‘জালে’ ধরা দিতে চায় ‘বহুরূপী’ও

ঐতিহ্যের পুনঃর্নিমাণ। বাংলা থিয়েটারের আন্তর্জালিক প্রক্রিয়া এবার ‘বহুরূপী’র হাত ধরে

শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রায় প্রতিটা মাধ্যমই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম খুঁজতে চাইছে। ই-বুক, ই-ম্যাগাজিন, ওয়েব সিরিজ, ওয়েব চ্যানেল এসবের সঙ্গে এবার বাংলা থিয়েটারও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাদের কাজগুলিকে এক জায়গায় আনতে চাইছে। বিশ্বসংস্কৃতির সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির এই মিশেল মন্দ নয় কিন্তু। সত্তর বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী থিয়েটার দল ‘বহুরূপী’ এবার এমনই এক সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে। 

১৯৪৮ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ ভাঙার পর সেখানকার সক্রিয় সদস্য শম্ভু মিত্র এবং বিজন ভট্টাচার্যের মতো নাট্যব্যক্তিত্বরা বহুরূপী দল তৈরি করেন। অপরিচিত আঙ্গিকে পরীক্ষামূলক বাংলা নাটক উপস্থাপনার জন্য দলটি তৈরি হয়েছিল। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে তাঁরা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নাটক পরিচালিত করেন। ১৯৫১ সালে মঞ্চস্থ করলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চার অধ্যায়’। ১৯৫৮ সালে তাঁরা ‘রক্তকরবী’ মঞ্চস্থ করলেন শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায়। এই বছরই ইবসেনের ‘ডল’স হাউস’-এর বাংলা রূপায়ণ ‘পুতুলখেলা’র মতো একটি সংবেদনশীল সমসাময়িক বিষয় মঞ্চস্থ করা হয়। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে বহুরূপী’র অবদান প্রতিটা জেনারেশনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীতে তাঁরা মঞ্চস্থ করেছেন ‘বিসর্জন’ (১৯৬১), ‘রাজা অয়দিপাউস’ (১৯৬৪), ‘চুপ! আদালত চলছে’ (১৯৭১), ‘ডাকঘর’ (১৯৭৩), ‘গ্যালিলিও’ (১৯৮০), ‘নবান্ন’ (১৯৮৯)। এছাড়াও চলতি প্রযোজনাগুলি। 

বহুরূপী’র পুরনো সদস্য সুশান্ত দাস বলছেন, “প্রথমদিকে রেকর্ডিং-এর ব্যবস্থা না থাকার জন্য আমরা অনেককিছুই রেকর্ড করে রাখতে পারিনি। তার ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজনা হারিয়ে গেছে। এখনও যদি সংরক্ষণ করতে না পারি তাহলে সবকিছুই চিরতরে হারিয়ে যাবে। তাই আমাদের পুরনো যা যা কাজ আছে সবকিছুই ডিজিটাইজ করতে চাই। এটা সহজসাধ্য নয়, সময়সাপেক্ষ। কাজটা শীঘ্রই শুরু হবে।” শুধু থিয়েটার প্রযোজনাগুলিই নয়, তাঁরা অনলাইনের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে চান বহুরূপী’র লাইব্রেরি, পত্র-পত্রিকা এবং দুর্মূল্য সব ছবি। এর সঙ্গে তাঁরা অনলাইনে স্টোর করতে চান কুমার রায় নাট্য-বক্তৃতার সমস্ত অডিও রেকর্ডিং, যেখান থেকে পাওয়া যাবে উল্লেখযোগ্য নাট্যব্যক্তিত্ব ও গুণীজনদের বক্তব্য। তবে আটের দশকের আগে অবধি পুরনো প্রযোজনাগুলির কোনো রেকর্ডিং করা নেই। বেশ কিছু নষ্টও হয়ে গেছে। তবে সেগুলোর আলোকচিত্র পাওয়া যাবে অনলাইনে।

বহুরূপী’র ঐতিহ্য আমরা ধারণ করেছি বিগত সত্তর বছর ধরে। অপিরিচিত আঙ্গিকে নাটকের ভাঙাগড়ার মধ্যে যে স্পেস, দর্শক-অভিনেতার যোগাযোগ স্থাপন, রবীন্দ্র নাটকের মঞ্চায়ন, চরিত্রদের সমসাময়িক রূপদান দক্ষ হাতে সামলেছেন। নাট্য পত্রিকাগুলির বিভিন্ন সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে গবেষণার নিরন্তর প্রয়াসে সমৃদ্ধ হয়েছে ভারতীয় থিয়েটার। তাঁদের এই আন্তর্জালিক প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানাই। শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, কুমার রায় প্রমুখদের স্মৃতি উস্কে দিয়ে বাংলার গ্রুপ থিয়েটার নতুন পথ খুঁজে পাক। নতুন প্রজন্ম এভাবেই বহুরূপীদের মতো দলকে আঁকড়ে তাদের শাখা-প্রশাখা বিস্তার করুক। এতদিন ইউটিউবের মাধ্যমে আমরা নাগাল পেয়েছি বিশ্ব-থিয়েটারের। কিন্তু মঞ্চ আর ডিজিটালের এই পারস্পরিক মেলবন্ধন বরং নতুন ভাষা এনে দিক এবার। আর তা বহুরূপীর মাধ্যমেই সম্ভব হয়ে উঠুক।

Developed by DXDasia