ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : হলুদ বনে বনে

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ৪

গত পর্বের পর

গতকাল ভালো ঘুমোইনি। মনের ভেতর ছিলো চাপা উত্তেজনা। অনেকটা ষষ্ঠীর রাতের মতো। রাত পোহালেই নতুন জামা, নতুন জুতোর সম্ভাবনা আমাকে ছোটোবেলায় জাগিয়ে রাখতো। এ যেন ঠিক তেমনটাই। গতরাতেই ব্যাগ গুছিয়ে ফেলেছিলাম। পরিকল্পনামাফিক দেখতেই হবে ইউনিভার্সাল স্টুডিও আর ডিজনিল্যান্ড। যেহেতু সে দুটো অরল্যান্ডো (Orlando) বলে একটা অন্য শহরে, তাই ঘুম থেকে উঠেই ট্রেন ধরার একটা মতলব ফেঁদেছিলাম মনে মনে। জাহাজ যে দু-চার দিন বন্দরে থাকে, সে কটা দিন আমার ছুটি। ক্লাস পড়াতে হয় না, তাই এই ভ্রমণ পরিকল্পনা। দু-দিনের মতো জামাকাপড় আর দরকারি কিছু জিনিস গুছিয়ে শুয়েছিলাম বটে – তবে একটু পরে পরেই ঘুম থেকে উঠে পড়ে ভাবছিলাম কখন সকাল হবে।

ভোরের আলো

সত্যি যখন সকাল হলো, পোর্ট হোল দিয়ে ভোরের আলো উঁকি দিলো, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে, হাতে প্লাস্টিকের অনুসন্ধানী গোয়েন্দা ব্রেসলেট এবং সফরের উপযোগী পোশাক চাপিয়ে, ব্রেকফাস্ট সেরে, ব্যাগ কাঁধে যখন জাহাজ থেকে নামলাম, তখন বাজে সকাল ৭:৩০টা। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে আমি খুব একটা সেলফোন ব্যবহার করি না। কোথাও বেড়াতে গেলে, আগের থেকে সেই জায়গার খুঁটিনাটি খবর জোগাড় করে রাখি না। পথে নানারকম চমক আমার ভালো লাগে। তবে বলাই বাহুল্য, মাঝে মাঝে চমকগুলি একটু বেশিরকম চমকদার হয়ে যায় বটে!

অনেকটা পথ হাঁটতে হবে ভেবেই ব্যাগের ভেতরে ল্যাপটপ আর জামাকাপড় বেশ ভারী ঠেকতে লাগলো। তবে বেরিয়ে যখন পড়েছি তখন আর ওই সব ছোটোখাটো গোলমালের কথা ভাবলে চলে না। প্রাণের ভেতর তখন ফরিদপুরী জেদ গোঁফে তা দিচ্ছে।

সকাল ৭:৩০টা আমাদের জাহাজে ছুটির দিন হিসেবে, একটু বেশি রকমের সকাল। যে সব ছাত্ররা জাহাজ পাহারা দেয়, তারা তখনও আগের রাতের মোদো মাতালদের সামলে উঠে একটু জিরোচ্ছে। কাকভোরে বীরবিক্রমে আমাকে জাহাজ থেকে তিড়িংবিড়িং করে নামতে দেখে ওরা যারপরনাই অবাক হলো। ওদেরকে আরও একটু ঘাবড়ে দিয়ে ‘চললাম ডিজনি ওয়ার্ল্ড’ এইমতো ঘোষণা করে বীরাঙ্গনার হাঁটা দেবার খানিক বাদে মনে পড়ল যে বন্দর থেকে রেলস্টেশনে যাবার জন্য ওই অত সকালে আমি কোনোই ট্যাক্সি বা বাস পাব না। অনেকটা পথ হাঁটতে হবে ভেবেই ব্যাগের ভেতরে ল্যাপটপ আর জামাকাপড় বেশ ভারী ঠেকতে লাগলো। তবে বেরিয়ে যখন পড়েছি তখন আর ওই সব ছোটোখাটো গোলমালের কথা ভাবলে চলে না। প্রাণের ভেতর তখন ফরিদপুরী জেদ গোঁফে তা দিচ্ছে।

পোর্ট টার্মিনালের পাশেই রয়েছে ট্রান্সপোর্ট অথরিটির অফিস। তখনো দরজা খোলেনি। অফিসের সামনে ‘কোন এলিভেটর’ (Kone Elevator) লেখা একটা ভ্যান দাঁড়িয়েছিল। ভ্যানে হেলান দিয়ে একজন লোক কারো সাথে টেলিফোনে কথা বলছিলেন। আমি কথা বলা শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করে রইলাম। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, রেলস্টেশনের পথটা একটু বাতলে দিতে পারেন?’ ভদ্রলোক প্রথমে সোজা তারপর ডানদিক তারপর পার্কের পাশ ঘেঁষে বাঁদিক এইসব নানারকম ডিরেকশন দিতে গিয়ে বোধহয় বুঝলেন যে আমার মুখটা শুকিয়ে আমশি হয়ে যাচ্ছে। তখন একটু চুপ করে বললেন যে ‘আমি ওই পথ দিয়েই যাচ্ছি আসুন আপনাকে নামিয়ে দিচ্ছি’। অযাচিতভাবে পাওয়া এইটুকু সহৃদয়তা আমার পিঠের ভারী ব্যাগকে একেবারে পালকের মতো হালকা করে দিল। আমি ‘কোন এলিভেটর’ লেখা ভ্যানে চেপে রেল স্টেশন পৌঁছলাম।

টাম্পা স্টেশনের ভিতর

টাম্পা স্টেশনের বাহির 

ভদ্রলোককে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে স্টেশনে ঢুকে দেখি চমৎকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্টেশনের বিশাল হলঘরে আমি ছাড়া রয়েছে আর দুটি প্রাণী। এক প্রান্তে এক সুন্দরী পুলিশ অফিসার নখ পালিশ করছিলেন আর অপর প্রান্তে একটা কাউন্টারের পেছনে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক জনমানবশূন্য স্টেশনে টিকিট বিক্রি করছিলেন। আমি সারা জীবনে খোলা অবস্থায় কোনো রেলস্টেশন এত শুনশান দেখিনি। যাই হোক, এগিয়ে গিয়ে খুব মিশুকে গলায় বললাম ‘সুপ্রভাত’। আমি অরল্যান্ডোর একটা টিকিট চাই। ট্রেন কখন ছাড়বে? ভদ্রলোক নিরাসক্তভাবে বললেন ‘সন্ধে সাড়ে পাঁচটায়’। এতক্ষণে স্টেশনের জনহীনতার একটা হদিশ পাওয়া গেল। ট্রেনের এইরকম শিডিউল শুনে তো ডোনাল্ড, মিকি আর গুফির দল পটাং পটাং লাফ মেরে আবার কমিক বইয়ের পাতার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। মিনমিন করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ট্রেন বা ট্যাক্সি ছাড়া আর কীভাবে টাম্পা থেকে অরল্যান্ডো যেতে পারি?’ ভদ্রলোক তখন আমাকে মাইলখানেকের ভেতরে একটা গ্রেহাউন্ড বাস স্টেশনের হদিশ দিলেন, যেখান থেকে অরল্যান্ডো অভিমুখী বাস ছাড়বে সকাল ৯:৪৫-এ।

গ্রেহাউন্ড বাস

হাঁটতে হাঁটতে যখন বাস স্টেশনে এসে পৌঁছালাম, তখন আমার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটাকে মনে হচ্ছিল গন্ধমাদন পর্বত আর আমাকে মনে হচ্ছিল সাক্ষাৎ হনুমতী! কাউন্টারে একজন ক্লার্ক ভদ্রমহিলা তখন সেলফোনে মানিনীর মানভঞ্জনের প্রথম ধাপে। আমার ক্লিষ্ট চেহারা দেখে বোধহয় মায়া হল। ‘টক টু ইউ লেটার’ বলে সাংঘাতিক লম্বা নখ দিয়ে সেলফোন বন্ধ করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কী চাই?

অরল্যান্ডোর একটা টিকিট চাই বলাতে বললেন যে এমনি দাম হল ২৪ ডলার আর ওয়াক-ইন (walk-in) হলো ২১ ডলার। আমি কোনটা নেব? অনেকক্ষণ মোট বয়ে হেঁটে হেঁটে মাথা কাজ করছিল না। ভ্যাবার মতো চেয়ে থাকায় উনি বললেন ২৪ ডলারের টিকিট কাটলে পরিবর্তনের ব্যবস্থা আছে কিন্তু ওয়াক-ইন কেটে ফেললে সে আর কিছু অদল বদল হবে না। আমি তখন ঝাঁপিয়ে পড়ে ওয়াক-ইন কেটে ফেললাম কারণ এই বাসটা ধরতে না পারলে আবার সেই সন্ধেবেলার ট্রেন ও পুনরায় ওয়াকিং (walking)!

তখন বাস ছাড়তে প্রায় আধঘণ্টা দেরি। চারিদিকে বেশিরভাগ যাত্রী আফ্রিকান-আমেরিকান বা হিস্পানিক। এর মধ্যে এক যাত্রী আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে তিনটি চেয়ার জোড়া করে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন, যদিও হাওড়া বা শিয়ালদা স্টেশনে এটা কোনো ব্যাপারই নয়। তবে এখানে তা নিয়ে বেশ জলঘোলা হল। যে লোকটি স্টেশনের মেঝে পরিষ্কার করছিলেন তিনি হঠাৎ ঘুমন্ত মানুষটিকে খুব খানিকটা ঠেলাঠেলি করে তুলতে চেষ্টা করছিলেন। ঘুমন্ত মানুষটি তাকে মোটেও পাত্তা না দিয়ে পাশ ফিরে শুলো। আমি ভাবছি কেন বাবা ঝামেলা বাঁধানো! লোকটা হয়তো নেশা ভাং করে আছে! একটু পরে হলে চাপা উত্তেজনা… পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে। বছর ২৫ বয়সের, দিনে হাজারবার ডন বৈঠক করা আর পকেটে পিস্তল ঝোলানো, কালো পোশাকের এক পুলিশ এসে মৃদু গলায় ‘এক্সকিউজ মি স্যার’ বলাতে আর যায় কোথা! লোকটা তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে কাঁচুমাচু মুখে নানা অজুহাত দিয়ে সে যাত্রা রক্ষা পেল। আমি ভাবছিলাম যে টাম্পা শহরে বোধহয় তেমন খুন ডাকাতি রাহাজানি হয় না। স্টেশনের বেঞ্চিতে ঘুমিয়ে থাকা মানুষদের তাই এত হয়রানি!

আর.ভি

বাস এগোলো হাইওয়ে ধরে উত্তরমুখে। পথ চলতে চলতে বুঝলাম যে ফ্লোরিডায় ব্যবসা করতে গেলে হয় কমলালেবুর নয় গাড়ির ডিলারশিপ বা আর.ভি-র ডিলারশিপ নতুবা জমি বাড়ি বেচাকেনার ব্যবসা করতে হবে। পথ চলতে চলতে, বাসের জানালা দিয়ে, এর বাইরে বিশেষ কোনো ব্যবসা পত্রের হদিস পেলাম না। আর.ভি. (RV) হল রিক্রিয়েশনাল ভেহিকল (Recreational Vehicle)। ঠিক যেন একটা গাড়ির পেছনে একতলা বাড়ি বেঁধে রাখা হয়েছে। যারা দুটো বাড়ি সামলাতে পারে না, তারা এইরকম আর.ভি. ভাড়া করে কয়েক মাস দিব্যি চালিয়ে দেয়। গাড়ির ভেতরেই থাকা খাওয়ার সু-ব্যবস্থা রয়েছে।

গাড়ির ভেতর বাড়ি/ দিলদার সওয়ারি

ফ্লোরিডার বেশ একটা সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা ভাব রয়েছে। এখানের গাছপালা আর ফুলের সমারোহ দেখে কে বলবে যে আর খানিকটা উত্তরে গেলে লোকেরা ভয়ঙ্কর শীতে কোদাল দিয়ে বরফ চেঁছে চলেছে! টাম্পা থেকে অরল্যান্ডোর মাঝে আমাদের বাস আর দুটো শহরে থামলো। তাদের নাম লেকল্যান্ড আর উইন্টার হ্যাভেন। দুটো শহরই নামের মর্যাদা রেখেছে। এদের কল্যাণে আমিও হাইওয়ে ছেড়ে একটু অভ্যন্তরে আসতে পারলাম। খানিক ক্ষুধার উদ্রেক হওয়ায় ব্যাগ থেকে অন্যতম জরুরি যে জিনিস বেরোলো সেটা হল হলদিরাম ভুজিয়াওয়ালার ঝুরিভাজা। এক প্যাকেট ঝুরিভাজা চিবুতে চিবুতে বেশ ভাবুক ভাবুক মুখ করে বসে রইলাম খানিকক্ষণ।

লেকল্যান্ড

ফ্লোরিডার বেশ একটা সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা ভাব রয়েছে। এখানের গাছপালা আর ফুলের সমারোহ দেখে কে বলবে যে আর খানিকটা উত্তরে গেলে লোকেরা ভয়ঙ্কর শীতে কোদাল দিয়ে বরফ চেঁছে চলেছে!

লেকল্যান্ড থেকে আবার হাইওয়ে ওঠার আগে আমাদের বাস এক আশ্চর্য কমলালেবুর বাগানের পাশ দিয়ে বহু মাইল ধরে চলল। সেই বাগানের রঙের বাহার এখনও চোখে লেগে রয়েছে। ছোটোবেলায় ওয়াটার কালারের বাক্সে কেবল দু’রকম হলুদের টিউব থাকতো। লেমন ইয়েলো (Lemon Yellow) আর ইয়েলো অকার (Yellow Ochre)। কিন্তু কমলা বনের হলুদের রংবাহারিতে কোনো কার্পণ্য নেই। গাছে গাছে ঝুলে রয়েছে হরেক সাইজের অজস্র কমলালেবু। কী তাদের রঙের বাহার আর কী তাদের সুবাস। কিছু মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। এ এক আশ্চর্য চিত্রকর। এ এক অফুরান রঙের ভাণ্ডার।

‘তাইতো তুমি রাজার রাজা হয়ে 
তবু আমার হৃদয় লাগি
ফিরছ কত মনোহরণ বেশে
প্রভু নিত্য আছো জাগি’

হলুদ বনে বনে…

লেমন ইয়েলো আর ইয়েলো অকার বাধ্যবাধকতা অতিক্রম করে বিশাল দিঘির ধার ঘেঁষে যে হলুদের হোরিখেলায় মেতেছে কমলা বন – সেখানে নিশ্চয়ই সন্ধে নামলে রাজকন্যে আসেন তার হারিয়ে যাওয়া নাকছাবির সন্ধানে…

‘সুখ নেইকো মনে
নাকছাবিটি হারিয়ে গেছে
হলুদ বনে বনে…’

ক্রমশ…

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হবে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia