
পাথুরে খাদানে কীভাবে তৈরি হল এত রকম রং?
দগদগে রাঙামাটি, গনগনে পলাশ, ছৌ, অযোধ্যা, বাঘমুন্ডি, গড় পঞ্চকোট কিংবা বড়ন্তি, পুরুলিয়ার জনপ্রিয়তা এগুলো ঘিরে তো বটেই এছাড়াও বাংলার সেপিয়া রঙা এই জেলার আরও কত রং, কত গল্প, কত ঠিকানা…ইচ্ছে করেই যেন সেসব একটু অগোচরে থাকে। বিশেষ চমক দেওয়ার জন্য। যেমন ‘রং পাহাড়’। পুরুলিয়ার বলরামপুর থানার অন্তর্গত বেলা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় অবস্থিত মালতি গ্রাম। বলরামপুর শহর থেকে মাত্র ৮ কিমি দূরে, পশ্চিমবঙ্গ-ঝাড়খন্ড সীমানার কাছে এই মালতি গ্রামেই রয়েছে একটি খড়ি খাদান – মালতি খাদান ওরফে ‘রং-পাহাড়’। এর মাটিতে মিশে আছে অকার ইয়েলো, বার্ন্ট সাইনা, র’ অ্যাম্বার, হোয়াইট, পেইন্স গ্রে আরও অনেক রং।
দেখলে মনে হবে খয়েরি ছাড়া এই পাহাড়ের অন্য কোনও রং নেই। অথচ, এই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা বাদনা, সোহারাই ইত্যাদি পরবের সময় এই খাদানের রঙিন মাটি ব্যবহার করে বাড়ির দেওয়ালে বিভিন্ন চিত্র, আলপনা আঁকেন। টিলাকৃতি এই পাহাড়ের মাথা চ্যাপ্টা কিন্তু এবড়োখেবড়ো। মাঝে রয়েছে গভীর গর্ত, নীচে জল। কিন্তু পুরো টিলা জুড়ে কীভাবে তৈরি হল এত রকম রং?
বিভিন্ন সময়ে ভূগর্ভ থেকে উঠে আসা লাভা বাইরে এসে জমাট বেঁধে কালো ব্যাসল্টে পরিণত হয়। এই পাহাড়ে সাদা ও আংশিক কালো খনিজের মিশ্রণে তৈরি আগ্নেয় শিলা গ্রানাইট পাথরও প্রচুর রয়েছে। ভূতাত্ত্বিক, গবেষক এবং বিশ্বভারতীর প্রাক্তন অধ্যাপক গুরুপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়-এর মতে সাদা বা হালকা খয়েরি রঙের যে পাথরগুলো রয়েছে ওখানে, সেগুলো নাইসিক শিলা গঠিত হওয়াই সম্ভব। তাঁর কথায় “গঠনগত বিচারে জায়গাটি ভারতের আদিমতম শিলায় গঠিত উপদ্বীপীয় মালভূমি গন্ডোয়ানাল্যান্ডের একটি অংশ। এই অঞ্চলের মূল শিলা হল আগ্নেয় শিলার পরিবর্তিত রূপ, যার ভূতাত্ত্বিক নাম নাইস। লাল রঙের জায়গাগুলো আয়রন অক্সাইড সমৃদ্ধ। লোহার ভাগ বেশি থাকায় রং লাল। এই শিলাময় অংশটাকে ল্যাটেরাইট বলা চলে। সমগ্র ছোটনাগপুর অঞ্চলেই এমন ল্যাটেরাইট থেকে সৃষ্ট মৃত্তিকা অনেক জায়গায় দেখা যায়। পুরুলিয়ার বলরামপুর অঞ্চলের আশপাশ, যেমন— ঝালদা বা বাঘমুন্ডি এলাকা— প্রকৃতির এমন মিশ্র শিলা বা শিলাচূর্ণ দিয়ে গঠিত।”
রং পাহাড়ের রং সৃষ্টির নেপথ্য রহস্য না হয় বোঝা গেল, কিন্তু পাহাড়ের শক্ত মাটি বা পাথর থেকে কীভাবে রং তৈরি হয় এবং তা ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে?
প্রথমেই শক্ত মাটি বা পাথরকে ভালোভাবে গুঁড়ো করে, তা চালুনি দিয়ে চেলে নেওয়া হয়। এবার তা মিহি কাপড়ে ফের ২-৩ বার চেলে নেওয়া হয়। তারপর জল দিয়ে গুলে নিলেই রং রেডি! কেমিক্যাল বাইন্ডিং ছাড়াও রং পাকা করতে পানিয়ালতা গাছের ডাল গরম জলে ফোটালে যে আঠা বেরোয়, তা রঙের সঙ্গে মেশানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মাটির বাড়ির দেওয়ালে কারুকর্ম বা চুনকাম করা ছাড়াও খাদান থেকে প্রাপ্ত খড়ি মাটি সিমেন্ট এবং সেরামিক শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
রং তৈরির প্রক্রিয়া (ক)
রং তৈরির প্রক্রিয়া (খ)
‘পাখি পাহাড়’ খ্যাত শিল্পী, পুরুলিয়াবাসী প্রবীণ ভাস্কর চিত্ত দে, যিনি বিগত কয়েকবছর ধরে ‘ইন-সিটু রক স্কাল্পচার’-এর কাজ করছেন এবং শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি পাহাড় সংরক্ষণে ব্রতী। তাঁর ডেরায় গেলে দেখা যাবে রং পাহাড়ের রং দিয়ে তিনি দেওয়ালে দেওয়ালে ফুটিয়ে তুলেছেন হলুদ ফুল, সবুজ পাতাবাহার আরও কত কি! একটি ‘ট্রাভেল-ভ্লগ’-এ তিনি বলছিলেন, “এই রঙের খাদানটা পুরুলিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। প্রশাসন যদি একটু উদ্যোগ নিয়ে প্রসেসিং করে বা কেমিক্যাল অ্যানালিসিস করে, তাহলে কিন্তু এই রং অনেক কাজে লাগবে এবং শিল্পকর্মেরও একটা ধাপ পাওয়া যাবে। এই পাহাড়ে সরকম রং পাওয়া যায়। আমি এখনও অবধি এই রং শুধুমাত্র মাটির উপর ব্যবহার করেছি। এই পাহাড়ের গায়েও কাজের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই রং ক্ষণস্থায়ী, যদি কেমিক্যাল অ্যানালিসিস করা হয় তবেই দীর্ঘস্থায়ী হবে।”
রং পাহাড়ে শিল্পী চিত্ত দে
চিত্তবাবুর তত্ত্বাবধানে রং পাহাড়ের রং দিয়ে সেজে উঠছে মাটির দেওয়াল
মুগ্ধচিত্ত মধুকবি (মাইকেল মধুসূদন দত্ত) পুরুলিয়া শহর নিয়ে লিখেছিলেন একটি সনেট, যার প্রথম চার পঙক্তি: “পাষাণময় যে দেশ, সে দেশে পড়িলে/ বীজকুল, শস্য তথা কখন কি ফলে?/ কিন্তু কত মনানন্দ তুমি মোরে দিলে, / হে পুরুল্যে!…”। মনুষ্যত্ব আমাদের শেখায় সুন্দর কিছু ভাগ করে নিতে হয়, এভাবে জানিজানি বাড়ে এবং অগোচর ভেঙে যায়। যেকারণে ৮০০ ফুট উচ্চতার অখ্যাত ‘মুরা বুরু’ আজ জনপ্রিয় ‘পাখি পাহাড়’। আজ হয়তো পর্যটকদের ভিড় নেই, দোকান-বাজারের পসার নেই তবে এভাবে একদিন হয়তো রং পাহাড়ও ভ্রমণপিপাসুর হৃদয়ে রঙিন হয়ে উঠবে।
তথ্যসূত্রঃ- অরিজিৎ সিংহ মহাপাত্র (পার্শ্বলা, বাঁকুড়া), Official Website of Purulia District, West Bengal, India ; আনন্দবাজার পত্রিকা রং পাহাড় – উজ্জ্বল কুমার দাস – PURULIA-Purulia ফেসবুক পেজ, ট্রাভেল-ভ্লগঃ Columbus Kapil