো বাঁচাতে হবে!”
টিকে থাকার লড়াইয়ে আমরা সবাই এরকমই যন্ত্র মাত্র। ইচ্ছে, শখ এই শব্দগুলো রোজনামচা জীবন থেকে প্রায় হারাতে বসেছে। একসময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় এই লোকশিল্প এখন পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চল থেকে ক্রমশ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কয়েক প্রজন্ম ধরে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা বহুরূপী শিল্পীরা কোনোমতে জীবনধারণ করেছেন। কিন্তু বর্তমানে বিনোদন সংক্রান্ত রুচিতে আমূল বদল আসায়, বহুরূপী পরিবারগুলির তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা এই পেশা ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কিন্তু, তবুও তো আছে কিছু! যাঁরা টিকে থাকার এই অদম্য লড়াইটা প্রতিনিয়ত চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আজ সেরকমই একজন, নিজের জোরেই হয়ে উঠেছেন এই লেখার নায়ক। এত কিছু না পাওয়ার পরেও কমলবাবুর জীবনের প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই, নেই কোনো আক্ষেপও। বরং আছে সুখ খুঁজে নেওয়ার ইচ্ছে। তাই একরাশ আনন্দ নিয়ে হাসিমুখে কমলবাবু বলেন, “এই তো বেশ আছি। আমায় কলকাতার অনেকে সাহায্য করেন, বিশ্বভারতীর ছেলেমেয়েরা আমায় এখনও মাসে মাসে টাকা পাঠায়, ওরা আমায় খুব ভালোবাসে। দিব্যি কেটে যাচ্ছে জীবন।”
ছবিঃ কঙ্কনা মুখার্জী
