স্মৃতি-বেদনাতুর নয়, মৃত্যুদিনে উদযাপিত হবেন মায়েস্ত্রো বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

১ম বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত চলচ্চিত্র ও কবিতা উৎসব ২০২৩

’বাঘ বাহাদুর’ ছবির দৃশ্য

“যখন তাকিয়ে থাকি, তোমার হাত দুটোকে মনে হয় ডানা।/ যখন তাকিয়ে থাকি আমার পায়ের দিকে/ বেঁকে, পাখার মতো ছড়িয়ে যায় পা।/ আর মাথার ওপর দিয়ে কেবলই উড়ে যায় একটা উড়ো-জাহাজ,/ তার নিচে, মশারির ভেতর, আমাদের স্বপ্নরাও চায় উড়ে যেতে,/ শেষে নেমে যায় নিচে খাটের তলার আবছায়া অন্ধকারে ঘাড় গুঁজে/ উড়ো-জাহাজের গর গর উড়ে যাওয়ার শব্দ শোনে সারারাত।” (‘উড়ো-জাহাজ’, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত)

ছবি সৌজন্যেঃ বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত মেমোরিয়াল ট্রাস্ট

এই উৎসবে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের যে ছবিগুলো দেখানো হবে, সেগুলোই কেন নির্বাচিত হল? সোহিনী দাশগুপ্ত জানাচ্ছেন, “অপেক্ষাকৃত কম দেখা ছবিগুলোই রাখতে চেয়েছি আমরা। তাছাড়া ‘বাঘ বাহাদুর’ও অনেক বছর পর বড়োপর্দায় দেখানো হচ্ছে। আর বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ১৩টি ছোটোছবি, যেগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা অবলম্বনে নির্মিত, সেগুলিও খুব বেশি মানুষ জানেন না, অথচ সবকটি ছবিই যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই মনোগ্রাহী

উড়ে যাওয়ার এই শব্দকে আজীবন লালন করেছেন বুদ্ধদেব। যাঁরা ‘উড়োজাহাজ’ দেখেছেন, বুঝতে পারবেন এই কবিতার সঙ্গে সিনেমাটির সাযুজ্য। কবি বুদ্ধদেব কীভাবে পরিচালক বুদ্ধদেবের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন, তার খানিকটা আন্দাজ তো পাওয়া যায়ই। পর্দায় ‘উড়োজাহাজ’ (২০১৯) মুক্তি পাওয়ার বহু আগেই ‘হিমযুগ’ (১৯৫৭) কাব্যগ্রন্থে ‘উড়ো-জাহাজ’ নির্মাণ করেছিলেন তিনি। কবিতা বাদ দিয়ে তাঁকে বা তাঁর সিনেমা কল্পনাতীত। সেকারণেই বোধহয় ভারত তথা বাংলায় প্রথমবার এত বড়ো পরিসরে উদযাপিত হতে চলেছে ‘১ম বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত চলচ্চিত্র ও কবিতা উৎসব ২০২৩’ (1st Buddhadeb Dasgupta Film & poetry Festival)। আয়োজক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত মেমোরিয়াল ট্রাস্ট (প্রতিষ্ঠাতা সোহিনী দাশগুপ্ত)। সহযোগিতায় সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট (SRFTI) এবং ফোরাম ফর ফিল্ম স্টাডিজ ও অ্যালাএড আর্টস।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত মেমোরিয়াল ট্রাস্ট-এর পথ চলা শুরু হয়েছে বুদ্ধদেব চলে যাওয়ার পর। ট্রাস্ট-এর পক্ষ থেকে ২০২২ সালে পরপর দুটি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল। অল্প পরিসরে সেগুলিই ছিল তাঁদের প্রথম উদ্যোগ। এই উৎসব নিয়ে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে লিখিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে “জুন (১০ জুন) তাঁর চলে যাওয়ার মাস। কিন্তু স্মৃতিবেদনাতুর হতে চাই না আমরা, বরং উৎসবের দুই দিন কাটুক সৃজনশীলতায়, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে।” 

‘টোপ’ ছবির শুটিং চলাকালীন

বিবৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত মেমোরিয়াল ট্রাস্ট উদযাপন করতে চলেছে ভারতীয় চলচ্চিত্র ও কবিতার সম্ভার। কবিতার মতোই বুদ্ধদেবের ছবিতে বরাবর প্রাধান্য পেয়েছে শব্দ। উল্লেখ্য, প্রথম বছরের এই উৎসবে জীবনকৃতি সম্মানে ভূষিত হবেন তাঁর ছবির শব্দ-কারিগর, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত সাউন্ড ডিজাইনার অনুপ মুখোপাধ্যায় (চলচ্চিত্র) এবং প্রখ্যাত কবি দেবারতি মিত্র (কবিতা)। এই উৎসবে ২য় বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত মেমোরিয়াল লেকচার দেবেন কুমার শাহানি। বিষয়- ভাষা ও উপমা (‘Language and Metaphors’)। এছাড়াও দুইদিনের এই উৎসবে উপস্থিত থাকবেন বিশিষ্ট অতিথিরা। উৎসবে থাকছে সাউন্ড ডিজাইনার অনুপ মুখোপাধ্যায়ের একটি মাস্টারক্লাস, উৎসবটি শুরু হবে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবি ‘কৃষ্ণকলি ও বাঁশি’ (রবীন্দ্রনাথের কবিতা অবলম্বনে)-এর মধ্যে দিয়ে, এছাড়াও প্রদর্শিত হবে বুদ্ধদেবের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি ‘বাঘ বাহাদুর’ (১৯৮৯)। দেখানো হবে জি অরবিন্দনের মালায়ালাম ক্লাসিক ছবি ‘কুমাট্টি’ (১৯৭৯), যা গত বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবের হোমেজ বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছিল। 

 

এই উৎসবে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের যে ছবিগুলো দেখানো হবে, সেগুলোই কেন নির্বাচিত হল? সোহিনী দাশগুপ্ত জানাচ্ছেন, “অপেক্ষাকৃত কম দেখা ছবিগুলোই রাখতে চেয়েছি আমরা। তাছাড়া ‘বাঘ বাহাদুর’ও অনেক বছর পর বড়োপর্দায় দেখানো হচ্ছে। আর বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ১৩টি ছোটোছবি, যেগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা অবলম্বনে নির্মিত, সেগুলিও খুব বেশি মানুষ জানেন না, অথচ সবকটি ছবিই যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই মনোগ্রাহী। উৎসবে যে ছবিগুলো আছে, সবগুলোর ভাষাতেই আশ্চর্য কাব্যময়তা রয়েছে, সাধারণত সিনেমার গল্প বলার টেকনিক থেকে যা আলাদা।”  

‘উড়োজাহাজ’ ছবির দৃশ্য

‘পারফরম্যান্স পোয়েট্রি’ এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। পরিবেশন করবেন শ্রীকান্ত আচার্য (বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কবিতা পড়বেন), ব্রততী বন্দোপাধ্যায় (দেবারতি মিত্রের কবিতা পড়বেন) এবং সুজয়প্রসাদ চ্যাটার্জি (কথোপকথন ও পরিবেশনা)। এছাড়াও এই সময়ের মহিলা কবিদের অধিবেশনে কথোপকথন ও কবিতা পাঠে উপস্থিত থাকবেন বাংলা ভাষার কবি সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইংরেজি ভাষার কবি শর্মিলা রায় এবং ইউক্রেনের কবি ইরিনা ভিকিরচাক। ইরিনা পড়বেন যুদ্ধবিরোধী কবিতা। এই যে দেবারতি মিত্র এবং মহিলা কবিদের ‘সেলিব্রেট’ করা হবে উৎসবে, এর নেপথ্যে কি বিশেষ কোনও কারণ আছে? “মহিলা কবিদের কথা, তাঁদের লেখা, তাঁদের ভাবনা, তাঁদের কবিতা লেখার গল্প, জীবনের গল্প শোনা ও বোঝার জন্যই এই ‘ফোকাস’ বিভাগের সবটুকু ফোকাস এই সময়ের মহিলা কবিদের ওপর। বহু যুগ যাবৎ যে কোনো ক্ষেত্রেই মেয়েদের কাজ, ভাবনা, কর্মজীবন উপেক্ষিত। আর তাই সারা পৃথিবী জুড়েই এই সময়ে এই বিশেষ আলোকপাত তাদের কাজের ওপর।” বলেন সোহিনী।

 

বুদ্ধদেবের ছোটোবেলা কেটেছে পুরুলিয়ার পলাশ ও পুটুসের সান্নিধ্যে। ফলে, পুরুলিয়ার গ্রামবাংলা তাঁর সিনেমায় অন্য রূপ পেয়েছে। ছৌ ঝুমুরের গতিশীল এবং সর্বাত্মক প্রয়োগ তাঁর শিল্পে ও নির্মাণে এমনভাবে ফুটে উঠেছে যা পুরুলিয়ার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে চিনতে শেখায়। শুধু পুরুলিয়া নয়, বাংলা এবং বৃহত্তর বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার নির্যাস তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। ‘দূরত্ব’ (১৯৭৮) থেকে ‘উড়োজাহাজ’ (২০১৯) – মানুষের জীবনচর্চাই হয়ে উঠেছে তাঁর ভাবনার আশ্রয়। তাঁর শিল্পের মূলবিন্দু। ‘উত্তরা’ (২০০০) ও ‘স্বপ্নের দিন’ (২০০৪) ছবির জন্য সেরা পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়া তাঁর ৫টি ছবি সেরা চলচ্চিত্রের শিরোপা পেয়েছিল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রতিযোগিতায়। বাংলার সেরা ফিচার ফিল্মের জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে তাঁর আরও দুটি ছবি—‘দুরত্ব’ (১৯৭৮) এবং ‘তাহাদের কথা’ (১৯৯২)। লিখেছেন ‘গভীর আড়ালে’, ‘কফিন কিম্বা সুটকেস’, ‘রোবটের গান’-এর মতো কাব্যগ্রন্থ। তাঁর সৃষ্টির হাত ধরেই বাংলা চলচ্চিত্র পৌঁছে গিয়েছিল ভেনিস, বার্লিন, লোকার্নো, দামাস্কাসের মতো জায়গায়। অথচ, মনে প্রশ্ন জাগে, এদেশে এরকম একজন কবি-পরিচালককে নিয়ে বড়ো পরিসরে উদযাপন চোখে পড়ে না কেন? শুধুমাত্র নগরজীবন নয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের প্রান্তিক, ধূসর, পুরোনো, বাতিলদের কথা আজীবন আউড়ে গেছেন, তাই? নাকি, রাষ্ট্র বা ‘সিস্টেম’-কে বারবার প্রশ্ন করে, প্রতিবাদী স্বরে নিজস্ব সিনেমা-দর্শন নির্মাণ করেছিলেন বলে? উত্তর আমাদের জানা নেই। শুধু প্রশ্ন থাকে, থেকে যায়। যেভাবে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আছেন।

উল্লেখ্য, আগামী ৯ ও ১০ জুন এই উৎসবটি চলবে সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউটের মূল প্রেক্ষাগৃহে। ৯ তারিখ শুরু হবে দুপুর দুটো থেকে এবং ১০ তারিখ সকাল ১১টা থেকে। প্রবেশ অবাধ। 

Developed by DXDasia