রাজাভাতখাওয়া শকুন সংরক্ষণ প্রজনন কেন্দ্রটি এশিয়ায় দ্বিতীয়
ধীরে ধীরে বিপন্ন থেকে বিপন্নতর হয়ে উঠছে শকুন (Vulture)। মানুষের খুব একটা পছন্দের প্রাণীর তালিকায় বোধহয় শকুনের স্থান হবে না। বিভিন্ন প্রচলিত বাক্যাংশ তার প্রমাণ। এমনকি কাউকে হেয় করতে অনেকসময় তাকে ভাগাড়ে ঘুরে বেড়ানো শকুনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু পরিবেশের কথা ভাবলে শকুন অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। পরিবেশের পরিচ্ছন্নকর্মী পাখি বলা হয় শকুনকে। পচা মৃতদেহের মাংস খেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখে শকুন। মৃতদেহের শরীরের জীবাণুগুলি শকুনের পেটে গেলে ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে না। কিন্তু অন্যান্য প্রাণীর দেহে এই জীবাণু ধ্বংস হয় না- ফলে অ্যানথ্রাক্স, জলাতঙ্ক ইত্যাদি রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। পরিবেশের খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষার জন্যও শকুনের অস্তিত্ব রক্ষা জরুরি। কিন্তু বর্তমানে আইইউসিএন-এর রেড লিস্টের (IUCN Red List) অন্তর্গত হয়েছে গুরুতরভাবে বিপন্ন এই প্রাণীটি। তাই সমাজে শকুন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে প্রতিবছরের মতো এই বছর ২ সেপ্টেম্বর পালিত হলো আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস (International Vulture Awareness Day)। সেই দিবস পালন করেছে রাজ্য বনদপ্তরের অধীনস্থ আলিপুরদুয়ারের রাজাভাতখাওয়া শকুন সংরক্ষণ প্রজনন কেন্দ্র।

প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবার এই দিবস পালন করা হয়। এই দিনটির প্রধান উদ্দেশ্য বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় শকুনের গুরুত্ব সম্পর্কে গণসচেতনতা গড়ে তোলা। রাজভাতখাওয়া শকুন সংরক্ষণ প্রজনন কেন্দ্রে ঐদিন একটি কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়েছিল। কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার জেলার বিভিন্ন কলেজের জুওলজি বিভাগের পড়ুয়া এবং শিক্ষকরা এই কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠানে শকুন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বক্তব্য রাখা হয়। করা হয়েছিল পোস্টার প্রেজেন্টেশনের আয়োজনও। শকুন সংরক্ষণ ও প্রজননে রাজভাতখাওয়া শকুন সংরক্ষণ প্রজনন কেন্দ্রের (Rajabhatkhawa Vulture Conservation Breeding Centre) ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য পেশ করা হয়।

২০০৫ সালে এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই তারা শকুন সংরক্ষণ ও প্রজননের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে আসছেন। এই কেন্দ্রটি রাজ্যের একমাত্র এবং এশিয়ার দ্বিতীয় শকুন সংরক্ষণ প্রজনন কেন্দ্র। গত তিন বছরে ৩১টি গুরুতর বিপন্ন হোয়াইট-ব্ল্যাকড শকুনকে প্রজনন করে, তারপর পরিবেশে ছেড়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। সংখ্যার নিরিখে যা ভারতে সর্বোচ্চ। প্রতিটি শকুনের গতিবিধি প্ল্যাটফর্ম ট্রান্সমিটার টার্মিনালের (Platform Trasmitter Terminal) মাধ্যমে স্যাটেলাইট দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এছাড়াও, এই কেন্দ্রে বিশ্বে প্রথমবার, স্লেন্ডার-বিল্ড শকুনের (Slender-billed Vulture) প্রজনন ঘটানো সম্ভব হয়েছে।

গোটা উত্তরবঙ্গে এই কেন্দ্রটি শকুন উদ্ধারকেন্দ্র হিসাবেও কাজ করে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। এছাড়াও সারা বছর ধরেই চলে সচেতনতা প্রসারের কাজ, শকুনদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা, এলাকায় শকুনের সংখ্যা নির্ণয়ের কাজ প্রভৃতি। ২ তারিখের এই কার্যক্রমে অঞ্চলের স্কুলপড়ুয়াদেরকে কেন্দ্রটি ঘুরিয়ে দেখানো হয় এবং কেন্দ্রটির কাজ এবং কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে তাদের অবহিত করা হয়। রাজভাতখাওয়া শকুন সংরক্ষণ প্রজনন কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ আশা করছেন যে, এর ফলে ছাত্রদের মধ্যে, পরিবেশে শকুনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা এবং আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে এবং তারাও ভবিষ্যতে এই ধরনের উদ্যোগে সামিল হবে।

গত কুড়ি বছর ধরে সমগ্র উপমহাদেশেই শকুন প্রায় হারিয়ে গেছে বললেই চলে। জলবায়ুর পরিবর্তন, গাছ ও জঙ্গল কেটে ফেলা, গবাদি পশুর উপর ডাইক্লোফেনাক ইঞ্জেকশন দেওয়া- কারণ একাধিক। গবাদি পশুদের ব্যথানাশক ডাইক্লোফেনাক ইঞ্জেকশন দেওয়ার রেওয়াজ আগে গোটা উপমহাদেশ জুড়ে ছিল। সেই পশু মারা যাওয়ার পর শকুনেরা তাদের মাংস ভক্ষণ করে রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়ত এবং মারা যেত। বর্তমানে এই রাসায়নিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা শকুন সংরক্ষণের জন্য কাজ করে চলেছে। অন্য সব ব্যাপারের মতন এখানেও দরকার সচেতনতা এবং সাধারণ মানুষের যোগদান। তা যদি সম্ভব করা যায় তাহলে আবার শকুনের সংখ্যা বাড়বে সন্দেহ নেই। আবার আমরা দেখতে পাবো, “মাঠ থেকে মাঠে-মাঠে- সমস্ত দুপুর ভরে…আকাশে-আকাশে শকুনেরা চরিতেছে…”।