বাঙালির একটা পাতালঘর আছে!

“২০ বছর ধরে এই ছবি দেখেছে মানুষ, ভালবাসাটা একই রকম আছে…” অর্জুন গৌরিসারিয়া

ই বাংলাতেই আসতে পারত এলিয়েন। কিন্তু সে পা রাখল হলিউডে। ‘ইটি’ হয়ে। সত্যজিতের চিত্রনাট্য ‘লিক’ হয়ে এলিয়েন হয়ে গেল স্পিলবার্গের। তার আর বাংলায় আসা হল না।

তবে এসেছিল আর এক ভিনগ্রহী। নাম তার ‘ভিক’।

লম্বা কান। ন্যাড়া মাথা। ঘোলাটে চোখ। ফ্যাকাশে সাদা এক মানুষ। ঠিক মানুষ নয়। মানুষের মতো দেখতে। নেপচা গ্রহ থেকে সে এসে পড়েছিল নিশ্চিন্তিপুরে। বিজ্ঞানী অঘোর সেন তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল তার ঘুমপাড়ানি যন্তর দিয়ে। দেড়শো বছর ধরে সে ঘুমিয়ে ছিল। গ্রামের ধারে একটা বাতিল কালো গাড়িতে। হিকের ছেলে ভিককে জন্ম দিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। আর তার সেলুলয়েড জন্ম হয়েছিল পরিচালক অভিজিৎ চৌধুরীর হাতে। ছবির নাম ‘পাতালঘর’।

২০০৩ সাল। ছোটদের ছবি হয়ে মুক্তি পেল পাতালঘর। একেবারে অন্যধারার ছবি। বাঙালি দর্শকদের কাছে তো বটেই ভারতীয় দর্শকদের কাছেও। ঝকঝকে উপস্থাপনা। ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখার উত্তেজনা কম হয় না। দেদার হাসিও আছে। ছবির গতিও বেশ বৈঠকী চালে। লেবু লঙ্কার অপয়া, পুজোর নাটক আর দশঘর ভাড়াটের বাঙালি জীবন।ছবিতে ভিনগ্রহী ভিকের ভূমিকায় বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। গায়ে ‘নেগেটিভ’ চরিত্রাভিনেতার ট্যাগ পড়ে যাওয়া বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়কে নতুন করে আবিষ্কার করেছিল দর্শকরা – ‘পাতালঘর’।

বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় থেকে ‘ভিক’ হয়ে উঠতে সময় লাগত প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। পুণে থেকে প্রস্থেটিক মেপআপের আর্টিস্ট এসেছিলেন। জল পর্যন্ত খাওয়ার উপায় ছিল না।সিনেমাটোগ্রাফিতে অভীক মুখোপাধ্যায়। সম্পাদনায় অর্জুন গৌরসারিয়া। শীর্ষেন্দুর গল্প থেকে নেওয়া ছবি। শুটিং হয়েছিল বোলপুরের কাছে। অবিনাশপুর রাজবাড়িতে। মূল কাহিনি থেকে অবশ্য ছবির চিত্রনাট্য খানিক অন্যরকম। তাতে দর্শকদের দেখার মজা এতটুকু কম হয় না।

পাতালঘর আসলে এক ল্যাবরেটারি। নিশ্চিন্তিপুরের মাটির তলার গবেষণাগারে পরীক্ষানিরিক্ষা চালাতেন বিজ্ঞানী অঘোর সেন। সেই ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এই ল্যাবরেটারিতেই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন এক আজব যন্তর। মেশিন গানের মতো দেখতে সেই যন্ত্রে গুলিগোলা কিছুই বেরত না, বেরত সুর। সেই সুর যার কানে যেত সেই ঘুমিয়ে পড়ত।নিশ্চিন্তিপুর ‘অ্যাটাক’ করে ভিনগ্রহীরা। গ্রামের মানুষ ভাবে, বোধহয় ডাকাত পড়ল। আসলে ভিক নেমেছিল সেদিন। অঘোর সেন গানের গোলায় তাকে জব্দ করে। এই ছবিতে আরও এক বিজ্ঞানী আছে। ডঃ ভূতনাথ নন্দী। তার দাদুর সংগ্রহ থেকে সে অঘোর সেনের ডায়েরি খুঁজে পায়। ডায়েরির সূত্রেই তাকে নানা অদ্ভুতুড়ে ঘটনার মুখে পড়তে হয়। তার দেখা হয়ে যায় কার্তিক আর তার মামা সুবুদ্ধি রায়ের সঙ্গে। কাহিনি চলতে থাকে পুরনো বাড়িতে ভূত আর বিজ্ঞানীর যুদ্ধে। সেই যুদ্ধের নেপথ্যে এক বেগম।সম্পাদক অর্জুন গৌরিসারিয়ার কথায় ‘সায়েন্স ফিকশন বা ছোটদের ছবি ভেবে এই ছবি তৈরি হয়নি’। পাতালঘর আসলে একদল ছবি করিয়ের স্বপ্নের ছবি। আনন্দের ছবি। ২০০৩-প্রথম রিলিজের পর ছোটদের দুনিয়ায় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল এই ছবি। স্কুলে স্কুলে সিনেমার শো হলে মাস্টার-দিদিমণিদের কাছে খুদেদের বায়না থাকত ‘পাতলঘর’-এর।সেরা ‘ডেবিউ ফিল্ম’ এবং সিনেমাটোগ্রাফির জন্য জাতীয় পুরস্কারের সম্মানও মিলেছিল। সমালোচক এবং দর্শকদের প্রশংসায় মন ভরলেও বক্স অফিসে সাফল্য আসেনি। এই ছবি যেন সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়ে জন্ম নিয়েছিল। তাই অধরা থেকেছে অনেক প্রাপ্তি ।

দেখতে দেখতে দু’দশক পার করে ফেলেছে ‘পাতালঘর’। সেদিনের খুদেরাও দাঁড়িমাপ পার করে আজ লম্বা-মানুষদের দলে। বদলানো সময়ে বদলেছে ছবির পর্দাও। ‘সিনেমা’ হয়েছে ‘কন্টেন্ট’। ছোট পর্দা মানে ‘ওটিটি’। সেখানে সাই-ফাই কন্টেন্টের প্রবল জনপ্রিয়তা। গা ছমছমে সায়েন্স ফিকশনের রেটিং সব সময় হাই। দর্শক চোখ আর মগজের সুখ খুঁজে পায় বিদেশি কনটেন্টে। তৈরি হয়েছে আলাদা জঁর।সেসব ঘাঁটতে ঘাঁটতেই যেন ফিরে এসেছে ছোটবেলার টান। ঝিমঝিমে হলুদ আলোয় অঘোর সেনের ল্যাবরেটারির কথা।

আরে! আমাদেরও তো ছিল এক ‘পাতালঘর’ গপ্পো।

কবেকার কথা। নিশ্চিন্তিপুরের মাঠে নেমে এসেছিল অন্য গ্রহের যান। বাংলার সাই-ফাই!

শুরুটা পাতালঘরেই! 

একটা প্রজন্মের শৈশব আর কৈশোরের গায়ে গায়ে লেগে আছে এই ছবি। দেখতে গিয়ে বারবার মনে হয় কেতো মানে কার্তিক বোস আসলে তো আমিই। ভিক জেগে উঠলে স্কুলের মেঝেতে বা বেঞ্চে পাশের বন্ধুর হাত চেপে ধরতে হয় উত্তেজনায়। ওটিটি প্লাটফর্মে মোবাইল বা ল্যাপটপের পর্দায় আজই সেই একই রহস্য নিয়ে অপেক্ষা করে পাতালঘর। ২০ বছর আগের ছবি তবু তার দরজা খুললেই মনে হয় ঘুম ভেঙে জেগে উঠল হারানো ছোটবেলা।

অর্জুন গৌরিসারিয়ার কথায় সেই কথারই রেশ, “২০ বছর ধরে এই ছবি দেখেছে মানুষ। ভিডিয়োতে, টিভিতে, ডিভিডি বা ভিডিয়ো ক্যাসেট বাড়িতে রেখে। এখন ওটিটিতে দেখছে। তবু সবচেয়ে ভাল লাগার বিষয় ২০ বছর ধরে ছবির প্রতি ভালবাসাটা একই রকম আছে। এতগুলো বছর ধরে পাল্টায়নি…”

হাজার এক লাভ লোকসানের অঙ্ক পেরিয়েও জেগে থাকে এই ভালবাসাই। এলিয়ানের স্রষ্টার প্রতি এর চেয়ে ভাল ‘ট্রিবিউট’ আর কী হতে পারত!

 

Developed by DXDasia