
আজ ‘পথের পাঁচালী’-র জন্মদিন
ঠিক পঁয়ষট্টি বছর আগে এইদিনই ‘বসুশ্রী’ সিনেমা হলে মুক্তি পেল ‘পথের পাঁচালী’। মুক্তির আগের দিন ট্রায়াল শো। হলে হাতেগোনা কয়েকজন লোক আর টাই-পরা সাহেবি চেহারার অপারেটর। ছবি দেখে অপারেটর সাহেব ক্ষুব্ধ। “এটা একটা ছবি! এত খারাপ ছবি আমাদের প্রজেকটরে আর ওঠেনি।” রাতের পর রাত জেগে এই ছবির সম্পাদনার কাজ শেষ করেছিলেন দুলাল দত্ত। এমন সমালোচনা শুনে তাঁর পা কাঁপতে শুরু করে। একটা জায়গায় ব্যাড প্রিন্ট ছিল। সেইটা কেটে সিমেন্ট দিয়ে প্যাচ প্রিন্ট জুড়ে দিতে হবে। শরীর খারাপ লাগায় সেই কাজটাও ভালো করে করতে পারেননি সেদিন দুলাল দত্ত।
এরপর ২৬ আগস্ট। ছবির মুক্তি। হল ফাঁকা। বাইরে সত্যজিৎ রুমাল কামড়াচ্ছেন টেনশনে। একটু একটু করে ভিড় বাড়তে লাগল। সাতদিন পরে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য় রিভিউ লিখলেন পঙ্কজ দত্ত। ‘পথের পাঁচালী’ দেখার মুগ্ধতা সেই রিভিউতে বোনা। ইতিমধ্যেই খবর এল নিউইয়র্কেও ‘পথের পাঁচালী’ অকুণ্ঠ অভিনন্দন পেয়েছে। সাগরময় ঘোষ সেই খবর দিলেন পঙ্কজ দত্তকে। খবর শুনেই কেঁদে ফেললেন তিনি। এরপর খবর পেলেন সত্যজিৎ-ও। এই ছবি যে ইতিহাস সৃষ্টি করবে, তা স্পষ্ট হতে লাগল ক্রমশ। ‘পথের পাঁচালী’ সকলের দেখা উচিত—এই মর্মে নাকি কলকাতায় মিছিল বের করেছিলেন তরুণ মজুমদার সহ অনেকে। সেনেট হলে তরুণ সাহিত্যিকেরা বিপুল সংবর্ধনার আয়োজনও করেছিলেন পরে।
এক ঝটকায় বাংলা চলচ্চিত্রের গোটা পৃথিবীটাকেই বদলে দিয়েছিল ‘পথের পাঁচালী’। ১৯৫৬-৬৬ পর্যন্ত মোট ১০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছিল এই ছবি। পেয়েছিল রাষ্ট্রপতি পুরস্কারও। একটা প্রচলিত মিথ আছে, ‘পথের পাঁচালী’ নাকি ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। কথাটা মিথ শুধু না, মিথ্যেও। এই ছবির প্রযোজনা করেছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। শুধুমাত্র ১৯৫৯ সাল পর্যন্তই এই ছবি লাভ করেছিল ১২ লক্ষ টাকা। যদিও সত্যজিৎ সহ এই ছবির অন্যান্য কলাকুশলীরা এই লাভের কানাকড়িও পাননি। কেবল পেয়েছিলেন অমূল্য খ্যাতি আর সম্মান।
আরও পড়ুন
স্বদেশে সমালোচনা সয়েই আন্তজার্তিক হয়ে উঠেছিলেন সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল
টাকার অভাবে ‘পথের পাঁচালী’-র শুটিং থমকে গেছে বারবার। টাকার প্রয়োজনে বিজয়া রায়ের প্রায় সমস্ত গয়নাই বন্ধক দিতে হয়েছিল। সত্যজিৎ নিঃসঙ্কোচে নিজের সঞ্চয়ের প্রায় সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলেন ছবির জন্য। টাকা ধার দিয়েছিলেন কাছের বন্ধু-বান্ধবরাও। আর টাকা দিয়েছিলেন কিশোরকুমার। সেই টাকা কিছুতেই পরে ফেরত নেননি কিশোর। একজন প্রযোজক পাওয়া গেল। ‘রানা এন্ড দত্ত’। কাগজে বিজ্ঞাপনও বেরোল। কিন্তু কিছুদিন যেতেই তারা ব্যাক আউট করল। ফেরত চেয়ে বসল টাকাও।
অতঃপর, বেলা সেনের মেয়ে অর্চনার সূত্রে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে দেখা। বিধান রায় নাকি সত্যজিৎ-কে বলেছিলেন, গল্পের শেষটা পালটে গ্রাম-পঞ্চায়েত নিয়ে কিছু বলতে। তাহলে পঞ্চায়েতের প্রচারপত্র হিসেবে সিনেমায় অর্থ বরাদ্দ করা সম্ভব হবে। এমন প্রস্তাবে সত্যজিৎ হাঁ হয়ে গেলেন। এর আগে নারায়ণ সাধুখাঁ নামের এক প্রযোজক সত্যজিৎকে বলেছিলেন দুর্গার মুখে একটা গান জুড়তে। টাকার তীব্র প্রয়োজন সত্ত্বেও সেই প্রস্তাবে রাজি হননি সত্যজিৎ। আর এখানে তো প্রস্তাব আরোই মারাত্মক।
সিনেমার আরো কয়েকটা দৃশ্য নিয়েও অবশ্য নিজের মতামত জানিয়েছিলেন বিধান রায়। ‘বীণা’ সিনেমায় অর্ধসমাপ্ত ছবি দেখলেন তিনি। মিঠাইওলার পিছনে অপু-দুর্গা চলেছে আর তাদের পিছনে একটা কুকুর। জলে তাদের ছায়া। বিধান রায় তা দেখে বললেন, “একি উল্টো ছবি কেন?” সত্যজিৎ হেসে বিধান রায়কে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সম্পাদক দুলাল দত্তর সঙ্গে। বিধান রায় দুলালকে বললেন, “ওহে ছোকরা, ছবিটা সোজা করে দিও।” সেই ছবি অবশ্য সোজা হয়নি আর।
সিনেমার শেষ দৃশ্যও বদলাতে হয়নি। সে যাত্রায় উদ্ধার করে দিয়েছিলেন অর্চনাই। তাঁর কথায় এই সিনেমায় অর্থ বরাদ্দ করতে রাজি হন বিধান রায়। বাকি ছবির শুটিং শেষ হয়। টানা ১৪ দিন প্রায় রাত জেগে শেষ হয় ছবির এডিটিং। ছবিটি নিউইয়র্কে যাবে। ছবির রিলভর্তি ক্যান প্লেনে তুলে দিয়ে আসার পর ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি ফিরেছিলেন সত্যজিৎ। তারপর তলিয়ে গেছিলেন ঘুমে।
সেই ঘুমের অতলেই নিজেকে প্রস্তুত করছিল ইতিহাস। বাংলা সিনেমার বাঁক বদলে দেওয়া ছবি শেষ করে উঠে সত্যজিৎ কি স্বপ্নে ডুবে গিয়েছিলেন সেই ঘুমে? নাকি স্বপ্ন আদতে শুরু হয়েছিল ২৬ আগস্ট থেকেই। ছবির মুক্তির পর।
