তাঁর এলাকার একটি শিরীষ গাছে থাকে প্রায় তিনহাজার টিয়া
পরিবেশ দূষণ আর আবহাওয়ার পরিবর্তনের কুপ্রভাব, যত দিন যাচ্ছে, ক্রমশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। একদিকে কলকারখানার দূষণ, অন্যদিকে চলছে নির্বিচারে গাছ কাটা, অরণ্য ধ্বংস। পৃথিবী জুড়ে ভেঙে পড়ছে বাস্তুতন্ত্র। হারিয়ে যাচ্ছে পশুপাখি, অনেক প্রজাতি হয়ে পড়ছে বিপন্ন। কিন্তু এর মধ্যেই কেউ কেউ আছেন, যাঁরা পশুপাখিদের ভালোবেসে তাদের রক্ষা করার কাজ করে চলেছেন নিজের সীমিত সাধ্যের মধ্যেই। তেমনই একজন হলেন চাঁদ মিয়া। তিনি মুর্শিদাবাদের নওদা ব্লকের চাঁদপুরের অন্তর্গত, কুঠিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। এই বৃদ্ধ বহুদিন ধরে, একা হাতে রক্ষা করে আসছেন এলাকার টিয়াপাখিদের।
টিয়াপাখি (Parrot) পোষ্য হিসাবে অত্যন্ত জনপ্রিয় পাখি। সবুজ ডানা আর লাল ঠোঁটের এই পাখিকে নিজের বাড়ি বা দোকানে, খাঁচায় ভরে রাখতে পছন্দ করেন অনেকেই। আর সেই কারণেই অসংখ্য টিয়াপাখিকে ফাঁদ পেতে ধরা হয়। সেই সময় অনেক পাখি আহত হয়, কিছু পাখি মারাও যায়। বর্তমানে খাঁচায় টিয়াপাখি রাখা বা টিয়াপাখি বিক্রি করা নিষিদ্ধ। সম্প্রতি রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে যে, কোনও দেশি পাখিকেই খাঁচায় বন্দি করে রাখা যাবে না। আগাম অনুমতি নিতে হবে বিদেশি পাখির ক্ষেত্রেও। রাজ্য বনদপ্তরও অনেক বেশি সতর্ক হয়েছে। তবুও টিয়াপাখি বা অন্যান্য পাখিদের খাঁচায় বন্দি করা বা সেগুলিকে বিক্রি করার কাজ পুরোপুরি থামেনি।

এই অবস্থায় চাঁদ মিয়া হয়ে উঠেছেন এক ব্যতিক্রমী নিদর্শন। তাঁর এলাকার পাশ দিয়ে চলে গেছে জাতীয় সড়ক এনএইচ-১২ (NH-12)। সেই রাস্তার পাশেই রয়েছে একটি বিশাল শিরীষ গাছ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেল, গাছটি না কি ব্রিটিশ আমলের। সেই গাছের ফোঁকরে বাস করে অসংখ্য টিয়াপাখি। প্রায় তিনহাজার টিয়াপাখি নাকি বাস করে সেখানে, জানালেন স্থানীয়রা। সেই টিয়াপাখিগুলিকেই বছরের পর বছর ধরে রক্ষা করে আসছেন চাঁদ মিয়া। কেউ পাখিগুলির ক্ষতি করতে এলে বা তাদের ধরতে এলেই লাঠি হাতে প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন এই বৃদ্ধ। দিনে তো বটেই, এমনকি গভীর রাতেও তাঁর নজর এড়িয়ে কেউ বন্দি করতে পারে না পাখিগুলিকে। স্থানীয়দের থেকে জানা গেছে, প্রায় হাজার তিনেক পাখিকে এভাবেই আগলে রাখেন তিনি। পথচলতি অনেকেই পাখিগুলির কলকাকলিতে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। তাঁদের উদ্দেশ্যেও চাঁদ মিয়া বলেন, পাখিগুলির যেন কোনও ক্ষতি না করা হয়। রক্তের সম্পর্ক নয়, মানুষ ও পাখির মধ্যে এ এক আত্মিক সম্পর্ক।
এই উদ্যোগের কথা জানতে পেরে, চাঁদ মিয়ার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে রাজ্য বনদপ্তর। গত ২১ জুলাই তারিখে বহরমপুর সাউথ রেঞ্জের (Behrampur South Range) অফিসার অমিতাভ পাল চাঁদ মিয়ার গ্রামে যান, তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দেন। গাছটির নিচে একটি নোটিশ বোর্ডও লাগানো আছে। তাতে ওয়াইল্ডলাইফ প্রোটেকশন অ্যাক্ট ১৯৭২ (Wildlife Protection Act 1972) এবং ওয়াইল্ডলাইফ প্রোটেকশন অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ২০২২ (Wildlife Protection Amendment Act 2022)-এর উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে সতর্কবার্তা। পাখিদের কোনোরকম ক্ষতি করার চেষ্টা করলে পড়তে হবে কড়া শাস্তির মুখে, বলা আছে সেই কথাও। স্থানীয় মানুষরাও প্রশংসায় ভরিয়ে দিচ্ছেন এই বৃদ্ধকে।
রাজ্য বনদপ্তর চাঁদ মিয়ার এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। তাদের আশা, চাঁদ মিঁয়া রাজ্যের অন্যান্য মানুষের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবেন। তাঁকে দেখে পরিবেশ ও জীবজন্তু রক্ষায় এগিয়ে আসবেন আরও অনেকে। আর চাঁদ মিঁয়া? গ্লোবাল ওয়ার্মিং, বাস্তুতন্ত্র এইসব ভারি ভারি শব্দ তিনি জানেন না, শোনেননি কখনও। শুধু পরম মমতায় রক্ষা করে যান পাখিগুলিকে। তিনি বনদপ্তরেরে এই উদ্যোগে খুবই খুশি। সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আমৃত্যু এভাবেই রক্ষা করে যাবেন তাদের।