KIFF : দর্শকদের উন্মাদনায় সে বছর প্রথম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে সারা রাত সিনেমা চলেছিল

কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ডায়েরি, পর্ব-১

৭তম বছরে পদার্পণ করলো কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (Kolkata International Film Festival)। শুভ উদ্বোধন আগামী ২৫ এপ্রিল। এই চলচ্চিত্র উৎসবের ইতিহাস বলতে গেলে আগে বলতে হবে ১৯৫২ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অফ ইন্ডিয়া (IFFI)-এর কথা। কারণ কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হওয়ার অনেক আগেই এই চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছিল। IFFI-এর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই শহর—কলকাতা (Kolkata)।

কলকাতার সিনেমাপ্রেমী দর্শকরাই, নানা সমস্যার মধ্যে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন চলচ্চিত্র উৎসবের নেপথ্যে—সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) এ কথা বলেছিলেন ১৯৯০ সালে নজরুল মঞ্চে, IFFI আয়োজিত চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী ভাষণে। ভালো সিনেমা দেখার চাহিদা অনেকদিন ধরেই এই শহরের মানুষের মধ্যে ছিল। ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি (CalCutta Film Society) এবং বিদেশি দূতাবাসগুলি যে ছবি দেখানোর আয়োজন করতো, তা ভালো ছবি দেখার চাহিদাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল অনেক গুণ।

১৯৯৪-এ খুব বড়ো করে কলকাতায় IFFI অর্থাৎ জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসব হয় যখন, সেই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মাইকেলেঞ্জেলো আন্তোনিওনির উপস্থিতি নিজের রেট্রোস্পেকটিভে। এর পরের বছরই শুরু হল কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব। তখনও তা ‘আন্তর্জাতিক’ তকমা পায়নি।

১৯৫২ সালের ২৪ জানুয়ারি বোম্বেতে যে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সূচনা হয়েছিল, তা প্রধানত দিল্লির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে এই উৎসব ভারতের অন্যান্য শহরেও হয়। কলকাতায় মোট তিনবার এই IFFI-র আয়োজন করা হয় : ১৯৮২ সালে ‘ফিল্মোৎসব ৮২’, ১৯৯০ সালে এবং ১৯৯৪ সালে। এই উৎসব যখন বোম্বের পর মাদ্রাজ আর দিল্লি হয়ে কলকাতায় এল তখন বড়ো ছবির সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় একশো। সেই সময় এই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কেবল এশিয়াতেই প্রথম নয়, এত দেশের এতগুলি ভাষায় এত ছবি একই সময়ে পৃথিবীর কোথাও কখনও দেখানো হয়নি। সেদিক থেকে দেখলে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র উৎসবেই অভাবনীয় সাড়া পড়ে যায়। অন্যান্য শহরে এই উৎসব সফল হলেও কলকাতায় তা যাবতীয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রা ছাড়িয়ে গেছিল।

তবু এরপর ভারতে চলচ্চিত্র উৎসবের ক্ষেত্রে তেমন ধারাবাহিকতা দেখা গেল না। কলকাতা সিনেমা-সংস্কৃতির পীঠস্থান হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন বঞ্চনার কারণে অপেক্ষা করতে হয় ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। ১৯৭৫ সালে রাজ্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সাতদিন ব্যাপী ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব দি আদার সিনেমাঃ ক্যালকাটা সেভেন্টি ফাইভ’ নামে এক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আসর বসে। এরপর ১৯৭৮ সালে ‘ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ১৯৭৮’ নামে কলকাতায় রাজ্যের তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগ আর ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের যৌথ উদ্যোগে হয় চলচ্চিত্র উৎসব। রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতির উদ্যোগে ১৯৮০ সালে আবার কলকাতায় চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা সিনেমার ষাট বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এই উৎসব আয়োজিত হয়। রবীন্দ্রসদনে এই উৎসবের উদ্বোধনের পর ১৯৮৬ সালে ‘নন্দন’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। সমকালীন বাংলা ছবির পাশাপাশি অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার ছবিও প্রদর্শিত হয়।

১৯৯৪-এ খুব বড়ো করে কলকাতায় IFFI অর্থাৎ জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসব হয় যখন, সেই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মাইকেলেঞ্জেলো আন্তোনিওনির উপস্থিতি নিজের রেট্রোস্পেকটিভে। বহু বিশ্ববরেণ্য পরিচালকরা এ দেশে এসেছিলেন এই চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে। কলকাতার দর্শক এভাবেই পৃথিবীর সেরা পরিচালকদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিল। এর পরের বছরই অর্থাৎ, ১৯৯৫ সালে শুরু হল কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব। তখনও তা ‘আন্তর্জাতিক’ তকমা পায়নি। ২০০১ সালে সপ্তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের নাম বদল হয়। নতুন নাম হয় ‘কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’। ২০১২ সালে,  ১৮তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের নাম বদলে হয় ‘কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ (KIFF)। ফোকাস ছিল ‘আফ্রিকা (নাউ এন্ড দেন)’। ইরানি পরিচালক আসগর ফরহাদির ছবি ‘নোদের অ্যান্ড সিমিন, এ সেপারেশন’ দিয়ে উদ্বোধন হয়।

দেব বেনেগালের ছবি ‘ইংলিশ আগস্ট’ দেখানো হয় প্রথম ক্যালকাটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধনী সিনেমা হিসেবে। রেট্রোস্পেক্টিভ বিভাগে দেখানো হয় আকিরা কুরোসাওয়ার দশটি ছবি; জঁ রেনোয়া-র দুটি ছবি এবং মার্তা মেসজারোস-এর দুটি ছবি। এই বিভাগে দেখানো হয় উত্তমকুমার অভিনীত ২০টি ছবিও। হোমেজ বিভাগে শ্রদ্ধা জানানো হয় সলিল চৌধুরীকে। উৎসবের অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অনোজা বীরসিংহ, পিটার মেটলার, আনার প্রেমিংগার প্রমুখ।

১৯৯৮ সালে সিনেমা দেখানোর বিপুল প্রয়াসের পাশাপাশি এই বছরেই কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দ্বিতীয় ক্যালকাটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল শুরু হয় গোবিন্দ নিহালনি-র ‘সংশোধন’ প্রদর্শনের মাধ্যমে। ১৮টি দেশের ১৭০টি ছবি উপস্থিত ছিল এই উৎসবে। ট্রিবিউট বিভাগে দেখানো হয়েছিল ক্রিস্তফ কিসলওস্কি-র চারটি ছবি, টমাস আলিয়ার ছবি, উৎপল দত্তের ১৫টি ছবি, অনিল চট্টোপাধ্যায়ের ১২টি ছবি। এছাড়াও জঁ লুক গোদারের ৪টি ছবি, মারিয়ন হ্যানসেল-এর ৮টি ছবি-র প্রদর্শনের পাশাপাশি স্বাধীনতার পঞ্চাশ বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে ছিল আনন্দমঠ, ছিন্নমূল, সেলিম ল্যাংড়ে পে মাত রো, তমস, বিপ্লবী ক্ষুদিরাম এবং ‘বাঘা যতীন’ ছবিগুলি। সিনেমাপ্রেমীদের কৌতূহলের কেন্দ্রে ছিল ১৪টি ‘সত্তর-উত্তর জাপানি চলচ্চিত্র’।

১৯৯৭ সালের কলকাতা চলচ্চিত্রও একটি বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য। সে বছরও স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে দেখানো হয়েছিল ৮টি ছবি। হোমেজ বিভাগে স্মিতা পাটিল-এর ৫টি ছবি, ‘ফিল্মস্‌ অব কামাল হাসান’ পর্যায়ে তিনটি ছবি এবং ট্রিবিউট বিভাগে ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো-র এবং উইম ওয়েনডারস-এর যথাক্রমে ৯টি ও ৫টি সিনেমা দেখানো হয়। একই সঙ্গে দেখানো হয় ত্রুফো-র উপর নির্মিত তথ্যচিত্র ‘স্টোলেন পোর্ট্রেটস’। তবে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ছিল ‘ব্ল্যাক আমেরিকান ফিল্ম’ নামের ৫টি ছবির প্যাকেজ এবং ‘ফোকাস’ হিসেবে পূর্বতন চেকোশ্লাভাকিয়ার বেশ কয়েকটি ছবি। সে বছর কলকাতার সিনে-দর্শকদের উন্মাদনা এমন পর্যায়ে পোঁছায় যে এই প্রথম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে সারা রাত ধরে ছবি দেখানো হয়।

সিনেমা জগতে ১৯৯৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এক অত্যন্ত বেদনার দিন। জাপানি চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়া মারা যান এই দিনে। তাঁর প্রতি কলকাতার শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে এই বছরের চলচ্চিত্র উৎসবটি তাঁকেই উৎসর্গ করা হয়। সিনেমা দেখানোর ক্ষেত্রে এই বিপুল প্রয়াসের পাশাপাশি এই বছরেই কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। রাজ্য সরকার সিদ্ধান্ত নেয় চলচ্চিত্র উৎসব কমিটি গঠনের, এবং কমিটি গঠিত হলে তার চেয়ারম্যান হন গৌতম ঘোষ। অন্যটি, ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফিল্ম প্রোডিউসারস অ্যাসোসিয়েসন’-এর অনুমোদন পায় কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব।

১৯৯৯ সাল গুরুত্বপূর্ণ অ্যালফ্রেড হিচকক-এর শতবর্ষ হিসেবে। এই উপলক্ষ্যে প্রদর্শিত হয় হিচকক-এর ১২টি ছবি। পঞ্চম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের সূচনায় ইরানের তহমিনেহ্‌ মিলানি-র ‘দো জান’ (টু উইমেন) ছবিটি দেখানো হয়। ফোকাস কান্ট্রি ছিল নেদারল্যান্ড। এছাড়াও এই চলচ্চিত্র উৎসবের উল্লেখযোগ্য বিভাগটি হল স্পেশাল স্ক্রিনিং, যেখানে তিনটি বিষয় ছিল- ১. ফিল্মে গার্সিয়া মার্কেজ, ২. ফ্রান্সের আধুনিক সিনেমা এবং ৩. যুদ্ধ-পরবর্তী পূর্ব ইউরোপ।

ষষ্ঠ বছর চলচ্চিত্র উৎসবের সূচনা হয় এলিসিয়ো সুবিয়েলার ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ গড’ ছবিটির প্রদর্শনী দিয়ে। গোদারের সত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে তাঁর নয়টি ছবি দেখানো হয়। হোমেজ পর্বে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয় কেরলের পরিচালক জি অরবিন্দন-এর প্রতি। সেন্টিনারি ট্রিবিউট বিভাবে শ্রদ্ধা জানানো হয় ছবি বিশ্বাস ও লুই বুনুয়েল-কে।

(চলবে)

তথ্যসূত্রঃ ‘রুপোলি সফর’ – ফেস্টিভ্যালের ডায়েরি, পশ্চিমবঙ্গ তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ।

 

Developed by DXDasia