
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ৩
তা কথা হচ্ছিলো টাম্পা (Tampa) যাওয়া নিয়ে। উদগ্রীব হয়ে ছিলাম ডিজনিল্যান্ড দেখবো বলে। তার মধ্যে জাহাজের রাঁধুনি যুভির প্রসঙ্গে উঁকি দিয়ে গিয়েছিলো ব্লুবেরি মাফিন। কিন্তু যাচ্ছিলাম তো সেবার টাম্পা (Tampa)। সেই প্রসঙ্গে ফেরা যাক।

আজ সকালে জাহাজের পোর্টহোল দিয়ে ভোরের প্রলেপ পড়ার সাথে সাথে মনে হল বাইরে বেশ একটা হইচই চলছে। ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখি দূরে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে, টাম্পা শহরের উঁচু অফিস বাড়িগুলো দেখা যাচ্ছে। অনেকদিন পরে এই প্রথম স্থলের একটা নিশ্চিত ঠিকানা চোখে পড়ল। কাকভোরে ডেকের ওপরে ছাত্র মাঝিদের কাজকর্ম শুরু হয়ে গেছে কর্মিষ্ঠ পিঁপড়ের মতো। তারা সারিবদ্ধ হয়ে নোঙর ফেলার কাজে ব্যস্ত। চা খেতে খেতে দেখলাম আমাদের বন্দরে ভিড়িয়ে দেবার জন্য গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ঠেলাঠেলি শুরু করেছে এনডেভার নামের ছোটোখাটো চেহারার একটা টাগবোট। সাইজে ছোটো হলেও ধানি লঙ্কার মতো এনডেভারের তেজ প্রচণ্ড। ভীষণ গোঁতাগুঁতি করে সে আমাদের বিশাল জাহাজ ইউএসটিএস কেনেডিকে (USTS Kennedy) একটা বার্থে ভিড়িয়ে দিল। ৬০০ ছাত্রর সেকি উল্লাস! বন্দরে বাবা-মা “We love you Chris!”, “Welcome Amanda!” – এরকম নানা সাইনবোর্ড নিয়ে হাজির। আমরা যারা Chris, Amanda নই, তারাও অনেকদিন পরে স্থল দেখতে পেয়ে বেজায় খুশি হলাম। মনে হল তীরবর্তী গাছপালার সবুজ হাতছানিতে আমাদের আত্মীয় বন্ধুরাও যেন স্বাগত জানাতে এসে দাঁড়িয়েছে। সে এক আশ্চর্য আনন্দ অভিজ্ঞতা।

গ্যাঙওয়ে (Gangway) নামানো হচ্ছে। এটি হলো জাহাজ থেকে স্থলে নামবার সিঁড়ি। তার তলায় নেট বাঁধা রয়েছে যাতে আমার মতো নড়বড়েরা পা হড়কে ঝপাং করে জলে না পড়ে যায়! আমি চটপট তৈরি হয়ে নিলাম। আমাদের প্রত্যেকের হাতে জাহাজ থেকে হলুদ রঙের প্লাস্টিকের ইলেকট্রনিক ব্রেসলেট দিয়েছে। জাহাজ থেকে নামলে বা উঠলে সেই ব্রেসলেট স্ক্যান করলে তবেই ছাড়পত্র মিলবে। সেই হলদে প্লাস্টিকের মগজে আমাদের প্রত্যেকের ঠিকুজি-কুষ্ঠি, চোখের রং থেকে নখের কোনটুকুর হদিশ রয়েছে। কোনো রকম ভুল হবার জো নেই।

জাহাজ থেকে টাম্পা শহরের একটা নকশা নিয়ে বেরিয়েছিলাম যাতে লেখা ছিল যে আমাদের গেটের কাছাকাছি রয়েছে এক স্ট্রিটকারের ব্যবস্থা। আমি যাকে আজন্ম ট্রাম বলে চিনেছি, জেনেছি… তিনিই দেখলাম এই শহরে, নবকলেবরে, স্ট্রিটকার রূপ ধারণ করেছেন। মনে মনে ঠিক করলাম টাম্পা শহরে একবার ট্রাম… থুড়ি… স্ট্রিটকার চড়তেই হবে।

আরও পড়ুন: ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : হাফ হাতা জামার দিন
গ্যাঙওয়ে নামানো হচ্ছে। এটি হলো জাহাজ থেকে স্থলে নামবার সিঁড়ি। তার তলায় নেট বাঁধা রয়েছে যাতে আমার মতো নড়বড়েরা পা হড়কে ঝপাং করে জলে না পড়ে যায়!
যাই হোক, নতুন জায়গা প্রথম একটু হেঁটে দেখবো ভেবে একটা বেশ চওড়া রাস্তা ধরে হাঁটছি তো হাঁটছি। আমার সাথে হাঁটছে একটা রেললাইন। সেখানে একটা গম্ভীর চেহারার লাল ইঞ্জিনে হাঁসফাঁস করে ধোঁয়া ছাড়ছিল। খানিক বাদে বুঝলাম যে এখানে খুব একটা কেউ বোধহয় পায়ে হেঁটে এই রাস্তা দিয়ে যায় না। এটি বন্দরের বাইরে গাড়ি আর ট্রাক চলাচলের রাস্তা। ঝোড়ো বাতাসের গতিতে যাওয়া গাড়ি থেকে লোকজনেরা একটু অবাক হয়ে সালোয়ার-কামিজ পরিহিতা হন্টনরতা মহিলাকে দেখছিল বটে। অবশেষে বেশ একটা জমজমাট দোকান-পসারওয়ালা জায়গাতে এসে পড়লাম। সেখানে একটা মস্ত অ্যাকোয়ারিয়াম (Aquarium) রয়েছে। অ্যাকোয়ারিয়ামে মোলাকাত হল নানারকম পেঙ্গুইন, মাছ আর অন্যান্য জলজ প্রাণীদের সাথে। মাঝে মাঝে তৈরি করা হয়েছে জলভূমির ইকোসিস্টেম (Eco-System)। সেখানে বালির চরে খাবারের খোঁজে পাখিদের যাতায়াত। কাছিমেরা ঘুরছে মনের মতো ডিম পাড়ার জায়গার সন্ধানে। এইসব নানান রকম ব্যস্ততার ভিতর ভীষণ ভারিক্কি চেহারার একটা পেঁচা খুবই নিরাসক্ত মুখ করে একটা গাছের ডালে বসে বানপ্রস্থের পরিকল্পনা করছিলো।



সবকিছু দেখে দেখে ভাবলাম এবার একটা স্ট্রিটকার খুঁজে বের করতেই হবে। অ্যাকোয়ারিয়ামের সামনে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারি পুলিশটি বেশ হাসিখুশি মিশুকে ধরনের। সে আমাকে বলে দিলো স্ট্রিটকার কোথা থেকে ধরতে হবে। কদিন একটা চাপা জ্বর গলাব্যথা আর কাশি বেশ জ্বালাচ্ছিল। চমৎকার এক কাপ হট চকলেট হাতে নিয়ে উঠে পড়লাম হলদে রঙের স্ট্রিটকারে। সে ভারি সুন্দর দেখতে। টকটকে হলুদবরণ তার চেহারা। একজন বৃদ্ধ আফ্রিকান-আমেরিকান গাড়ির চালক আমাকে বললেন যে আমি যদি ৫ ডলার দিয়ে একটা ডেইলি পাস কিনি, তা হলেই সবচেয়ে যাকে বলে ব্যাং ফর মাই বাক (Bang for my buck) হবে। আর যাই কোথা! সেই যে একটি পঞ্চমুদ্রা খরচ করে টিকিট কাটা, তারপরে আর স্ট্রিটকার থেকে নামার নাম করিনে! শহরের এক প্রান্ত থেকে গাড়ি চলতে আরম্ভ করল। মনে হয় বর্তমানের পাশাপাশি, বিএমডব্লিউ মার্সিডিজের ভয়ংকর গতির পাশাপাশি ঢিমেতালে চলছে আমার কলকাতার আর মেলবোর্নকে মনে করিয়ে দেওয়া স্ট্রিটকার। প্রতিটি স্টপে ধীরেসুস্থে গল্প করতে করতে উঠছে-নামছে পর্যটকের দল। যেন কারোর কোথাও পৌঁছানোর কোনো তাড়া নেই। এমনি করে আমাদের স্ট্রিটকার শহরের একটা খুব পুরোনো অংশে এসে পৌঁছালো। সেখানে বাড়িগুলো দেখলে চন্দননগরের কথা মনে হয়। লাল ছোটো ছোটো ইঁটের তৈরি সব বাড়ি ঘর। খুব যত্ন করে অতীতকে ধরে রাখা হয়েছে শহরের এই অংশে।

আরও পড়ুন: ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : ব্লুবেরি মাফিন
যখন স্ট্রিটকার পথের শেষে এসে পৌঁছয়, তখন চালক ভদ্রলোক গিয়ে বসেন ল্যাজের দিকের আসনে। কাঠের চেয়ারগুলোকে খুব সহজভাবেই উল্টো করে সামনের দিকটা পেছনদিক করে দেওয়া যায়। হঠাৎ যেন মন্ত্রবলে আগা হয় পাছা আর পাছা হয় আগা।
খেয়াল করে দেখলাম এই গাড়িতে কোনো ব্যাক করার ব্যবস্থা নেই। গাড়ির দুই প্রান্তেই চালকের আসন রয়েছে। যখন স্ট্রিটকার পথের শেষে এসে পৌঁছয়, তখন চালক ভদ্রলোক গিয়ে বসেন ল্যাজের দিকের আসনে। কাঠের চেয়ারগুলোকে খুব সহজভাবেই উল্টো করে সামনের দিকটা পেছনদিক করে দেওয়া যায়। হঠাৎ যেন মন্ত্রবলে আগা হয় পাছা আর পাছা হয় আগা। আমিও খুবই চমকে গিয়ে তাড়াতাড়ি উল্টো হয়ে বসলাম কারণ, এটাই এখন সোজা মুখ। পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নাও ঝটপট ঝটপট। তাল মিলিয়ে নাও ফটাফট ফটাফট। ইচ্ছেগাড়ি আবার উল্টো মুখে চলতে শুরু করল। এইভাবে অনেকক্ষণ ধরে আস্তে সুস্থে অনুভব করলাম একটা গোটা শহর। সন্ধে ঘনালো টাম্পা বন্দরে। পড়ন্ত সূর্যের সোনারং ছলকে উঠলো হলুদ রঙের ইচ্ছেগাড়িতে।
“সকল প্রতাপ হলো প্রায় অবসিত
জ্বালাহীন হৃদয়ের একান্ত নিভৃতে
কিছু মায়া রয়ে গেল দিনান্তের
শুধু এই…”
ক্রমশ…
*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হবে বঙ্গদর্শনে।

