ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : ব্লুবেরি মাফিন

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ২

গত হপ্তায় তোমাদের লিখেছিলাম হাফ হাত জামার দিনের কথা। এক ভীষণ শৈত্য অতিক্রম করে বসন্তের পথে এগোচ্ছিল আমাদের জাহাজ টি. এস. কেনেডি। জাহাজ যাচ্ছিল ফ্লোরিডার ট্যাম্পা বন্দর অভিমুখে। আমি উদগ্রীব হয়ে ছিলাম জীবনে প্রথম ডিজনিল্যান্ড দেখবো বলে। তা  সে সব কথা বলতে বলতে আমাদের জাহাজের কয়েকটা টুকরো ছবি সাজিয়েছিলাম। সেই লেখায় ছিল আমাদের জাহাজের পাকা রাঁধুনির কথা। স্মৃতির ঢেউ মন পবনের নাওকে কখন কোন দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়… তার কি কোনো ঠিক আছে? তাই ভাবলাম আজকের লেখায় তোমাদের সঙ্গে সেই পাকা রাঁধুনির সঙ্গে ভালো করে পরিচয় করিয়ে দিই। ডিজনিল্যান্ড তো আর কোথাও পালিয়ে যাচ্ছেনা। তার কথাও লিখবো বৈকি।

আমাদের জাহাজের পর্তুগীজ (Portuguese) রাঁধুনি যুভেন্তিনো ওরফে যুভি নিশাচর। জাহাজের সকলে যখন রাতের খাওয়া সেরে, মুখ ধুয়ে, শিয়রের কাছে পোর্ট হোলের পর্দা টেনে দিয়ে ঢেউয়ের দোলায় দুলতে দুলতে ঘুমের দেশে বেড়াতে যায়… ঠিক সেই সময় যুভি ঘুম থেকে ওঠে। প্রথমেই বেশ কড়া এক কাপ কফি (Coffee) বানিয়ে মেসের চেয়ারে বসে সে রাতের রান্নার ছক কষে নেয়। এখানে বলে নিই যে যুভি আমাদের জাহাজের বেকার। সে ডাল, ভাত, বাটি চচ্চড়ি রেঁধে হাত পোড়ায় না। তার কাজ হল ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ৭০০ মানুষের জন্য নানারকম পাউরুটি, ক্রিম ঠাসা কেক, চকোলেট বোঝাই ব্রাউনি, কুকিজ ইত্যাদি নানারকম অখাদ্য কুখাদ্য তৈরি করা। সারাদিন রান্নাঘর রাঁধুনির ভিড়ে বোঝাই। এই সময়গুলোতে যুভি নিপাত্তা। সে হল পাকশালের সূক্ষ্ম কারিগর। মুশকো, ঘেমো, রাবণের গুষ্টির তিন বেলা খাবার যোগানদারের ভিড়ে তাকে পাওয়া যাবে না। সে রান্না কি চাট্টিখানি কথা? সকাল ৬টা থেকে ৮টা প্রাতঃরাশের ধুন্ধুমার। প্রায় দশজন রাঁধুনি ডিম, সসেজ, বেকন, পরিজ, কর্নফ্লেক, কাটা ফল নিয়ে হিমশিম খায়। বেলা ১১টা থেকে ১টা চলে দ্বিপ্রাহরিক ক্ষুন্নিবৃত্তি। আবার বিকেল ৫টা থেকে ৭টা অব্দি চলে রাতের ভোজ। দুরকম আমিষ, ভাত, রুটি, দুরকম নিরামিষ, একরকম স্যুপ আর নানারকম ঘাসপাতা ওরফে স্যালাড। তবে আশ্চর্যের বিষয় এই যে – জাহাজে হপ্তা দুয়েক কাটাবার পরে সব খাবারই কেমন যেন ঢেঁড়স সেদ্ধর মতোই ঠেকে।

কেবল… আমাদের দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল পর্তুগালের (Portugal) যুভি জানিবেন… সে আসে সন্তর্পনে, নিভৃতচরণে গহীন রাতের স্বপ্নের মতো… সে না থাকলে দুটো মাস জাহাজে কেমন করে জীবনধারণ করতাম কে জানে… সারারাত ধরে সে আমাদের জন্য নলেন গুড়ের সন্দেশ আর গরম পাটিসাপটার মতো লোভনীয় সব মিষ্টান্ন তৈরি করে… প্রতিদিন আমাদের লক্ষ্য থাকে যুভির মিষ্টির ট্রের দিকে… কোনোদিন চকলেট কেক… খেলে মনে হয় আজ জন্মদিন বুঝি… কখনো মাখনে মোলায়েম ক্রয়স… ‘মুখে দিলে গলে যায় আহারে কি পুষ্টি’… আবার কোনোদিন চিজ কেক… তার ওপরে স্ট্রবেরি সাজানো… আহা মধু মধু… মনে হয় যেন কিনু গোয়ালার গলির বাঁশির আওয়াজ শুনছি…

কেবল… আমাদের দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল পর্তুগালের যুভি জানিবেন… সে আসে সন্তর্পনে, নিভৃতচরণে গহীন রাতের স্বপ্নের মতো… সে না থাকলে দুটো মাস জাহাজে কেমন করে জীবনধারণ করতাম কে জানে… সারারাত ধরে সে আমাদের জন্য নলেন গুড়ের সন্দেশ আর গরম পাটিসাপটার মতো লোভনীয় সব মিষ্টান্ন তৈরি করে…

“হঠাৎ খবর পাই মনে
আকবর বাদশার সঙ্গে
হরিপদ কেরানীর কোনো ভেদ নেই।
বাঁশির করুন ডাক বেয়ে
ছেঁড়া ছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে
এক বৈকুন্ঠের দিকে…”

তবে যুভি যেটা মারাত্মক ভালো বানায় তা হল ব্লুবেরি মাফিন। নরম ফুলো তুলোর বলের মতো মাফিনের ভেতরে থাকে মিষ্টি ডাঁসা ব্লুবেরি (Blueberry)। আভেনের গরমে তার কয়েকটি ফেটে গিয়ে মাফিনের মাখনের সঙ্গে মিলে মিশে যাকে বলে বেন্দাবনের হরিখেলা। যেদিন খবর পাই যে আজ মিষ্টির ট্রেতে ব্লুবেরি মাফিন রয়েছে সেদিন যে একটু ঘনঘন চা তেষ্টা পায়, তা বলাই বাহুল্য। রাতে যুভির যোগানদারের নাম হল হোয়াং লি। সে এসেছে ভিয়েতনাম (Vietnam) থেকে। একজন বঙ্গ ললনাকে অতলান্তিক মহাসাগরের বুকে, জলে ভাসতে ভাসতে, ব্লুবেরি মাফিন তৈরি করে খাওয়াবার জন্য সুদূর পর্তুগাল ও ভিয়েতনাম থেকে দুটি মানুষকে সংগ্রহ করে চিত্রনাট্য লেখার বুকের পাটা বোধহয় একমাত্র বিধাতাপুরুষেরই আছে।

রাতে যুভির প্রথম কাজ হল সকলের জন্য পাউরুটি বানানো। বস্তা বস্তা ময়দা দলাই মলাই হয় বিশাল মেশিনে… সেগুলি য়ীস্ট এ হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ঐরাবতাকার হলে যুভি চমৎকার নিখুঁত আন্দাজে এক এক পাউন্ডের রুটির অনুপাতে ওজন করে আভেনে বেক করতে দেয়। গরম রুটির গন্ধে সারা জাহাজ গভীর রাতে চনমন করে। রুটি হতে হতে পরবর্তী কিস্তির আয়োজন চলতে থাকে… কেক, পাই, ডোনাট অথবা দেবভোগ্য ব্লুবেরি মাফিন… ভোরের আলো ফোটবার উপক্রম হলে জাহাজের লাউডস্পিকারে শুনতে পাই ‘Reveille, lights on in all public spaces’… খানিকটা ওঠো শিশু মুখ ধোও, পরে নিজ বেশ গোছের সূচনা… আমি ঘুম থেকে উঠে বিছানায় শুয়ে খানিকক্ষণ ইহকাল পরকালের চিন্তা করি… তারপর ইলেকট্রিক কেটলিতে চা বসাই… যুভি ঠিক এই সময়টায় ঘুমোতে যায়… তাই যুভির সঙ্গে আমার তেমন দেখা সাক্ষাৎ হয় না বটে… তবে ওর স্নেহ স্পর্শ রোজ পাই যত্নে সাজানো মিষ্টির ট্রেতে।

যুভিকে কেবল দেখতে পাই ফায়ার এন্ড বোট ড্রিলের সময়। হপ্তায় একবার ঠিক বিকেল ৪টের সময় ড্রিল হয়। জাহাজের ভেঁপুতে বেজে ওঠে বিপদ সংকেত। অমনি সকলকে লাইফ জ্যাকেট পরে পৌঁছে যেতে হয় লাইফ বোটের সামনে। এটি হচ্ছে বিপদকালীন প্রস্তুতির মহড়া। সেখানে সারারাত জেগে থাকা যুভিকেও হাজিরা দিতে হয় যথানিয়মে। বিপদ তো আর রন্ধনশালার শিল্পস্রষ্টাকে ছেড়ে কথা কইবে না। আমি হলাম লাইফ বোট ১-এর খাজাঞ্চি (Mustering Officer)। আমার কাজ হল, লিষ্টি মিলিয়ে চিল চিৎকার করে সকলের নাম ডেকে তাদের লাইফবোটে তোলা। মাঝসমুদ্রে ঢেউয়ের গর্জন, দমকা বাতাসের আর্তনাদ অতিক্রম করে সেই চিৎকার পৌঁছনো চাই প্রত্যেকের কর্ণকুহরে। কোনো ব্যাটাকে খুঁজে না পাওয়া গেলে তক্ষুনি কাপ্তেনকে জানানো আমার দায়িত্ব। যথাক্রমে ‘যুভেন্তিনো’ বলে বিকট চিৎকার করলে যে মানুষটি ‘উপস্থিত’ বলে জানান দেয় সে হল ভারী নরম সরম, ফর্সা, চকচকে টাকমাথা, চশমা পরা একজন ছোটো খাটো গোবেচারা ভদ্রলোক। সদ্য নিদ্রাভঙ্গের চিহ্ন তার চোখেমুখে… যেন সারারাত রতিক্রীড়ায় শ্রান্ত গোপিনী।

হঠাৎ সেদিন ফায়ার এন্ড বোট ড্রিলের সময় এক কেলেঙ্কারি। আমি যথারীতি ‘যুভেন্তিনো’ বলে বাজখাঁই ডাক ছেড়েছি… অপরদিকে কোনো সাড়াশব্দ নেই… হঠাৎ দেখি যুভি ভিরমি খেয়েছে। দেয়ালের এক পাশে একটা গুলের বস্তার মতো কেতরে পরে আছে। সারারাত ধরে ব্লুবেরি মাফিন (Blueberry Muffin) বানানোর ধকল… কাঁচা ঘুম থেকে উঠে প্রচণ্ড রোদে অতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা আর আমার অমন বজ্রনির্ঘোষ পলকা শরীরে সইবে কেন? ব্যাস! অমনি ড্রিল ভন্ডুল…! তখন কোথায় ডাক্তার কোথায় স্ট্রেচার কোথায় জলের ছিটে… সকলে মহাব্যস্ত হয়ে সাংঘাতিক গণ্ডগোল শুরু করে দিল। বুঝলাম জাহাজে কোনোদিন সত্যিকার বিপদ ঘটলে আমাদের সদলবলে সলিল সমাধি কেউ রুখতে পারবে না।

তা একবার সফরে জানলাম যে আমাদের জাহাজ কুরাসাও যাবার পথে হাইতির এক দ্বীপে কিছু ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেবে। এমনটি এর আগে কখনো ঘটেনি। দ্বীপের নাম ইলে আভাসে (Île à Vache)। হাইতির দক্ষিণ পশ্চিমে এই ক্ষুদে দ্বীপটি লম্বায় ৮ মাইল আর চওড়ায় ২ মাইল। অপূর্ব সুন্দর এই দ্বীপটিতে প্রায় ১০.০০০ মানুষের বাস। এই দ্বীপেই নাকি কুখ্যাত জলদস্যু হেনরি মরগ্যান তার বিশিষ্ট অপকর্মপ্রসূত ধনভান্ডার লুকিয়ে রাখতেন। তার নামেই নাকি প্রখ্যাত ক্যাপ্টেন মরগ্যান রাম। ভাগ্যের ফেরে এই দ্বীপটির এখন নিতান্ত দৈন্য দশা। সে মরগ্যান সাহেবও নেই আর সেই মনিমানিক্যও নেই। গোদের ওপরে বিস্ফোরক একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পে এই দ্বীপের বর্তমান অবস্থা নরকতুল্য। রাস্তাঘাট নামেমাত্র, বাড়িঘর ধসে পড়েছে, পানীয় জল অপ্রতুল। সিস্টার ফ্লোরা নামে এক ফরাসী ধর্মযাজিকা এখানে একটি অনাথালয় চালান। আমাদের জাহাজ যেহেতু খানিকটা কাছ দিয়েই কুরাসাও যাবে তাই স্থির হয়েছিল যে কিছু ত্রাণসামগ্রী আমরা দ্বীপটিতে পৌঁছে দিয়ে যাব। কিছু ছাত্র শিক্ষক নিজেরা অগ্রণী হয়ে বেশ কিছু জিনিসপত্রে জাহাজের একটি হোল্ড বোঝাই করেছে। সেখানে রয়েছে একটা কাঠচেরাই কল, অনেকগুলি সাইকেল, প্রচুর জামাকাপড়, ওষুধপত্র, প্লাস্টিকের চেয়ার টেবিল, নানারকম যন্ত্রপাতি ইত্যাদি প্রভৃতি।

দ্বীপের নাম ইলে আভাসে (Île à Vache)। হাইতির দক্ষিণ পশ্চিমে এই ক্ষুদে দ্বীপটি লম্বায় ৮ মাইল আর চওড়ায় ২ মাইল। অপূর্ব সুন্দর এই দ্বীপটিতে প্রায় ১০.০০০ মানুষের বাস। এই দ্বীপেই নাকি কুখ্যাত জলদস্যু হেনরি মরগ্যান তার বিশিষ্ট অপকর্মপ্রসূত ধনভান্ডার লুকিয়ে রাখতেন।

যেহেতু দ্বীপটিতে কোনো বন্দর নেই সেহেতু আমাদের বিশাল জাহাজ মাঝদরিয়া থেকে কীভাবে এসব জিনিসপত্তর ইলে আভাসের মানুষদের কাছে পৌঁছবে, সেটা নিয়ে জাহাজে প্রচুর জল্পনা কল্পনা চলছিল। সবজান্তা দুলিরামরা বিনা টিকিটে পৃথিবীর সর্বত্র ভ্রাম্যমাণ। আমাদের জাহাজেও তারা নিত্যসঙ্গী। অনেকেই প্রথম থেকে এই প্রচেষ্টায় বিফলতার গাধার মুকুট পরিয়ে রেখেছিল। “আরে ছোহ! ভারী তো ত্রাণ… যত্ত বাজে সময় নষ্ট আর তেল খরচা। জাহাজ থেকে নামাতে পারলেও ওসব কিসুই গরিব মানুষের কাছে পৌঁছবে না… বারো ভূতে লুটে পুটে খাবে…” এইরকম আশাব্যঞ্জক আলোচনায় রোজ খাবার ঘর সরগরম।

যাই হোক অবশেষে নির্দিষ্ট দিনটিতে আমরা দ্বীপের খানিকটা দূরে নোঙর ফেললাম। হাইতির জলসীমার অন্তর্গত হবার অনুমতি নেই আমাদের আর থাকলেও দ্বীপে কোনো বন্দর নেই। অতএব গ্রহীতাকেই উপযাচক হয়ে এগিয়ে আসতে হবে আর ত্রাণ গ্রহণ করবার বন্দোবস্ত করতে হবে। আমরা শ্রীরাধার মতো অপেক্ষমানা… দূরে দিকচক্রবালে সবুজ এক চিলতে দ্বীপ দেখা যায়… কিন্তু জনমনিষ্যির চিহ্ন নেই। এমনি ভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরে দেখলাম কয়েকটা পালতোলা খোলামকুচির মতো ডিঙি নৌকা ঢেউয়ের সঙ্গে ধুন্ধুমার যুদ্ধ করতে করতে আমাদের দিকে ভেসে আসছে। বহু কষ্টে তারা আমাদের জাহাজের কাছাকাছি এলেও পাহাড়প্রমাণ ঢেউয়ের তাড়নায় আবার তাদের আশাহত হয়ে ফিরে যেতে হল। ওই ডিঙিতে কাঠ চেড়াই কল তো দূরের কথা, একটা প্লাস্টিকের চেয়ার নামানোও সম্ভব হল না। কাপ্তেন জানালেন যে ওদের আর ২৪ ঘণ্টা সময় দেওয়া হবে। তার মধ্যে ব্যবস্থা করতে না পারলে আমাদের তল্পিতল্পা নিয়েই চলে যেতে হবে, তা নইলে আমরা ঠিক সময়ে কুরাসাও-এর নির্ধারিত বার্থে জায়গা পাব না। সেদিন ডিনারে দুলিরামেরা যে প্রচণ্ড নেতিবাচক আস্ফালন করেছিল তা বলাই বাহুল্য। ঘুমোতে যাবার সময় বিছানায় গুটিসুটি হয়ে বারবার বলছিলাম ‘ঠাকুর ইলে আভাসের মানুষদের হেনরি মর্গানের পালতোলা দস্যু জাহাজের মতো একটা শক্তপোক্ত জলযানের ব্যবস্থা করে দাও গো… ওরা যেন একটা কাঠ চেড়াই কল, অনেকগুলি সাইকেল, প্রচুর জামাকাপড়, ওষুধপত্র, প্লাস্টিকের চেয়ার টেবিল, নানারকম যন্ত্রপাতির মতো মনিমানিক্য দিয়ে আবার ওদের দ্বীপ সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে পারে’। ভদ্রলোক কচ্চিত কদাচিৎ আমার কথা রাখেন বটে…

পরদিন সকাল দশটা নাগাদ দেখি দ্বীপ থেকে একটা মোটর বোট আমাদের জাহাজের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। আগের দিন সেটি কোথায় ছিল ঠিক জানি না। তারপরে বেশ কয়েক ঘণ্টা কসরত করে সেটি কোনোরকমে আমাদের জাহাজের সঙ্গে দড়িদড়া দিয়ে সাতান্ন পাকে বাঁধা পড়ল… ঠিক মনে হচ্ছিল এক বিশাল হস্তিনীর পেটে একটি ইঁদুরছানা আটকানো রয়েছে। বোটে জনা সাতেক অসমসাহসী বাদামী মানুষ… প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেপরোয়া… আমাদের জাহাজের ক্রেনের সাহায্যে একে একে নামানো হল একটা কাঠ চেড়াই কল, অনেকগুলি সাইকেল, প্রচুর জামাকাপড়, ওষুধপত্র, প্লাস্টিকের চেয়ার টেবিল, নানারকম যন্ত্রপাতি… এটি লিখতে এক মিনিট… কর্মে ৫ ঘণ্টা। মোটর বোটের মানুষগুলো সাংঘাতিক পরিশ্রান্ত কিন্তু কি অসম্ভব পরিশ্রমী তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না… বোটে আমাদের কলেজের দুটি ছেলেও ছিল… তারা দ্বীপে কয়েকদিন বসবাস করে সব জিনিসপত্র বুঝিয়ে দেবে।

এক ছুটে কেবিনে এলাম। আমার একটা বড়ো লাল রঙের সিন্থেটিক লন্ড্রি ব্যাগ ছিল। ওতে করে অপরিষ্কার জামাকাপড় জাহাজের লন্ড্রিতে কাচতে নিয়ে যাই। ওই ব্যাগটা আর অনেকগুলি ব্রাউন পেপারের ঠোঙা নিয়ে চটপট খাবার ঘরে। দেখি কেউ কোথাও নেই। দুলিরাম, নিধিরামেরা সব ত্রাণব্যবস্থা তদারকি করছেন। যুভির মিষ্টির ট্রেতে থরে থরে সাজানো পশমের মত তুলতুলে টাটকা ব্লুবেরি মাফিন। আমি প্রায় গোটা পঁচিশেক মাফিন ব্রাউন পেপারের ঠোঙায় ভরে সেগুলো লাল লন্ড্রি ব্যাগে চালান করলাম। সঙ্গে দিলাম অনেকগুলি বিস্কুট আর বেশ কয়েক বোতল ঠান্ডা পানীয় আর জল। তারপরে সেই লাল গন্ধমাদনটি বয়ে নিয়ে গেলাম এক তদারকি দুলিরামের কাছে। বললাম এতে নৌকোর মানুষদের জন্য কিছু জিনিসপত্র আছে… একটা দড়ি বেঁধে ব্যাগটা নামিয়ে দিলে বিশেষ কৃতজ্ঞ থাকব। যে কথা সেই কাজ। দুলিরাম ব্যাগ নামিয়ে দিয়ে অন্য কাজে গেল। লাল গন্ধমাদন পৌঁছল বাদামী মানুষগুলোর কাছে। তাদের কয়েকজন তখন নৌকোর খোলে বসে একটু জিরোচ্ছিলো। দেখলাম ব্যাগ খোলা হল… প্রথমেই কয়েকটা ঠান্ডা পানীয় আর জল শেষ… ধরে প্রাণ যেন… তারপরে ব্রাউন পেপারের ঠোঙা থেকে পশমের মত তুলতুলে টাটকা ব্লুবেরি মাফিন…  একটা… আরও একটা… আরও একটা… আমি দূর থেকে চোখ ভরে… প্রাণ ভরে দেখলাম…

ইলে আভাসে দ্বীপে ব্লুবেরি ফলে না…  সে ফলের জমি জিরেত, আবহাওয়া, ফলনের কায়দা সবই ভিনদেশী… বাদামী মানুষগুলো খুব অবাক চোখে নরম তুলতুলে মাফিনের ভেতরের নীল ফলগুলি হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল… ঘড়িতে প্রায় বিকেল চারটে… যুভেন্তিনো নিজের কেবিনে ঘুমে অচেতন… তবু যেন তার আবছা নরম গলাটা একবার শুনতে পেলাম… 

‘উপস্থিত’…

ক্রমশ…

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার প্রকাশিত হবে বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia