
মায়েস্ত্রো বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে নিয়ে লিখছেন তাঁর সহকর্মী সোহিনী দাশগুপ্ত
– তুমি যদি ফিল্মমেকার না হতে, তাহলে তুমি কী হতে?
– ফিল্মমেকার
– আহা যদি ফিল্মমেকার না হতে, তাহলে কী হতে? মানে, পরের পছন্দ?
– ফিল্মমেকার
– …তারপরের পছন্দ?
– ফিল্মমেকার
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত যেদিন চলে গেলেন তার দিন তিনেক আগের কথা, খুব অসুস্থ, দাঁড়াতে পারছেন না, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, নাকে অক্সিজেনের নল… না, তাঁর অসুস্থতার কথা বলতে বসিনি আজ, অসুস্থতা এমন কিছু নতুন ব্যাপার না আমাদের সবার বছর পাল্টে চলা ক্যালেন্ডারে। যে কথা নতুন তাই বলতে চাই আজ, রেসুল পুকুট্টি ফোন করলেন বুদ্ধদার কথা জানতে চেয়ে, প্রায়ই করতেন। বুদ্ধদা রেসুলকে বলতে বললেন যে, ওঁর কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে, মেসেজ করবে। যে মেসেজ করলেন বুদ্ধদা, তা অনেকটা এইরকম, “আমরা আবার একসঙ্গে কাজ করব ভাই রেসুল। আমার শরীর বেশ খারাপ, ঠিক জানি না কবে কাজ করব আবার, কীভাবে করব, তবে একজন ফিল্ম ডিরেক্টর সারাক্ষণ বোধহয় সিনেমা নিয়েই ভেবে চলে। শেষ দিন অবধি অন্য কোনো কিছু নিয়ে ভাবতে পারে না। আমারও মাথার মধ্যে প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন দৃশ্যকল্প তৈরি হয়ে চলেছে, কতরকম শব্দকল্প গড়ে উঠছে, নতুন ভাবে গল্প বলার ইচ্ছেরা ব্যস্ত হয়ে উঠছে…”। মেসেজটা দেখার পর প্রশ্ন না করে পারিনি, অবিশ্বাস না করে পারিনি। যে মানুষ শ্বাসটুকু টানছে কোনোক্রমে, সে কী করে ভাবছে একদিন সে আবার নতুন করে গল্প বলবে সিনেমায়, বেঁচে থাকার চেয়ে বড়ো ইচ্ছে আর কীই বা হতে পারে! বিশেষত এই মুহূর্তে যখন জীবন একটু একটু করে গলে যাচ্ছে হাতের তালু থেকে। জিজ্ঞেস করলাম, সত্যি বুদ্ধদা? যা লিখলে সেসব সত্যিই?
বুদ্ধদেব-সোহিনী
বুদ্ধদা হেসেছিল অদ্ভুতভাবে, যে হাসির মানে “এর চেয়ে বড়ো সত্যি আর হয় না, সোহিনী। তুমি তো জানো, জানো না?” অসুস্থতার গল্প না, মৃত্যুর গল্প না, বুদ্ধদেব এক আশ্চর্য স্বপ্নের গল্প, স্বপ্নকে যে ছাড়তে পারেনি কখনও আর স্বপ্নও যাকে ছেড়ে যায়নি শেষতক। এই যে নিজের নিভৃত এক সমান্তরাল অন্য দুনিয়া – যে জগৎ তার সিনেমায় তার কবিতায়; সেই পৃথিবীই বুদ্ধদেবের নিজের পৃথিবী, বিশ্বাসের পৃথিবী। সমাজ সংসারে সেই জগৎ কল্পনির্ভর, কিন্তু বুদ্ধদেবের কাছে সেটাই ঘোর বাস্তব, আর ‘আসল’ বাস্তবটা এমনি-এমনি!
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের শেষ ছবি ‘উড়োজাহাজ’ যখন লেখা হচ্ছে, আমি বলেছিলাম অন্য ছবি ভাবো। কলকাতায় শ্যুট করা যায়, সেট নির্ভর। তখন তো ডায়ালিসিস চলছে, সপ্তাহে দু-তিন দিন যেতে হয় হাসপাতাল। পুরুলিয়া বা অন্য কোনো জায়গায় কাজ করা সম্ভব না। বুদ্ধদা করুণ ভাবে তাকিয়ে বলল, “না সোহিনী এই ছবিটাই করি। তুমি তো আছো, সামলে নিতে পারবে না?” জানতাম খুব কঠিন প্রায় মরণ-বাঁচন লড়াইয়ে নামতে চলেছি, তবু বাধা দিতে পারিনি। কী করে দেব, একজন ফিল্মমেকার হয়ে বুদ্ধদার মতো ফিল্মমেকারকে কী করে বাধা দেবো? আমরা কেউ পারিনি। ওঁর মেয়েরা, পুরো ইউনিট, এমনকি ওঁর ডাক্তাররাও।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর অফিসে ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম যেদিন, সেই বছর কুড়ি আগে, সদ্য শেষ হয়েছে ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’, পেয়েছে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার। সেদিন বুদ্ধদেব জিজ্ঞেস করেছিলেন – সিনেমার জন্য কী করতে পারবে তুমি? না খেয়ে থাকতে পারবে? রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে দিনের পর দিন, না ঘুমিয়ে থাকতে পারবে রাতের পর রাত? উত্তর দিতে বুক কেঁপেছিল, গলা কাঁপেনি, বলেছিলাম – পারব। মোদ্দা কথা, প্রথম দিনটিতেই চিত্রনির্মাতা বুঝিয়ে দিয়েছিল সিনেমাকে যদি ভালোবাসতে চাও, যদি সিনেমাকে নিয়েই ঘর বাঁধতে চাও, তাহলে মাথায় রেখ সে কিন্তু তোমাকে তিষ্ঠোতে দেবে না আজীবন। জ্বালিয়ে খাবে রাতদিন… এসব ভেবেচিন্তে যদি আসতে চাও তো এসো, ঝাঁপাও। আমরা যারা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের দল-বল তারা সবাই ঝাঁপাতে ওস্তাদ। যাকে বলে ব্লাইন্ড ফোল্ড ঝাঁপান। আমি সিটি ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ঝাঁপালাম, তার বেশ কিছু বছর পরে মলয়, কবি এবং সিনেমার পোকা এম.এস.সি মাঝপথে ছেড়ে ঝাঁপাল, আর এক-দেড় বছর পরে ধ্রুব, টালিগঞ্জের এই চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট সম্বন্ধে গুজব যে, যদি ডিরেক্টর ধ্যাড়ায় ধ্রুবজ্যোতি রক্ষিত ঠিক উতরে দেবে ছবি। ধ্রুব তো ঝাঁপিয়েছিল বিয়ে বাতিল করে। শ্যুটিং-এর মধ্যে পড়েছিল ওর বিয়ের দিন, আগে থেকে পাঁজি দেখে ঠিক করা দিন, অন্তত পাঁচদিন তো লেগেই যায় বাংলাবাজারে একটা বিয়ে করে উঠতে। ধ্রুব বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর সঙ্গে কাজ করবে বলে বিয়ে বাতিল করে দেয়, অনেক ভাগ্য করেছিল তাই পৌলমী ওকে এরপরেও বিয়ে করে! আমাদের এই ঝাঁপাঝাঁপির গুরু ছিলেন দুলাল কুমার রায়, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কার্যনির্বাহী প্রযোজক। সেই ‘দূরত্ব’-র সময় সরকারি চাকরি ছেড়ে, উচ্চপদ ও তার যাবতীয় সুখ-সুবিধে ছেড়ে বুদ্ধদেবকে ভালোবেসে, তার স্বপ্নকে ভালোবেসে ঢুকে পড়েছিলেন সিনেমাগর্ভে। বুদ্ধদা বলতেন, “যারা এক কথায় কিছু ছেড়ে দিতে পারে তাদের আমার ভালো লাগে”।
চরাচর-এ সেই স্বপ্নের উড়ান
ভালো তো লাগবেই, হঠাৎ এক সকালে উঠে সাতাশ বছর বয়সী যুবকের মনে হয়, কলেজে পড়ানোর চাকরি যদি আর বেশি দিন করে, তবে সে অভ্যস্ত হয়ে যাবে মাস মাইনের স্থিতিশীলতায়, আরামে। বয়স ভীতু করে দেয় মানুষকে, দ্বায়িত্ব সাবধানী করে দেয় পুরুষকে। হয় চাকরি ছাড়তে হবে, নয় সিনেমা বানানোর স্বপ্ন। কারণ দুটোই হবে, দুটোই থাকবে এ তো হতে পারে না। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। সটান ইস্তফা, বেডিং রোল করে দামোদর নদ পেরিয়ে শিবপুর ব্যাতাইতলায় দাশগুপ্ত বাড়িতে প্রত্যাগমন। শুনেছি বাবা কয়েকদিন কথা বলেননি রাগে, মা বলেননি কিছু, উনি জানতেন এ ছেলেটির মন আগাগোড়াই অন্য কোথা, আর কোনোখানে। তারপর শুরু হয় বুদ্ধদেবের বেদম তাড়া, স্বপ্নকে সে ধরেই ছাড়বে। বুদ্ধদেব তার প্রথম ছবিটি, স্বল্পদৈর্ঘ্যের মৌলিক ছবি, ‘সময়ের কাছে’ বানিয়েছিলেন স্টুডিওপাড়ায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন ক্যামেরাম্যান, ডিরেক্টরের কাছে ফিল্মের কাটপিস জোগাড় করে। তখন তো সেলুলয়েডের সময়। চারশো ফিট নেগেটিভের এক একটি ক্যান। শ্যুট করার পরে হয়তো কোনো ক্যানে ৬০ ফিট রিল আছে, একটি শটের জন্য যথেষ্ট নয় তা। ওই ষাট ফিট আন-এক্সপোসড ফিল্ম বাতিল হয়ে যেত। সেই কাটপিস জোগাড় করে তৈরি হয়েছিল ‘সময়ের কাছে’। যে ছবিটি একটি প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে তিন হাজার টাকা পুরস্কার জিতে নেয়। বিচারকদের মধ্যে ছিলেন মৃণাল সেন।
এই সময়ের একটি প্রিয় গল্প আমাকে অনেকবার বাঁচিয়ে তুলেছে মন-মরা ক্লান্তিকর সময়ে। স্টুডিও পাড়ায় ঘুরতে ঘুরতে বেশ কিছু বন্ধু পাতিয়েছিল বুদ্ধদেব। এর মধ্যে ছিলেন সিনিয়র এডিটর দেওজিভাই। বুদ্ধদেবকে ভালো লেগেছিল ওঁর, বাচ্চা ছেলেটা ইকনমিক্স-এ এম.এ করে, কলেজের চাকরি ছেড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সিনেমা বানানোর নেশায়। বুদ্ধদা মাঝেমধ্যেই চলে যেত দেওজিভাই-এর কাছে। বাটি-ম্যুভিওয়ালায় এডিট করতেন দেওজিভাই, সেই দেখতে দেখতে শিখতে শিখতে চলত দুই অসমবয়সী বন্ধুর কথা। এমনই একদিন, বুদ্ধদেবের মন বড়ো খারাপ। দেওজিভাই বললেন, কী হয়েছে তোমার? বুদ্ধদেব বললেন, আমি কবে সিনেমা বানাব দাদা? দেওজিভাই খুব হাসলেন, বললেন, এই কথা? তুমি রোজ বানাবে সিনেমা। আজ থেকেই। এই যে বাড়ি থেকে বেরোও হেঁটে আসো, বাস ধরো, হয়তো জায়গা পাও, হয়তো পাও না। পেলে একরকম ছবি, একরকম গল্প আবার না পেলে আরেক রকম… বাড়ি থেকে বেরনো থেকে বাড়িতে ঢোকা অবধি রোজ রোজ সিনেমা বানাও একটা করে, যা দেখছ তার থেকে চরিত্র খুঁজে বের করো, ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, লেন্স ভেবে নাও শটের, বাদ দাও এক্সট্রা শট, ভেবে নাও সুর… বানিয়ে ফেল আস্ত একটা ছবি। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট-এ পড়ার ইচ্ছে ছিল বুদ্ধদার। হয়ে ওঠেনি। যেমন হয়ে ওঠেনি আমার, আর আমার মতো আরও অনেকের। কিন্তু ক্যামেরা, এডিট, সাউন্ড, স্ক্রিপ্ট-এর এমন নিখাদ শিক্ষাই বা কম কীসে!
কালপুরুষ
‘দূরত্ব’-র সময় অনেকের সাহায্য নিয়ে, মা এবং প্রথম স্ত্রীর গয়না বন্দক দিয়ে নিজের প্রোডাকশনে ছবিটি তৈরি করে বুদ্ধদা। বুদ্ধদেব জানত এই ফাটকা যদি না খাটে, তবে শুধু দেনা শোধ করতেই আবার চাকরিতে ঢুকতে হবে তাকে, পরের সিনেমা বানানো তো অনেক দূরের গল্প। আমি জিজ্ঞেস করতাম, “ভয় করেনি তোমার?” বুদ্ধদা বলত, “ভয় যে একেবারে করেনি তা নয়, কিন্তু আমি জানতাম।”
– কী জানতে?
– যে আমি পারব।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের শেষ ছবি ‘উড়োজাহাজ’ যখন লেখা হচ্ছে, আমি বলেছিলাম অন্য ছবি ভাবো। কলকাতায় শ্যুট করা যায়, সেট নির্ভর। তখন তো ডায়ালিসিস চলছে, সপ্তাহে দু-তিন দিন যেতে হয় হাসপাতাল। পুরুলিয়া বা অন্য কোনো জায়গায় কাজ করা সম্ভব না। বুদ্ধদা করুণ ভাবে তাকিয়ে বলল, “না সোহিনী এই ছবিটাই করি। তুমি তো আছো, সামলে নিতে পারবে না?” জানতাম খুব কঠিন প্রায় মরণ-বাঁচন লড়াইয়ে নামতে চলেছি, তবু বাধা দিতে পারিনি। কী করে দেব, একজন ফিল্মমেকার হয়ে বুদ্ধদার মতো ফিল্মমেকারকে কী করে বাধা দেবো? আমরা কেউ পারিনি। ওঁর মেয়েরা, পুরো ইউনিট, এমনকি ওঁর ডাক্তাররাও। সে সময় ভয় করত খুব। ডায়ালিসিস নিতে নিতে শ্যুট করা, তাও এমন একটা ছবি যার আগাগোড়া শুধু জঙ্গল, পাহাড়, টিলা। ঝাড়খণ্ডের রুক্ষতায়, ডিসেম্বর মাসে, যেখানে দুপুরের রোদে মাথা ঝিমঝিম করে আর সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে মরনকামড় বসায় ঠান্ডা। ডাঃ প্রতীক দাসকে বললাম, কতটা রিস্ক? উনি বললেন, পুরোটাই রিস্ক! তখন মনে হয়েছিল, চুলোয় যাক সিনেমা, কবিতা লিখুক বুদ্ধদা না হয় এখন থেকে। ডাঃ দাসকে বললাম, আপনি বারণ করুন না। উনি হেসে বললেন, আমি বারণ করলেই কি উনি শুনবেন? তারপর বললেন, করুন না কাজটা, কিছু হলে তখন দেখা যাবে।
অনেক বছর আগে বুদ্ধদার বন্ধু, লেখক প্রীতম বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে একটা ছোট্ট ঘটনার কথা শুনেছিল বুদ্ধদা। তারপর এই এতগুলো বছর ধরে ঘটনাটি নিয়ে মাথায় আস্ত একটা সিনেমা ভেঁজেছে! বাচ্চু মণ্ডল এক অজ গ্রামে থাকে। সেই গ্রামের আকাশ দিয়ে মাঝেমাঝে উড়ে যায় প্লেন। বাচ্চুর খুব ইচ্ছে হয় বউ আর ছেলেকে নিয়ে প্লেনে চাপবে একদিন, উড়বে আকাশ চিরে! বাচ্চু গাড়ির মেকানিক। বাইক চালিয়ে এপাশ ওপাশ ঘুরে বেড়ায়। একদিন এক নির্জন জঙ্গলে বাচ্চু খুঁজে পায় বহু বছর আগে ভেঙে পড়া একটা ফাইটার প্লেনের দেহ। নাওয়া খাওয়া ভুলে প্লেনটাকে সারাতে থাকে বাচ্চু, এইবার সে উড়বেই! অতঃপর, শুরু হল ‘উড়োজাহাজ’-এর কাজ!
উড়োজাহাজ ছবিতে বাচ্চু মণ্ডলের স্বপ্নের জগত
সপ্তাহে তিনবার ডায়ালিসিস, তার মধ্যে কতবার যে এর্মাজেন্সিতে রাতবিরেতে দৌড়নো, আইসিইউ-এ ভর্তি হওয়া, ওই ভীষণ ঠান্ডায় নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে আর রাতে দুটো করে সরবিট্রেট খেতে হচ্ছে। সকালে লোকেশনে পৌঁছে শুরু হয়ে যাচ্ছে পুরোদমে কাজ! এক লোকেশন থেকে আরেক লোকেশন। দূরত্ব অন্তত একটি ঘণ্টা, রাস্তা অনেক সময়ই কাঁচা! কিন্তু, আমাদের শ্যুটিং চলছে। চলছে না, দৌড়চ্ছে! ক্যাপ্টেন হইহই করে দৌড় করাচ্ছে। আমাদের ক্যাপ্টেনের চাবুকের দরকার পড়ে না, চেঁচামিচি, ধমক-ধামক, পেপ-টক-এর দরকার পড়ে না। আগের দিন ডায়ালিসিস নেওয়া লোকটাকে “কেমন আছেন দাদা?” জিজ্ঞেস করলে সে ঝলমলিয়ে উত্তর দেয়, “খুব ভালো আছি”, আইটিইউ-এর ডাক্তারকে সে বলে, “আমাকে আজকে ছাড়তেই হবে, কাল আমার ভোরের শ্যুট”। এমন ক্যাপ্টেনের দল এমনিই দৌড়য়, এমনিই সেই দলের রক্ত টগবগ করে! হঠাৎ দলের সব সদস্য বুঝতে পারে, বেঁচে থাকা মানে কী, সিনেমাকে ভালোবাসা মানে কী! বাচ্চু মণ্ডলের স্বপ্ন, বুদ্ধদেবের ‘উড়োজাহাজ’ আমাদের ‘মিশন’ হয়ে ওঠে! বুদ্ধদেবের সবচেয়ে আশ্চর্য ছবিটা শেষ হয়! উড়ে যায় বাচ্চু মণ্ডল!
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর অফিসে ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম যেদিন, সেই বছর কুড়ি আগে, সদ্য শেষ হয়েছে ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’, পেয়েছে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার। সেদিন বুদ্ধদেব জিজ্ঞেস করেছিলেন – সিনেমার জন্য কী করতে পারবে তুমি? না খেয়ে থাকতে পারবে? রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে দিনের পর দিন, না ঘুমিয়ে থাকতে পারবে রাতের পর রাত? উত্তর দিতে বুক কেঁপেছিল, গলা কাঁপেনি, বলেছিলাম – পারব। মোদ্দা কথা, প্রথম দিনটিতেই চিত্রনির্মাতা বুঝিয়ে দিয়েছিল সিনেমাকে যদি ভালোবাসতে চাও, যদি সিনেমাকে নিয়েই ঘর বাঁধতে চাও, তাহলে মাথায় রেখ সে কিন্তু তোমাকে তিষ্ঠোতে দেবে না আজীবন। জ্বালিয়ে খাবে রাতদিন… এসব ভেবেচিন্তে যদি আসতে চাও তো এসো, ঝাঁপাও।
বুদ্ধদেবের ব্রিগেড এরপর কী করবে কে জানে! বুদ্ধদেব আজীবন নিজের ছবি নিজের মতো করে করার যে জায়গায় থেকেছেন, যে আপোসহীন, সপাট কাজ করে গেছেন তা আবার মনে পড়িয়ে দেয় সেই প্রথম দিনের প্রশ্ন, “সিনেমার জন্য কী কী করতে পারবে তুমি?” মনে পড়িয়ে দেয় ‘কালপুরুষ’-এর স্ক্রিনিংয়ের পর পাঁচ হাজার দর্শকের বিশাল প্রেক্ষাগৃহের উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি, যে হাততালি থামতেই চায় না। মনে হয় এমন একটা মানুষ ছিল সঙ্গে, এই দেশের, এই শহরের চেনা চৌহদ্দিতে – যে সিনেমাকে বিশ্বদরবারে এক অন্য ভাষায় আর মাত্রায় পেশ করেছিল। যাকে পৃথিবী মায়েস্ত্রো বলে অভিবাদন জানাত। আর সমস্ত ঝলমলে আর্কলাইটের থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসে সে নিজের মতো করে স্বপ্ন বুনত, সেই স্বপ্ন চারিয়ে দিত তার সঙ্গে জুড়ে যাওয়া কিছু পাগলের মধ্যে। তার ছবির মূল্যায়ন অনেক হয়েছে এবং আরও অনেক হওয়া বাকি। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবি এখনও সময়ের থেকে দু-চার কদম এগিয়েই, এ নিয়ে কথা হতে থাকবে। কিন্তু ছবির অন্তরালে বসে থাকা ছবির কারিগরের এই স্পিরিট আমাদের বারবার ফিরিয়ে দেয় ভালোবাসার দিকে স্বপ্নের দিকে, ফিরিয়ে আনে জেদ আর বিশ্বাস, যে বিশ্বাসে একহাজার বার প্রশ্ন করলেও উঠে আসে একটাই উত্তর – ‘ফিল্মমেকার’!
______
*লেখক একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা, কবি এবং বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের দীর্ঘদিনের সহকর্মী
