জনতার দরবারে প্রতিরোধের ভাষা তুলে ধরছে ‘কলকাতা পিপল’স ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’

অষ্টম বর্ষে পা দিল সাধারণ মানুষের এই চলচ্চিত্র উৎসব

ঙ্গা আর তার স্বামী রাজকুমার পরিযায়ী শ্রমিক। বিভিন্ন জায়গার গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরে আখের ক্ষেতে আখ কাটার কাজ করে তারা। সঙ্গে থাকে তাদের দশ বছরের ছেলে গণেশ। সে স্কুলে পড়ে কিন্তু সবসময় স্কুলে হাজিরা দিতে পারে না। মা-বাবার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে হয় তাকেও। স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের কাছে এই নিয়ে বকুনি খায় তার মা। ছেলেকে এভাবে মানুষ করবে কী করে, চিন্তায় পড়ে গঙ্গা কিন্তু হাল ছাড়ে না। ছেলেকে শিক্ষিত করতেই হবে, অন্ধকার থেকে আলোয় পৌঁছে দিতে হবে, এই স্বপ্নকে লালন করতে থাকে সে। কিন্তু কীভাবে?

জনতার সাহায্যে জনতার সিনেমা – এই সুরেই বিশ্বাসী বলেই এই চলচ্চিত্র উৎসবের আলাদা করে কোনও প্রবেশমূল্য নেই। কিন্তু, এই সংগঠন পুরোপুরিই মানুষের চাঁদার উপর নির্ভরশীল।

এই প্রশ্নের উত্তর অনেকেই জানেন না। তাঁরা শুধু এটুকু জানতে পারেন, কীভাবে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়, কীভাবে নুন আনতে পান্তা ফুরায় বা জীবন কতটা অনিশ্চিত হতে পারে। তাঁদের মধ্যে থেকেই কেউ কেউ সাহস পান আকালের মধ্যে স্বপ্ন দেখার। যেমন- গঙ্গা। সন্তোষ রাম পরিচালিত ছোটো ছবি ‘প্রশ্ন’ দাঁড় করায় সেইসব সংগ্রামী মায়ের সামনে, যাঁরা পাঁকে পদ্ম ফোটাতে চেয়েছেন।

ছবিটি দেখানো হয় ২০২২ কলকাতা পিপল’স ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এ (Kolkata People's Film Festival)। যে ছবিগুলো আপনি সচরাচর কোথাও দেখতে পাবেন না অথবা দেখানো হবে না, প্রতিবছরই এই ধরনের সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করে পিপল'স ফিল্ম কালেক্টিভ (People's Film Collective) নামে বাংলার একটি স্বতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসিত, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক গোষ্ঠী। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নিপীড়িতদের কথা মানুষের তুলে ধরতে এবং একটি বিকল্প মিডিয়া তৈরি করার কাজে নিমজ্জিত। তাঁদের উদ্যোগেই গত ৩১ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল অবধি কলকাতার উত্তম মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল অষ্টম কলকাতা পিপল’স ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (KPFF)।

পিপল’স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সদস্যবৃন্দ

পিপল’স ফিল্ম কালেক্টিভ প্রতিবছর এই উৎসবের আয়োজন করে। সিনেমা বোদ্ধা ছাড়া মূলত সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিরোধের ভাষা পৌঁছে দিচ্ছে এই চলচ্চিত্র উৎসব। জনতার সাহায্যে জনতার সিনেমা – এই সুরে বিশ্বাসী বলেই এই চলচ্চিত্র উৎসবের আলাদা করে কোনও প্রবেশমূল্য নেই। কিন্তু, এই সংগঠন পুরোপুরিই মানুষের চাঁদার উপর নির্ভরশীল। যেকারণে উদ্যোক্তাদের তরফে একটি অনুদান বাক্স-র বন্দোবস্ত থাকে, সামর্থ্য অনুযায়ী দর্শকরা সেখানে কিছু অনুদান দিতে পারেন।

“হিসেব মতো এই চলচ্চিত্র উৎসবের এটা নবম বর্ষ। গত বছর কোভিডের কারণে আয়োজন করা যায়নি। পিপলস ফিল্ম কালেকটিভ নামে একটি সংগঠনের হাত ধরেই এই চলচ্চিত্র উৎসবের যাত্রা শুরু হয়। বছরে একবারই এই উৎসবে সিনেমা দেখানো হয় এমনটা নয়, প্রত্যেক মাসেই অন্ততঃ একটা করে স্ক্রীনিং-এর ব্যবস্থা করে থাকি আমরা। সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ছবি দেখানো সঙ্গে সমসাময়িক, সময়পোযোগী কিছু বিষয় নিয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মনোজ্ঞ আলোচনাও থাকে।” বলছিলেন পিপল’স ফিল্ম কালেক্টিভ-এর সদস্য সায়ন্তনী খাঁ।

এবারের উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে ভারত তথা দক্ষিন এশিয়ার মোট ৩৮টি ছবি। এর মধ্যে ৮টি ছবির আন্তর্জাতিক প্রিমিয়ার ও ১৫টি ছবির কলকাতা প্রিমিয়ার হয়েছে।

সায়ন্তনীর কথায়, “এ বছর আমাদের থিম ছিল কৃষক আন্দোলন। কিন্তু এই বিষয়ের উপর যে ছবিগুলি দেখানোর কথা ভাবা হয়েছিল সেগুলোর কাজ এখনো শেষ না হওয়ায় কৃষক আন্দোলন সংক্রান্ত কোনও ছবিই উৎসবে দেখানো যায়নি।”

এই কয়েক বছরে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছেছে এই চলচ্চিত্র উৎসব। কিন্তু সাধারণ দর্শক, যাঁদের কথা ভেবেই এই উদ্যোগ, তাঁরা কতটা সামিল হচ্ছেন? সায়ন্তনি জানান, “সাধারন মানুষদের থেকে প্রচুর সাড়া পেয়েছি আমরা। ওঁদের জন্যই তো এই আয়োজন। যেহেতু গতবছর উৎসব হয়নি, স্বাভাবিক ভাবেই এবছর এই চলচ্চিত্র উৎসব ঘিরে উৎসাহীদের ভিড় বেশ ভালোই ছিল। শুরুর দিন থেকেই দর্শক সমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো।”  

এবারের উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে ভারত তথা দক্ষিন এশিয়ার মোট ৩৮টি ছবি। এর মধ্যে ৮টি ছবির আন্তর্জাতিক প্রিমিয়ার ও ১৫টি ছবির কলকাতা প্রিমিয়ার হয়েছে। উৎসবের সূচনা হয় ‘ডিসকাউন্ট ওয়ার্কার্স’, পাকিস্তানের শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে অমর আজিজ ও ক্রিস্টোফার পাৎজের ছবি দিয়ে। এছাড়াও উৎসব জুড়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশের বীরাঙ্গনা ও কোরিয়ার ‘কমফর্ট উইমেন’দের হারিয়ে যাওয়া কাহিনি অবলম্বনে শেখ আল মামুনের ‘হোয়াই নট’, আনন্দ পটবর্ধনের নতুন সিনেমা ‘হার্ট টু আর্ট’, উমা চক্রবর্তী ও প্রিয়াঙ্কা ছাবরার ‘ইয়ে লো বয়ান হামারে’, বাংলায় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান ও তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বিষয়ে দ্বৈপায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় ও কস্তুরী বসুর আ বিড ফর বেঙ্গল, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের নিয়ে মধুলিকা জালালির ভিন্নতর আঙ্গিকের ছবি ‘ঘর কা পাতা’ ইত্যাদি ছবি। উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ ছিল প্রতিবাদী শিল্পের প্রদর্শনী, পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা।

 

ছবি সৌজন্যে – 'পিপল'স ফিল্ম কালেক্টিভ' ফেসবুক পেজ। 

Developed by DXDasia