
‘চিহড়’ পাতা দিয়ে তৈরি হতো প্রাকৃতিক বর্ষাতি
গরমে হাসফাঁস অথবা বৃষ্টিতে থৈথৈ শহুরে মানুষের একমাত্র ভরসা ছাতা। অথবা যদি ছোটোবেলার স্মৃতিতে খানিক শান দিই, মনে পড়ে যেতে পারে বর্ষার আরও এক পরিচিত বন্ধুর কথা! ‘রেনকোট’। অর্থাৎ ‘রেন’ থেকে বাঁচতে এই কোটটি গায়ে চড়িয়ে নিলে একপ্রকার নিশ্চিন্ত। কিন্তু এ শহরের গোলকধাঁধার বাইরেও রয়েছে একটা অন্য জগৎ। যেখানে ঝাঁ চকচকে আদপ কায়দা নেই, নেই অর্থের প্রাচুর্য। অবশ্য যা আছে তার তুলনা টানা মুশকিল! আজকের গল্পটা এরকমই এক হারিয়ে যেতে বসা শিল্পের। পুরুলিয়া (Puruliya) জেলার নিজস্ব শিল্প। ঘঙ (Ghong)। অর্থাৎ গরিবের বর্ষাতি।
আমাদের বাংলা মানেই, শিল্পের আখড়া। হাতের কাজে গ্রামবাংলার মানুষের জুড়ি মেলা ভার। কখনও সূঁচ সুতোর বাঁধনে, কখনও রঙ তুলির টানে, কখনও আবার মাটি, পাতা অথবা কাঠের মোড়কে, শিল্প রচনায় বিরাম নেই কোনও!
পুরুলিয়া জেলার শিল্প আমাদের মোহিত করেছে বরাবর। হাতের কাজের দক্ষতায় পশ্চিমবঙ্গকে বারবার পুরস্কৃত করেছে বিশ্ব দরবারে। ছৌ নাচ থেকে শুরু করে হাতে তৈরী মুখোশ, কুটিরশিল্পে সবসময়ই এক ধাপ এগিয়ে থেকে পুরুলিয়া। পাহাড়ি পরিবেশ, আদিবাসীদের ঐতিহ্য সব মিলেমিশে যায় এইখানে।
পুরুলিয়া জেলার শিল্প নিয়ে আলোচনা হলেও, যা নিয়ে বিশেষ কথা বলতে শোনা যায় না এখন, সেরকমই একটি অত্যাশ্চর্য জিনিস হলো ‘ঘঙ’ বা ‘ঘোঙ’। আজকের যুগের এই শব্দটার সঙ্গে আলাপ করতে গেলে ফিরে যেতে হয় কয়েকশ বছরের ঐতিহ্যের আসরে। কলাকুশলে এ জিনিস সত্যিই আশ্চর্যজনক। বহু বহু যুগের অভ্যাসে ওঁদের এসেছে এই নৈপুণ্য – আমাদের শহুরে হাত হয়তো সেই সূক্ষ্মতার ধারেপাশে ঘেঁষতে পারবে না কখনো!
পালিশ করা সজারুর কাঁটাকে দুদিকে ছুঁচলো করে তা দিয়ে তাঁরা শুরু করতো হাতের জাদুকরি! একটা পাতার নিচে দুটো পাতা, তাদের তলায় আবার তিন, চারটে পাতা, তাদের নিচে আরও পাতা – এই ক্রমে চলতে থাকে সেলাই। সামনেটা খোলা একটি পিরামিড আকৃতির শিল্প রূপ নিতে থাকে।
পাহাড়ি জেলা পুরুলিয়া। বর্ষায় প্রবল বৃষ্টি হয় এখানে। যার ফলে মাঠে চাষের কাজ বিঘ্নিত হয়। দিনের পর দিন শস্যের যত্ন নিতে সমস্যা হয়। অথচ শহুরে মানুষের মতো দামী রেনকোট কেনার সামর্থ্য তাদের নেই। ফলে ওখানকার স্থানীয় চাষীরা নিজেরাই প্রাকৃতিক ভাবে এই সমস্যার সমাধান করে ফেলেন।

পুরুলিয়ার বাসিন্দা দীপালি মান্ডির সঙ্গে কথায় কথায় উঠে এলো ‘ঘঙ’ তৈরির চিত্র। দীপালি নিজেও বড় হয়েছেন চাষি পরিবারেই। ছোটোবেলা থেকে বাবাকে দেখেছেন ক্ষেতে কাজ করতে, তাই ‘ঘঙ’ দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর নতুন নয়। দীপালির কথায়, “ছোটোবেলায় মায়ের সঙ্গে আমিও রোজ দুপুরে, পাতা সুতো নিয়ে বসে পড়তাম। আমাদের আশেপাশে সব বাড়িতেই এই রেওয়াজ ছিল। গোটা গ্রীষ্মকাল জুড়ে চলতো ‘চিহড়’ পাতা সংগ্রহের কাজ। তারপর পাতাগুলো রোদে শুকোতে দেওয়া হতো। যখন ধীরে ধীরে পাতার রঙ পরিবর্তন হয়ে, সবুজ থেকে হালকা তামাটে হয়ে যেত , তখনই শুরু হতো ‘ঘঙ’ বোনার কাজ।”
বর্ষার প্রাক্কালে আবহাওয়ায় যখন একটু ভিজে যাওয়া ভাব আসতো তখন পাহাড়ঘেঁষা গাঁয়ের মেয়ে-বউরা বসে যেত ঘঙ বানাতে – পালিশ করা সজারুর কাঁটাকে দুদিকে ছুঁচলো করে তা দিয়ে তাঁরা শুরু করতো হাতের জাদুকরি! একটা পাতার নিচে দুটো পাতা, তাদের তলায় আবার তিন, চারটে পাতা, তাদের নিচে আরও পাতা – এই ক্রমে চলতে থাকে সেলাই। সামনেটা খোলা একটি পিরামিড আকৃতির শিল্প রূপ নিতে থাকে। বিভিন্ন বয়সের জন্য বিভিন্ন আকৃতির ঘঙ বানাত তারা। বেশ সময় এবং ধৈর্য্য সাপেক্ষ কাজ – সকালের দিকে হয়তো বাড়ির কোনোও মেয়ে বসে কাজ শুরু করলেন, তারপর দুপুরে সব কাজ সেরে আবার হাত লাগালেন কাজে। এইভাবেই কয়েকদিন ধরে এর হাতে, ওর হাতে একটু একটু করে পূর্ণতা পেত একটা ঘঙ।

এরপর অপূর্ব এই কুটিরশিল্পের বাস্তব ব্যবহারের পালা। বর্ষা নামলে এই বর্ষাতি ব্যবহার করে তারা নেমে পড়ত কাজে। এক একটি ঘঙের ওজন হতো প্রায় তিন-চার কেজি। বেশ ভারী এই ‘ঘঙ’ ব্যহার করাই এখানকার চাষীদের রীতি ছিল একসময়। তবে যুগ বদলেছে, যন্ত্র সভ্যতা গ্রাস করেছে বর্তমান সময়কে। এখন চিহড় পাতার তৈরি প্রাকৃতিক ঘঙ-এর জায়গায় এসেছে বিভিন্নরকম সিন্থেটিক উপাদানের তৈরী বর্ষাতি বা ঘঙ। দামে কম, তাঁর ওপর বানানোর ঝক্কি নেই, ফলে সহজেই চাষিরা এখন বিকল্পে ঝুঁকছেন। তাছাড়া ভারী ওজনের ঘঙ-এর পরিবর্তে এই হালকা ঘঙ ব্যবহার করতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন তাঁরা। বর্তমানে অবশ্য বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কৃত্রিম ঘঙ বিতরণ করেন চাষিদের।
পুরুলিয়ার এই কুটির শিল্প তাই এখন বিলুপ্তপ্রায়। আধুনিকতার থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে এই চিহড় পাতার ঘঙ। যদিও ব্যাবসায়িক ক্ষেত্রে এই শিল্পের ব্যবহার কোনোদিনই ছিল না, তবুও হাতের কাজের নিপুনতায় ক্লান্তিহীন পথ চলা ছিল ঘঙ-এর। পলিথিনের হালকা ঘঙ-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লেও, শিল্প-মাধুর্য ফিকে হয়নি। শোনা যায়, এখনও আষাড় মাসে বেলপাহাড়ী থেকে ১২ কিমি দূরে ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গের মিলিত কানাইসর পাহাড় পুজো মেলায় চিহড় পাতার টুপি বিপুল বিক্রি হয়। বেলপাহাড়ী অঞ্চলের আদিবাসীদের ঘরে হানা দিলে এখনও মিলবে একটা-দুটো ঘঙ। হয়তো বহুদিনের অব্যবহারে ঝুল পড়েছে তাতে, কিন্তু ঐতিহ্যে অমলিন পুরুলিয়া জেলার এই কুটির শিল্প।
ছবি সৌজন্যে – তীর্থঙ্কর ওঝা এবং সুদীপ পাত্র।
