১৯৮১ সালে নির্মিত হিন্দি টেলিছবি ‘সদগতি’
“যে জিনিস মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে আমি তাকে মানি না…” – ১৯৯১ সালে রিলিজিয়ন সম্পর্কে এই কথা বলেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের ‘আগন্তুক’ মনমোহন মিত্র, আর বলিয়েছিলেন পরিচালক সত্যজিৎ রায়। কিন্তু জাতপাত মানুষে মানুষে যে কতটা বিভেদ সৃষ্টি করে এবং এই বিভাজনের ফল কী ভয়ানক হতে পারে সেটা দেখিয়েছিলেন ঠিক দশ বছর আগে, ১৯৮১ সালে হিন্দি ভাষার কথাসাহিত্যিক মুন্সী প্রেমচাঁদের গল্প অবলম্বনে নির্মিত হিন্দি টেলিছবি ‘সদগতি’-তে।

ছবিটি তৈরির সময়েই শোনা গিয়েছিল, উত্তর ভারতের কয়েকটি গ্রামের ব্রাহ্মণরা ঘোর আপত্তি তুলেছিলেন ছবির বিরুদ্ধে। কেননা, ছবিটিতে দেখানো হচ্ছে, বর্ণহিন্দুরা কীভাবে চামারদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলত আগেকার দিনে। ‘তুলত’, কেননা সেই আপত্তিকারিরা জানালেন, প্রেমচন্দের কাহিনি একসময়ে সত্যি হলেও এখন আর নয়, অতএব, ছবিটি তৈরির আর কোনো প্রয়োজন নেই। অযথা বর্ণহিন্দু তপশীলী জাতিদের মধ্যে অপ্রীতি খুঁচিয়ে তোলার নতুন কোনো কারণ ঘটেনি। সত্যজিৎ রায় ‘সদগতি’ বানিয়েছিলেন দূরদর্শনের জন্য।
‘সদগতি’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ অন্ত্যেষ্টি। অর্থাৎ মানুষের শেষকৃত্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘সদগতি’ কথাটি। কিন্তু ধর্ম যখন হয়ে ওঠে শোষণের যন্ত্র, তখন মানবতার পরিণতি কতটা করুণ হতে পারে তার অক্ষরচিত্র এঁকেছেন সাহিত্যিক মুন্সী প্রেমচাঁদ। আর দূরদর্শনের পর্দায় দর্শকদের সামনে তা তুলে ধরেছেন সত্যজিৎ রায়। গল্পটির প্রেক্ষাপট ভারতের এক গ্রাম যেখানে অস্পৃশ্যতা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সেই গ্রামেরই বাসিন্দা দুখী চামার ও তার স্ত্রী ঝুরিয়া। গ্রামের পণ্ডিত এসে মেয়ের বিয়ের শুভদিন দেখে দেবে, এই আশায় জ্বর থেকে সদ্য সেরে ওঠা দুখী দুর্বল শরীরেই ঘাসের বোঝা মাথায় নিয়ে এসে পৌঁছায় পণ্ডিতের দরজায়। বাড়িতেও স্ত্রীকে দিয়ে যথাসাধ্য ব্রাহ্মণসেবার আয়োজন করায় সে। তবে বিনা পারিশ্রমিকে গরিব চামারের বাড়িতে গিয়ে তার মেয়ের বিয়ের শুভদিন পণ্ডিতই বা কেন দেখবেন? তাই দুখীর কায়িক শ্রমই ধার্য হয় ব্রাহ্মণকে নিয়ে যাওয়ার দক্ষিণা হিসাবে।

দুর্বল অভুক্ত দুখী অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে কাজ করতে করতেই ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। তারপর কীভাবে সেই মৃতদেহের সদগতি হল, আর দুখীর আজীবন ব্রাহ্মণ ভক্তির পরিণাম কি হল সেটাই গল্পের শেষে তুলে ধরেছেন প্রেমচাঁদ। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় সমাজের এই নগ্ন বাস্তবকে যথাযথ ভাবে ছোটোপর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন ওম পুরি (দুখী), স্মিতা পাটিল (ঝুরিয়া), মোহন আগাসে (ব্রাহ্মণ), গীতা সিদ্ধার্থ (ব্রাহ্মণের স্ত্রী) প্রমুখ সকল অভিনেতারা।
বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক। টেলিভিশন নামক বাক্সটা আস্তে আস্তে পৌঁছে যাচ্ছে দেশের ঘরে ঘরে। বড়োপর্দার সমান্তরালে এল আরও এক মাধ্যম যেখানে মানুষের কথা পর্দায় বলা যায়, আর দর্শক ঘরে বসেই দেখতে পায় সেই গল্প। শুরু হল টেলিফিল্মের জয়যাত্রা। এই মাত্র কয়েকবছর আগেও যখন প্রযুক্তি এতটা এগিয়ে ইন্টারনেটের দৌলতে দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় এনে দিতে পারেনি, যখন প্রতিদিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদনের মাধ্যম ছিল শুধুই টেলিভিশন সেই সময় টেলিফিল্মের জনপ্র্রিয়তার কথা বলাই বাহুল্য। আর সেই মাধ্যমে যখন কাজ করছেন সত্যজিৎ রায় সেই কাজের তাৎপর্য বলার অপেক্ষা রাখে না।

পঞ্চাশের দশকে বাংলা তথা ভারতীয় দর্শক নতুন ধারার ছবির সঙ্গে পরিচিত হয়েছে ‘পথের পাঁচালী’ দেখে, যেখানে উঠে এসেছে নিশ্চিন্দিপুরের অনাড়ম্বর জীবন। আশির দশকে ছোটোপর্দায় সত্যজিৎ তুলে আনলেন ‘সদগতি’। তবে সেই সময় ছোটোপর্দায় মুক্তি পায়নি সদগতি। জাতপাত, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের শোষণ বিতর্ক সৃষ্টি করেছে সমালোচকদের মধ্যে।
ছবিটি তৈরি হওয়ার পর দূরদর্শন কর্তৃপক্ষ সম্প্রচার করতে চায়নি। সাধারণ মানুষ এবং তৎকালীন গণমাধ্যম আলোচনা করতে থাকল, ভারত সরকার ভয় পেয়েছে, তাই ছবিটি দেখানো হচ্ছে না। ছবিটি তৈরির সময়েই শোনা গিয়েছিল, উত্তর ভারতের কয়েকটি গ্রামের ব্রাহ্মণরা ঘোর আপত্তি তুলেছিলেন ছবির বিরুদ্ধে। কেননা, ছবিটিতে দেখানো হচ্ছে, বর্ণহিন্দুরা কীভাবে চামারদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলত আগেকার দিনে। ‘তুলত’, কেননা সেই আপত্তিকারিরা জানালেন, প্রেমচন্দের কাহিনি একসময়ে সত্যি হলেও এখন আর নয়, অতএব, ছবিটি তৈরির আর কোনো প্রয়োজন নেই। অযথা বর্ণহিন্দু তপশীলী জাতিদের মধ্যে অপ্রীতি খুঁচিয়ে তোলার নতুন কোনো কারণ ঘটেনি। সত্যজিৎ রায় ‘সদগতি’ বানিয়েছিলেন দূরদর্শনের জন্য। অনেক সমালোচকই বলেছিলেন, টিভিতে দেখানোর কারণে ডিটেইলস হারিয়ে যায়, এমনকি রঙিন ছবি সত্ত্বেও রং মার খায়। দূরদর্শনের প্রথম রঙিন টেলিফিল্ম ছিল ‘সদগতি’। বহু বিতর্কের পর ছবিটি সম্প্রচারিত হয়েছিল।

সাহিত্য সমাজের দর্পন। আর সিনেমা, থিয়েটার প্রভৃতি গণমাধ্যম সেই দর্পনের প্রতিবিম্বকে বারবার তুলে ধরেছে জনসমক্ষে। অস্পৃশ্যতার ক্যানসার সমাজের কাঠামোতে বাসা বেঁধে সেই কবে থেকে সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে মরণপথে, তাই প্রায় চল্লিশ বছর আগে যে গল্প লিখেছিলেন মুন্সী প্রেমচাঁদ তা ১৯৮১ সালেও প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। আশির দশকে যখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন ঢুকছে, ঠিক তখনই প্রথম রঙিন টেলিফিল্ম হয়েও সদগতি পৌঁছে যেতে পারেনি সবার ঘরে। অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে প্রচার সমাজের কিছু অংশের ক্ষত সারিয়ে তুলতে পেরেছে ঠিকই, তবে রোগমুক্তি যে হয়নি তার প্রমাণ মেলে আজও ইউটিউবে প্রসার ভারতী আর্কাইভে সংরক্ষিত এই টেলিফিল্মের নিচের কমেন্ট সেকশনে। দলিত বিতর্ক আজও যখন বারবার উঠে আসে তখন প্রশ্ন জাগে সত্যিই কি যথেষ্ট কুসংস্কার মুক্ত ভারতীয় সমাজ? স্বাধীনতার হীরক জয়ন্তী পেরিয়ে এই লজ্জা ঘুচুক সমাজে, ভারতের সংবিধানের ১৫ নম্বর ধারা কার্যকরী হোক প্রতিটি ভারতবাসীর মননে।